সংস্কার নাকি ধারাবাহিকতা: নতুন সরকারের কাছে নাগরিকের প্রত্যাশা

আফরিদা ইসলাম : নব নির্বাচিত সরকারকে ঘিরে স্বাভাবিকভাবেই জনগণের প্রত্যাশা অনেক বেশি। দীর্ঘদিনের শাসনব্যবস্থার নানা সীমাবদ্ধতা ও ব্যর্থতার কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের হতাশা তৈরি হয়েছিল। তাই নতুন সরকারকে শুধু ধারাবাহিকতা বজায় রাখলেই হবে না, বরং প্রয়োজন সময়োপযোগী ও কার্যকর সংস্কার।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে দেশের অর্থনীতি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকিং খাতে অনিয়ম ও দুর্নীতি সাধারণ মানুষের জীবনকে কঠিন করে তুলেছে। কর-জিডিপি অনুপাত কম হওয়ায় রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর দিকে গুরুত্ব দিতে হবে। কর ব্যবস্থাকে সহজ, স্বচ্ছ ও দুর্নীতিমুক্ত করতে পারলে জনগণের আস্থা বাড়বে এবং অর্থনীতির ভিত্তি আরও শক্তিশালী হবে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল রাখতে অর্থ পাচার রোধ ও হুন্ডি নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রবাসীদের রেমিট্যান্স পাঠাতে উৎসাহিত করতে প্রণোদনা বৃদ্ধি ও সহজ ব্যাংকিং সুবিধা নিশ্চিত করা জরুরি। একইসঙ্গে ব্যাংক লুট ও খেলাপি ঋণের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিতে হবে।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন নতুন সরকারের জন্য অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ। জনগণ এমন একটি রাষ্ট্র চায়, যেখানে নিরাপত্তা নিশ্চিত থাকবে এবং কেউ অন্যায়ভাবে নিপীড়নের শিকার হবে না। দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার জন্য সমান অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে না পারলে কোনো উন্নয়নই টেকসই হবে না।

“জুলাই সনদ” রাষ্ট্র সংস্কারের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দলিল হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। জুলাই-২০২৪ এর গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজের ঐকমত্যের ভিত্তিতে প্রণীত এই সনদে রাষ্ট্র সংস্কারের বহু গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবনা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। বিশেষ করে বিচার বিভাগ, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংস্কার, নির্বাচনী ব্যবস্থার স্বচ্ছতা এবং ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার বিষয়গুলো এতে গুরুত্ব পেয়েছে। যেসব বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য রয়েছে, সেগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করা উচিত। আর যেসব বিষয়ে মতভেদ রয়েছে, সেগুলো জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করতে হবে। জুলাই সনদের কার্যকর বাস্তবায়ন হলে গণঅভ্যুত্থানের চেতনা বাস্তবে প্রতিফলিত হবে এবং একটি জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে উঠবে।

বেকারত্ব দেশের অন্যতম বড় সমস্যা। বিপুল জনগোষ্ঠীকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করা এখন সময়ের দাবি। আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী প্রশিক্ষণ, ভাষা শিক্ষা এবং কারিগরি দক্ষতা উন্নয়ন করতে পারলে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনও বাড়বে। শিক্ষা ব্যবস্থায় গুণগত পরিবর্তন আনতে হবে।তথ্যপ্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানে দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে যুবসমাজকে প্রস্তুত করতে হবে। একইসঙ্গে উদ্যোক্তা তৈরিতে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে, যাতে তরুণরা চাকরির পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা, উচ্চ ফি, প্রশ্নফাঁস ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করা জরুরি। এতে তরুণদের সময় ও শ্রম সাশ্রয় হবে এবং তারা দ্রুত কর্মজীবনে প্রবেশ করতে পারবে।অর্থনৈতিক উন্নয়ন যেন কেবল অবকাঠামো নির্মাণে সীমাবদ্ধ না থাকে; বরং কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দারিদ্র্য হ্রাস এবং আয় বৈষম্য কমানোর দিকেও গুরুত্ব দিতে হবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সহায়তা, কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার এবং নতুন খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো সময়ের দাবি।

পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রেও ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান বজায় রাখতে হবে। প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় দৃঢ় অবস্থান নিতে হবে।সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—রাষ্ট্রক্ষমতা যেন কোনোভাবেই ব্যক্তিগত বা দলীয় স্বার্থসিদ্ধির মাধ্যম না হয়ে ওঠে। স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং সুশাসন নিশ্চিত করতে না পারলে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ সম্ভব হবে না।

সর্বোপরি বলা যায়, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ এবং জুলাই ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের চেতনা ধারণ করে যদি নতুন সরকার দৃঢ়তা ও নৈতিকতার সঙ্গে দেশ পরিচালনা করে, তবে একটি ন্যায়ভিত্তিক, গণতান্ত্রিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব।

লেখিকা : শিক্ষার্থী, ইডেন মহিলা কলেজ, ঢাকা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *