কূটনীতির ব্যর্থতায় জ্বলছে মানবসভ্যতা

সাবিহা তারান্নুম মিম : বিশ্বে বহমান এক দমকা হাওয়া উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে বিশ্ব শান্তি। চারিদিকে অদৃশ্য পরাশক্তিগুলোর প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতায় অনুভূত হচ্ছে যুদ্ধের দামামা। মাত্র কিছু বছর পূর্বে গোটা বিশ্ব যেমন সংক্রমিত হয়ে পড়ে এক ভাইরাসের কবলে। তেমনি হঠাৎ করে যেন বিশ্ব আবারো সংক্রমিত হয়ে পড়েছে নতুন আশঙ্কায় যার নাম যুদ্ধ। সাম্প্রতিক যুদ্ধের ভয়াবহ পরিস্থিতির গভীরতা উঠে আসছে বিভিন্ন সংকটজনক পরিস্থিতির চিত্রে এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ধারাবাহিক খবরের প্রবাহে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে যেন তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের ছায়া পড়েছে বিশ্ব আকাশে।

ইরান-ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ সম্পর্কের ফলে দীর্ঘদিনের বিরোধ প্রায় ৪৫ বছর ধরে চলমান। মূলত দ্বন্দ্বের সূত্রপাত নব্য নির্বাচিত সরকারের ১৯৭৯ সালে Iranian Revolution এর পরবর্তী সময়ে ইসরাইল শত্রু রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা।

পারমাণবিক শক্তিধর দেশগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রেক্ষিতে সাম্প্রতিক সকল সামরিক হামলা, প্রক্সি যুদ্ধ এবং আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা সবকিছুই ধীরে ধীরে পরিস্থিতিকে করে তুলেছে বেসামাল। বর্তমানে পাকিস্তানের আলোচনা টেবিলের শীতল চায়ের কাপের মতো উড়ে যাচ্ছে মধ্যস্থতা করে সমাধানের পথে এগিয়ে যাওয়ার গুরুত্বের ধোঁয়া। কেননা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো ছাড়িয়ে এখন গোটা বিশ্বই রয়েছে হুমকির মুখে। ইসলামাবাদের আলোচনার মূল উদ্দেশ্য চরিতার্থ না হলে যুদ্ধের ঝুঁকি বিশ্বের অর্থনৈতিক খাতে মারাত্মকভাবে প্রভাব ফেলবে। এমনকি যা এখন সীমান্তরেখা পার হয়ে সুস্পষ্ট হয়ে উঠছে সাধারণ মানুষের জীবনে। এই যুদ্ধের সাময়িক নীরবতা ছিলো যেন ঝড়ের আগে নীরবতার মতো উত্তেজনাপূর্ণ। শেষপর্যন্ত সাম্প্রতিক পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় আয়োজিত এ শান্তি চুক্তির  সফলতা সম্পর্কে রয়েছে গভীর আশঙ্কা। সংলাপে বসে দীর্ঘ একুশ ঘন্টার রুদ্ধশ্বাস আলোচনার পরেও  চুক্তির ব্যর্থতার আবাস বর্তমান বিশ্বের উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দু।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কূটনৈতিক অপপ্রচেষ্টা কিংবা আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা সহ পুরো বিশ্বেই সৃষ্টি করেছে প্রতিকূল পরিস্থিতি।  বৈশ্বিক পরিমন্ডলে এ সংকট পূর্ণ অবস্থা শুধু দুটি দেশের ক্ষমতা প্রদর্শনীতে সীমাবদ্ধ নয় বরং এর ঘাত প্রতিঘাতে স্থবির হয়ে পড়ছে বিশ্ব। ভারসাম্য হারিয়ে ফেলছে বাংলাদেশসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো। শুধু হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে জ্বালানি সংকটপূর্ণ অবস্থা নয় বরং নাড়িয়ে দিচ্ছে বিশ্ব অর্থনীতির ভিত। পুরো বিশ্বে জ্বালানি নিরাপত্তার ঝুঁকি, মূল্যস্ফীতি সহ অর্থনৈতিক বিভিন্ন চাপ রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিতিশীল পরিস্থিতিকে প্রকট করে ফেলেছে। সাম্প্রতিক এই সংঘাতের প্রভাবকে তিনটি শ্রেণীতে বিশ্লেষণ করা যায়। প্রাথমিকভাবে সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করেও লেবানন, সিরিয়া ও ইরাকের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা। এছাড়াও প্রভাব ফেলছে মানবিক পরিস্থিতিতেও। যুদ্ধের হামলার দরুন উত্তেজনাপূর্ণ অবস্থা সহ  তৈরি করছে সাধারণ নাগরিক নিরাপত্তা ঝুঁকি, বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা, বাজার ব্যবস্থায় অস্থিরতা, রপ্তানি বাণিজ্য কার্যক্রম ব্যাহত হওয়া। পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশ কাতার, মিশর, ইয়েমেন, সৌদি আরব জুড়ে রয়েছে সংঘাতের কারণে উদ্বেগ। তাদের আর্থিক বিশ্লেষণে উঠে আসছে অনিশ্চয়তা এবং দুর্বিসহ নানা অর্থনৈতিক দুরবস্থা।

বিশ্বমঞ্চের এ অর্থনৈতিক ঝুঁকি আন্তর্জাতিক বাজারের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার ফল। তাছাড়াও পরোক্ষভাবে দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার দেশসহ, বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলংকা, এ সকল দেশগুলোতেও যুদ্ধের ভয়াবহ প্রভাব পড়েছে। শক্তিশালী রিজার্ভ ছাড়া জ্বালানি সরবরাহ সংকট, খাদ্য সহ উৎপাদন ব্যবস্থায় মূল্যস্ফীতির সংকটে তৈরি করেছে অর্থনৈতিক চাপ। যে বিশ্ব পরিস্থিতি বর্তমানে বিদ্যমান তা এখনো কোনো সমাধানের পথে না গিয়ে চলমান অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি তৈরী করেছিলো অস্থিতিশীলতার চরম পর্যায়।

সংঘাতকে কেন্দ্র করে  সমঝোতার উদ্দেশে আলোচনার পর ফলপ্রসূ কোন তথ্য এখনো প্রকাশ না হওয়ার ফলে আতঙ্ক জেঁকে বসে আছে বিশ্ববাসীর মনে। এ নাজুক পরিস্থিতিতে দীর্ঘস্থায়ী অশান্তি বিশ্বকে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের কালো অধ্যায় আগমনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এই সংকটপূর্ণ পরিস্থিতির প্রভাবে বাংলাদেশের মতো ভঙ্গুর অর্থনৈতিক অবস্থাসম্পন্ন দেশগুলোতে এখনো জ্বালানি সরবরাহের দীর্ঘ সারিতে প্রতিফলিত। ইরানের কৌশলগত শক্তি হিসেবে হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বিতা পরিস্থিতিকে আরও সংবেদনশীল করে তুলেছে। এই গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীকে নিয়ে মার্কিন নেতার সতর্কবার্তার বিপরীতে অবস্থান করছে বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশ। 

যা ক্রমেই পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলছে। এছাড়াও পারমাণবিক প্রকল্প ইস্যুকে কেন্দ্র করে দুই দেশের সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতি যে সমস্যা সৃষ্টি করছে। তাতে তাদের সামান্যতম ভুল পদক্ষেপ পুরো বিশ্বের নিরাপত্তায় বিপর্যয় ঘটাতে পারে। সংঘাতে সরাসরি দুই পক্ষই শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। ফলে দীর্ঘ আলোচনার পরেও এখনো কোনো সমঝোতার দেখা মিলেনি। নিজেদের অবস্থানে কঠোর থাকার ফলে নস্যাৎ হওয়ার পথেই আলোচনা সভা। বরং ঝুঁকিপূর্ণ সামরিক আঘাত এবং ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর পাল্টা প্রতিঘাত আচ্ছন্ন করছে এক ভয়াবহ অনিশ্চয়তা।  পাশাপাশি গর্জে উঠছে বিশ্বের আরো কিছু দেশের হুঁশিয়ারির চরম বার্তা। তাই সংঘাতে জড়িয়ে থাকা দেশগুলোর নিজেদের স্বার্থকে উপেক্ষা করে বিশ্ববাসীর নিরাপত্তা রক্ষা এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

নির্মমতার ঊর্ধ্বে গিয়ে ন্যায় ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করে প্রতিষ্ঠা করতে হবে শান্তির পতাকা। মানচিত্রে সাজানো প্রতিটি দেশকে ক্ষমতার ঘাত প্রতিঘাত উপেক্ষা করে অর্জন করতে হবে বিশ্ববাসীর নিরাপত্তা। সে লক্ষ্যে পূর্ণাঙ্গ স্থায়ী শান্তি চুক্তির উদ্দেশ্যে  মধ্যস্থতার দরজা উন্মুক্ত করে দেশগুলোকে বাড়িয়ে দিতে হবে সহমর্মিতার হাত। এখনই সময় সংঘাত পেরিয়ে সমঝোতার পথে এগিয়ে যাওয়া। কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণ করে সংকট নিরসনের পথ খুঁজে বের করা জরুরি। তবেই যুদ্ধের এই ধোঁয়াশা কাটিয়ে বিশ্ব আবারও দেখতে পাবে শান্তির আলো।

লেখিকা : শিক্ষার্থী, ইডেন মহিলা কলেজ,ঢাকা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *