লজিং মাস্টার দ্বিতীয় পর্ব

লজিং মাস্টার

ইমাম হোসেন সবুজ

মনির ছেলেটা, পড়াশুনায় যতটা না ভালো। তার চেয়েও বেশি দক্ষ বাচালতায়। অনর্গল কথা বলতেই থাকে। কেউ শ্রবণ করুক আর নাইবা করুক। মনিরের কোন ক্লান্তি নেই। শ্রাবণ মনিরের সাথে হাঁটছে, আর ওর বকবক শুনছে। কিন্তু মনির কে ধমকায় না সে। অবশেষে মনির শ্রাবণকে নিয়ে এমন এক বাড়িতে আসলো। বাড়ির পরিবেশটা এমন, যেন মনে হয় বাড়ির বাসিন্দারা যুদ্ধ করে করে, এক ঘরের সাথে অন্য ঘরকে, পাশাপাশি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। সংকীর্ণ একটুখানি উঠোন। উলঙ্গ, অর্ধ উলঙ্গ বাচ্চারা লুটোপুটি খাচ্ছে। এবং তাদের সংখ্যা দেখে মনে হয়, পরিবার পরিকল্পনার সেবকরা, হাঁটু জল অতিক্রম করে এই বাড়িতে আসার দুঃসাহস দেখাননি। শ্রাবণ মনির কে বলল, ভাই মনির এত বাচ্চারা কি এই বাড়ির লোকের?
-হুম ভাই।এগো মাঠে ধান যেমন বেশি,পোলাপাইনও তেমন বেশি। কথা বলতে বলতে দুজনেই গৃহকর্তার গৃহের ,সামনে এসে উপস্থিত হল। মনির এবার ব্যক্তিত্বের কাশি ঝেরে হাঁক দিল।
-রহমান ভাই কি ঘরে আছেন?
রহমান মিয়া কেডা বলে ডাক দিয়ে ,বাইরে আসলেন। শ্রাবণ তাকে দেখেই সালাম দিল।
-ওয়ালাইকুম আসসালাম। ও আমনেই বুঝি লজিং স্যার? শ্রাবণদেরকে বারান্দার রুমে বসতে দেওয়া হল। ঘরটা ভীষণ নোংরা, কোথাও পানি পড়ে আছে, কিছুটা স্যাঁতস্যাঁতে, খানিক অংশে শুকনো ধান ছড়িয়ে আছে। বেড়ার সাথে এলিয়ে রয়েছে ,কতগুলো ধানের পূর্ণ বস্তা। কোথাও এলোমেলো ভাবে মেঝেতে পড়ে আছে, ছোট বাচ্চাদের প্যান্ট কাপড়। শ্রাবণ বলল, বাচ্চাদের কাপড়-চোপড় এভাবেই পড়ে আছে কেন? এগুলো গুছিয়ে রাখলে ভালো হয় না? রহমান মিয়া বলল, আর কইয়েন না স্যার, হারামজাদি গো বিয়া কইরাই ভুল করছি। হারাদিনই নিজে গো রূপ লইয়া ব্যস্ত থাকে, ঘরের যত্ন নিব কোন সময়?
— আপনার ছেলে মেয়ে কয় জন?
–বেশি না স্যার! মাত্র ৪ পোলা মাইয়া। লাজুক ভাবে জ্বিহবায় কামর খেয়ে বললো,আর একজন আইতাছে। শ্রাবণ আর মনিরের লাজুক দৃষ্টির, আদান-প্রদান হলো। মনির বলেছিল মাত্র একটি মেয়েকে পড়াতে হবে। যাহোক মেনে নিলো শ্রাবণ। কারণ এই মুহূর্তে তার একটি আশ্রয় দরকার। এখানে থাকতে হলে, তাকে একবার বাড়িতে যেতে হবে, জিনিসপত্র আনার জন্য। আব্দুর রহমান সাহেব বলল, স্যার আজকে থেকে যান কালকে বাড়িতে যাবেন। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসলো। মনিরের চাপাচাপিতে শ্রাবণ বাধ্য হয়ে রয়ে গেল। রহমান হাজির লোজিং বাড়িতে। হাজী বাড়ি অথচ তার কোনো নমুনা নেই, এই বাড়িতে। শ্রাবণ মাগরিবের সালাত আদায় করে, নতুন ছাত্র-ছাত্রীকে পড়ানোর জন্য টেবিলে বসে রইল। এবার আসলো চারজন ছোট ছেলেমেয়ে, একটি মাত্র মেয়ে একটু বড়। বয়স ১৩ কি ১৪। নাম আমেনা। নতুন স্যারকে সালাম প্রদান করলো আমেনা। শ্রাবণ আমেনার দিকে তাকিয়ে সালামের উত্তর দিল।
–কি নাম তোমার? কোন শ্রেণীতে পড়ো?
–আমার নাম,আমিনা। ক্লাস সিক্সে পড়ি। আমেনার দেহটা এতটাই বাড়ন্ত, অবাক হলো শ্রাবণ। তার তো উপরের শ্রেণীতে থাকা উচিত ছিল। যাহোক সে ভাবনা শ্রাবণের নয়। তাদের বই নিয়ে বসতে বলল। রহমান হাজির চারটি সন্তানের পড়ালেখার মেধা দেখে, শ্রাবণ হতাশ না হয়ে পারল না। এদের আরো এক যুগ , আদর্শ লিপির জ্ঞান সাধনা করা উচিত। এখনো বর্ণমালা পর্যন্ত চেনে না। এই ষষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তি হওয়া ছাত্রী আমেনা। এখানকার অভিভাবক আর শিক্ষকদের বিবেকসম্পন্ন জ্ঞান দেখে, শ্রাবণ চরমভাবে আহত হলেন। আমেনাকে শুধু বছর শেষে ঠেলে ঠেলে উপরে উঠানো হয়েছে। অথচ তার মগজে নাই এতটুকু শিশুতোষ শিক্ষার প্রভাব। শ্রাবন তাকে ইংরেজি আলফাবেট সম্পর্কে জানতে চাইলো। মেয়েটি চুপ করে রইল। কিন্তু বাক-প্রদর্শনে ভীষণ পটু। পারুক বা নাইবা পারুক, স্যারের কথার শেষে, উত্তর তার সাথে সাথে। শ্রাবণ বলল, আচ্ছা আমেনা তুমি বলতে পারো, ইংরেজি বর্ণমালা কয়টি?
–স্যার এইটা তো সহজ।
–তবে বলো দেখি।
–এই বেশি না ৩০-৪০ টার মতো তো হইবোই।
–গুনে গুনে আমাকে বলো দেখি।
আমেনা এক এক করে গুনতে লাগলো। জেড পর্যন্ত এসে থেমে গেল,জিহবায় কামড় দিয়ে।
–কয়টি হলো?
–স্যার ছাব্বিশটার মত হইছে।
–বাকিগুলো কোথায় গেল? বা তাদের নামগুলো কি কি?
শ্রাবণ এদের পড়ালেখার তলদেশ দেখে, আশ্চর্য হল কিন্তু হতাশ হলো না। কারণ সে জানে, কিভাবে এদেরকে সুশিক্ষা দিতে হবে? শুধু আশ্চর্য হল এদের অভিভাবক আর স্কুলের কতিপয় শিক্ষকের, সচেতনতা দেখে। শুধু ক্লাসের পর ক্লাস পার করে দিয়েছে। কিন্তু কতটুকু অর্জিত হয়েছে তা একবারও পরখ করেননি। অথচ এই দোষ যুক্ত চারাগুলো একদিন বড় হয়ে, না দিতে পারবে কোন মিষ্টি ফল না ছড়াতে পারবে ভবিষ্যতের বাতাসে সুন্দর ফুলের সুবাস। শ্রাবণ এদেরকে পড়াতে পড়াতে, শীতের মধ্যেই ঘর্মের জলে সিক্ত হয়ে উঠলো। ছাত্রছাত্রীরা আজকের মত বিদায় নিল। রহমান হাজী এসে বললেন, স্যার হাতমুখ ধুইয়া লন, ভাত দিতাছি। খাইয়া দাইয়া শুয়ে পড়েন। শ্রাবণ পুকুরের ঘাটে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে এসে, খাটের কোণে চুপ করে, বসে রইল। এক এক করে খাদ্যর বহর সম্মুখে উপস্থিত করা হলো। কি খাবার এসেছে, তাতে শ্রাবণের বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। সে কিছুটা অন্যমনস্ক। ভাবছে লজিং মাস্টার কেমন হয়? রহমানের কথায় তার অন্যমনস্কতা ভঙ্গ হল।
–স্যার খাবার দিছি খাইয়া লন। শ্রাবণ খাবার টেবিলে তাকিয়ে অবাক! মস্ত প্লেটে, ধোয়া উড়ন্ত গরম ভাত। বড় সাইজের কই মাছ,মাছটি প্লেটের অর্ধেক ভাত ঢেকে রেখেছে। একটি কাঁচের গ্লাস, অনেকটাই এঁটো। গৃহিণী হয়তো পরিষ্কার করার সময় পায়নি। একটি ছেঁড়া কাগজের উপর অনেক খানিক লবণ। হয়তো লবণের বাটি, লবণ চোরা নিয়ে গেছে। শ্রাবণ মনে মনে হো হো করে হাসছে। সেই হাসিতে নেই কোন শব্দ। সেই চাপ না সামলানোর কারণে, তার ঠোঁটটি মাঝে মাঝে কেঁপে উঠছে। রহমান বলল, ভাইজান খাবার ভালো হয় নাই? মিটমিট কইরা হাসেন ক্যান?
–না রহমান ভাই। খাবার ভালো হয়েছে। তবে এত বড় কৈ মাছ আগে না দেখেছি, না খেয়েছি। তাই হাসি আসছে।
–স্যার এটা আমাদের পুকুরের মাছ। এর চাইতেও আরো ভালো বড় মাছ আছে। আপনাকে খাওয়াবো। শ্রাবণ পূর্ণ প্লেট, আর শূন্য করতে পারলো না। তার অবস্থান বারান্দার ওই রুমে। ভেতরের রুমের দরজা আটকে দিল। রহমান দম্পতি। কিছুটা নীরব হল রাতের এই সময়। শ্রাবণ হ্যারিকেনের আলোতে, কিছুক্ষণ পড়াশোনা করল। আজ কেমন যেন নতুন পরিবেশে এসে, কিছুটা দৈহিক দুর্বলতা অনুভব করছে। শ্রাবণ ভাবলো,নাহ! আজ একটু শীঘ্রই ঘুমের দেশে হারিয়ে যাব। বারান্দার শয়ন খাটটি বেশ বড় এবং চওড়া। বিছানাটা ঝেরে মুছে, জানালা বন্ধ করে দরজা বন্ধ করতে গিয়ে, শ্রাবণের হাত থমকে গেল। দরজাটির কোনো কপাট নেই। ভাবল দরজা না আটকে কিভাবে ঘুমাবে? এখানে চোর নেই তো? আর থাকলেই বা কি আসে যায়? গরিব শিক্ষকের কিবা আছে? তোর বেচারা অযথাই লজ্জায় পাবে। আছে শুধু কিছু বই আর এক সেট পুরনো কাপড়-চোপড়। আর পুরনো মানিব্যাগে, একটি পুরনো ২০ টাকার নোট। এই টাকাটা তার মায়ের দেওয়া। তাই স্মৃতি হিসেবে আজও শ্রাবণ খরচ করেনি। কোন উপায় না পেয়ে, দরজাটাকে কোনরকমে ঠেলে লাগিয়ে দিল। শ্রাবনের ছোটবেলা থেকে অভ্যাস সে কারো সাথে , একই বিছানায় ঘুমোতে পারে না। তাহলে সেই রাতে তার আর ঘুম হয় না। কিন্তু পিতা মাতার কথা ভিন্ন। তাদের গলা জড়িয়ে ঘুমানোর তৃপ্তি ভিন্ন। বড় বড় নিশ্বাস ছেড়ে, তৃপ্তির হাই তুলে শ্রাবণ ঘুমিয়ে পড়ল। রাত্র ঠিক কটা বাজে, শ্রাবণ বলতে পারবেনা। সম্ভবত মধ্যরাত। হঠাৎ সে অনুভব করলো, ঘুমের ঘোরে, কে বা কারা যেন, তার দেহের উপরে, হাত-পা বারবার উঠিয়ে দিচ্ছে। শ্রাবণ ঘুমের মধ্যে যতই সরিয়ে দিচ্ছে, কিন্তু জোকের মত, তাদের হাত-পা আবারো তার দেহে ফিরে আসছে। শ্রাবণ এবার উঠে বসলো। আঁধারে কম্পিত হস্তে হাতরে বুঝলো, প্রায় ৪-৫ জন তার ডানে বামে, অর্ধ উলঙ্গ ভাবে গভীর নিদ্রায় নিদ্রিত। মৃদু নাসিকা ইন্দ্রিয় ধ্বনিতে, দুই একজনের পরনের লুঙ্গি, পায়ের থেকে উপরে উঠে গেছে। হ্যারিকেন জ্বালানোর ব্যবস্থা নেই। কারণ হাতের কাছে তার দেশলাই নেই। বাকি রাতটুকু সে বসে বসে কাটিয়ে দিল। কখন যে টেবিলে মাথা রেখে তন্দ্রা আসলো তা সে টের পায়নি। সকালে ঘুম ভাঙলে জেগে দেখল, শোবার খাট তার শূন্য। শয়ন রত লোকগুলো নিমিষেই গায়েব।

প্রথম পর্ব পড়ুন –

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *