জ্বালানির অভাবে বাংলাদেশ: শিল্প, কৃষি ও পরিবহনের ভবিষ্যৎ

রাখি আক্তার : একবিংশ শতাব্দীতে জ্বালানি বৈশ্বিক রাজনীতির অন্যতম ক্ষমতার উৎস বলা যায়। একটি দেশের জাতীয় নিরাপত্তা এবং ভূরাজনীতির প্রধান হাতিয়ার হিসেবে জ্বালানি অন্যতম। বিশ্বের প্রতিটি দেশেই আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা, শিল্প, পরিবহন, সামরিক শক্তি, প্রযুক্তিসহ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের যাবতীয় সবকিছু জ্বালানিনির্ভর। বিদ্যুৎ থেকে শুরু করে পরিবহন, সকল কিছুই জ্বালানি ছাড়া পরিচালনা করা সম্ভব নয়।

এজন্যই বর্তমানে দেখা যাচ্ছে জ্বালানির কারণে বাংলাদেশের মানুষের জীবনযাত্রার মাঝে সমস্যা যেন বেড়েই চলেছে। প্রতিদিন হাজারো মানুষের তেল নেওয়ার কারণে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছে, তবুও কাঙ্ক্ষিত তেল পাচ্ছে না। কৃষক তেলের অভাবে ফসলে পানি দিতে পারছে না, তেল সাশ্রয় করতে শপিং মল সন্ধ্যা ৬টার পর বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, ফলে ব্যবসায়ীরা ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। স্কুল-কলেজের ক্লাস অনলাইনে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে, ফলে শিক্ষার্থীদের পড়ালেখার ক্ষতি অনেকাংশে বেড়ে যাবে এবং তাদের মাঝে মানসিক বৃদ্ধির বিকাশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

বাংলাদেশের শিল্পখাতের বড় একটি অংশই গ্যাসনির্ভর। এ-সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে শিল্পকারখানার উৎপাদন কমে যাবে, ফলে রপ্তানিমুখী বিভিন্ন শিল্প চরম ক্ষতির সম্মুখীন হবে। এমনকি বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক প্রধান চালিকাশক্তি কৃষি। জ্বালানি সংকট কৃষি খাতকে ভয়াবহভাবে প্রভাব ফেলতে পারে। সেচযন্ত্র, ধান মাড়াই, পরিবহন এবং সার উৎপাদন—সবকিছুই জ্বালানিনির্ভর। ফলে ডিজেল সংকটে কৃষক সময়মতো জমিতে পানি দিতে পারছে না, ফলে ফসল উৎপাদন হ্রাস পাওয়ার সম্ভাবনা থাকছে। এতে খাদ্য সংকট ও দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

আমদানিনির্ভর অর্থনীতির বাংলাদেশে তেল, গ্যাস, কয়লার এক বড় অংশ বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। ফলে বৈশ্বিক বাজারে চাপ পড়লে তার প্রভাব এসে পড়ে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে। পরিবহন খাতে জ্বালানি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বর্তমান পরিস্থিতির ন্যায় চলতে থাকলে ভবিষ্যতে পরিবহন খাত প্রায় অচল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই এখনই প্রয়োজন বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার দিকে নজর দেওয়ার। স্থানীয় গ্যাস অনুসন্ধানের ব্যবস্থা গ্রহণ করা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সৌরবিদ্যুৎ, বায়ুশক্তি এবং বিদ্যুতের সাশ্রয়ী ব্যবহার গ্রহণ করা, পাশাপাশি শিল্প, কৃষি ও পরিবহন খাতে বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার শুরু করা জরুরি। অন্যথায় বাংলাদেশ এক বিরাট অর্থনৈতিক সংকটের দিকে ক্রমশ ধাবিত হবে, যেখানে মানুষ হয়তো সামান্য খাদ্যদ্রব্য পেতেও হিমশিম খাবে।

লেখিকা : শিক্ষার্থী, ইডেন মহিলা কলেজ, ঢাকা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *