সোনিয়া আবেদীন
ভালোবাসা কখনো হিসেব করে আসে না ,এটা হঠাৎ করেই এসে জীবনটাকে বদলে দেয়।আকাশ আর তারা দু’জনের গল্পটাও ঠিক তেমনই।কলেজ জীবনের শেষ বছরে তাদের পরিচয় , প্রথমে শুধু বন্ধুত্ব, তারপর সেই বন্ধুত্বের ভেতরেই অদ্ভুত এক টান। আকাশের শান্ত স্বভাব, আর তারার প্রাণবন্ত হাসি দু’জন যেন একে অপরের অ*পূর্ণতা পূরণ করে।
তারা সবসময় বলতো,তুমি না থাকলে আমি একদম অসম্পূর্ণ।আকাশ হেসে উত্তর দিতো,তুমি থাকলেই তো আমি সম্পূর্ণ। তাদের ভালোবাসা সহজ ছিল না, পরিবারের আপত্তি, সমাজের চাপ সবকিছুই ছিল তাদের বিরুদ্ধে। কিন্তু তারা হার মানেনি, অনেক লড়াই, কান্না, অভিমান পেরিয়ে অবশেষে তারা বিয়ে করে।
বিয়ের দিনটা খুব জাঁকজমকপূর্ণ ছিল না, কিন্তু ভালোবাসায় ভরা ছিল। ছোট্ট একটা বাসা , নিমতলির এক কোণায় , সেখানেই শুরু হয় তাদের নতুন জীবন।ফ্ল্যাটটা খুব বড় ছিল না , একটা ছোট্ট বেডরুম, একটা রান্নাঘর, আর বারান্দা।
দেয়ালে ছোট ছোট ছবি, জানালার পাশে ফুলের টব, আর বিছানার ওপর নীল চাদর।আকাশ অফিস থেকে ফিরে দরজায় দাঁড়িয়ে বলতো, আমি রাজপ্রাসাদে ঢুকতে পারি?
তারা মুচকি হেসে বলতো,এই রাজপ্রাসাদের রাজা তুমি, অনুমতি লাগে কি ? বিয়ের এক বছর পর , একদিন তারা কাঁপা কাঁপা গলায় বলেছিল আকাশ আমি মা হতে যাচ্ছি।
এক মুহূর্তের জন্য আকাশ চুপ হয়ে গিয়েছিল ,তারপর হঠাৎ করেই সে তারাকে জড়িয়ে ধরে।তার চোখ ভিজে উঠেছিল , সত্যি? আমরা বাবা-মা হবো? তারা হেসে বলেছিল ,হ্যাঁ আমাদের ছোট্ট একটা পৃথিবী আসছে।সেদিন থেকেই তাদের জীবন বদলে যায় , আকাশ আরও দায়িত্বশীল হয়ে ওঠে। অফিস থেকে ফেরার সময় ফল, দুধ, ওষুধ সব নিয়ে আসে। আর তারা প্রতিদিন নিজের পেটে হাত রেখে সন্তানের সাথে কথা বলে।বাবু , তুমি তাড়াতাড়ি এসো আমরা তোমার জন্য অপেক্ষা করছি।
সময়ের স্রোত ,তারা ধীরে ধীরে ভারি হতে থাকে। তার হাঁটা ধীর হয়ে যায়, কিন্তু মুখের হাসি কমে না।
আকাশ প্রতিদিন রাতে তারার পাশে বসে পেটে হাত রেখে বলে , আমি তোমার বাবা , মা আমরা তোমাকে অনেক ভালোবাসি।
তারা বলে,ও তোমার মতো শান্ত হবে, না আমার মতো দুষ্ট? আকাশ বলে, ও হবে আমাদের মতো ভালোবাসায় ভরা।
নিমতলির এলাকাটা বেশ পুরোনো , সরু গলি, পুরোনো বিল্ডিং, কমিকেলে ভরা আর ইলেকট্রিক তারগুলো এলোমেলো ভাবে ঝুলে থাকতো। আপনজনরা মাঝে মাঝে বলতো এই জায়গাটা নিরাপদ না, সাবধানে থাকবি।
কিন্তু ভালোবাসার মানুষগুলো যখন একসাথে থাকে, তখন ভয়গুলোকে খুব ছোট মনে হয়।আকাশ বাবু আসলে বড় একটা বাসা নিবে চিন্তা করে।
তারার নয় মাস চলছে , সেদিন রাতটা ছিল অন্য দিনের মতোই। আকাশ অফিস থেকে একটু তারাতারি ফিরল , তারা দরজা খুলে বলেছিল,
আজ এত তারাতারি ? তোমাদের জন্য এসেছি।
তারা হেসে বলেছিল,তুমি না থাকলে আমি কী করতাম?রাতের খাবার শেষে তারা বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল। হালকা বাতাস, আকাশে অর্ধেক চাঁদ।হঠাৎ দূরে কোথাও একটা চিৎকার শোনা গেল। আগুন , আগুন।
আকাশ আর তারা দু’জনেই চমকে উঠলো ,
প্রথমে তারা বিষয়টা গুরুত্ব দেয়নি। কিন্তু কয়েক মিনিটের মধ্যেই ধোঁয়ার গন্ধ নাকে আসতে শুরু করলো।
আকাশ জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখলো
দূরের একটা বিয়ে বাড়িতে আগুন লেগেছে।কিন্তু আ*গুনটা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই পুরো এলাকা চিৎকারে ভরে গেল। সবাই পালাউ আগুন ছড়িয়ে পড়ছে।তারা ভয় পেয়ে আকাশের হাত শক্ত করে ধরলো।আকাশ আমাদের কি কিছু হবে? আকাশ নিজেকে শক্ত করে বললো,না আমি আছি তো। কিন্তু তার নিজের গলাও কাঁপছিল। কিছু বুঝার আগেই ধোঁয়া ধীরে ধীরে তাদের ফ্ল্যাটের ভেতরে ঢুকতে শুরু করলো।আকাশ দ্রুত দরজার দিকে এগিয়ে গেল কিন্তু বাইরে আগুনের লেলিহান শিখা , সিঁড়ি দিয়ে নামা অসম্ভব।
তারা তখন হাঁটতেও কষ্ট পাচ্ছিল ,ভারি শরীর, শ্বাস নিতে কষ্ট। আকাশ আমি পারছি না ,
আকাশ তাকে ধরে বসিয়ে দিলো , তার চোখে তখন ভয় আর অসহায়তা।
সে চারদিকে তাকালো কোনো পথ নেই , আকাশ তারার পাশে বসে তার হাত ধরলো।ভয় পেয়ো না আমরা একসাথেই আছি। তারা কাঁদতে কাঁদতে বললো ,আমাদের বাচ্চা ওকে বাঁচাও , আকাশের চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়লো। সে তারার পেটে হাত রেখে ফিসফিস করে বললো বাবু আমাকে মাফ করে দিও।ধোঁয়া ঘর ভরতে লাগলো , আগুন ধীরে ধীরে কাছে আসছিল।তারা আকাশের কাঁধে মাথা রাখলো , আমরা একসাথেই থাকবো তাই না?আকাশ তাকে জড়িয়ে ধরে বললো চিরকাল ।আ*গুন তখন তাদের ঘর গ্রাস করে নিলো আর ভালোবাসা ধীরে ধীরে ছাই হয়ে গেলো ।
চারদিকে শুধু গরম আর দমব*ন্ধ করা একটা অ*ন্ধকার ,বাইরে মানুষের চি*ৎকার, ভেতরে আ*গুনের শব্দ সব মিলিয়ে এক ভ*য়ংকর প*রিস্থিতি।আকাশ বুঝে গেছে সময় খুব কম ,
সে দ্রুত একটা ভেজা কাপড় নিয়ে তারার মুখে ধরলো।
এইটা দিয়ে নাক-মুখ ঢেকে রাখো শ্বা*স নিতে একটু সুবিধা হবে।তারা কাঁপা কাঁপা হাতে কাপড়টা ধরলো। তার চোখে তখন শুধু ভয় নয় একটা অ*দ্ভুত শান্তিও ছিল।আকাশ আমাদের কি সত্যিই কিছু হবে? আকাশ একটু থেমে গেলো , মিথ্যে আশ্বাস দিতে গিয়েও তার গলা আটকে গেলো।আমি চে*ষ্টা করছি তুমি শ*ক্ত হও।
দরজার ওপাশে আ*গুন আকাশ বারবার চে*ষ্টা করছিলো কোনো একটা পথ বের করতে।সে জানালার গ্রিল খুলতে চে*ষ্টা করলো, কিন্তু সেটা শ*ক্তভাবে আটকানো , তার হাত কেটে গেলো। র*ক্ত বের হতে লাগলো , তবুও সে থামলো না ,
তারা কাঁদতে কাঁদতে বললো থাক আর ক*ষ্ট কোরো না।
আকাশ ঘুরে তাকালো , তার চোখ লাল হয়ে গেছে।
আমি কিছু না করে বসে থাকবো? তোমাদের বাঁচাতে না পারলে আমি বাঁচবো কিভাবে?
তারা তখন নিজের পেটে হাত রেখে বসে আছে বাবু তুমি শোনো তোমার আব্বু অনেক চে*ষ্টা করছে ।তার গলা কেঁপে উঠলো , তুমি যদি আমাদের কাছে না আসতে পারো তাও আল্লাহ তোমাকে ভালো রাখুক । এই কথা শুনে আকাশ যেন ভেঙ্গে পড়লো , এইসব কথা বলো না ।আমাদের বাচ্চা আমাদের কাছেই থাকবে,
কিন্তু তার নিজের কণ্ঠেও বিশ্বাসের চেয়ে ব্যথা বেশি ছিল।
বিদ্যুৎ চলে গেছে অনেক আগেই ঘরটা অ*ন্ধকার হয়ে গেছে।শুধু আ*গুনের আলো মাঝে মাঝে লাল করে তুলছে সবকিছু। আকাশ তারার পাশে বসে পড়লো।তার হাত শ*ক্ত করে ধরলো।তারা মনে আছে আমাদের প্রথম দেখা?তারা ক*ষ্টের মধ্যেও একটু হাসলো।তুমি তো আমাকে প্রথমে একদম পছন্দই করোনি , কারণ আমি ভয় পেতাম তুমি আমাকে বদলে দেবে।দিয়েছি তো ?হ্যাঁ আমার পুরো পৃথিবীটাই বদলে দিয়েছো।
ধোঁয়া আরও ঘন হয়ে আসছে , তারা ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। আকাশ একটা কথা বলবো? বলো । আমি খুব সুখী ছিলাম , আকাশ চুপ করে গেলো।তোমার সাথে কাটানো প্রতিটা দিন আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সময় ছিল। আকাশের চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়লো , আমিও তোমাকে ছাড়া আমি কিছুই না।
আ*গুন আরও কাছে হঠাৎ একটা বড় শ*ব্দ হলো , মনে হলো পাশের দেয়াল ভেঙে পড়েছে।
আ*গুন এখন তাদের ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়ছে।
তাপ এত বেশি যে দাঁড়িয়ে থাকা যাচ্ছে না।আকাশ তারাকে জড়িয়ে ধরলো। নিজের শরীর দিয়ে তাকে আড়াল করার চে*ষ্টা করলো । আমি আছি ভয় পেয়ো না , তারা ফিসফিস করে বললো আমরা আবার দেখা করবো? আকাশ চোখ ব* ন্ধ করে বললো হ্যাঁ অন্য এক জায়গায় যেখানে কোনো আ*গুন নেই।
শ্বা*স নিতে ক*ষ্ট হচ্ছে ,তারা ধীরে ধীরে আকাশের কাঁধে ঢলে পড়ছে। তার হাত এখনো নিজের পেটের ওপর। আকাশ তার কপালে চুমু খেলো , তুমি আমার সবকিছু তারা খুব আস্তে বললো তুমি আমার জান্নাত। আ*গুন তখন চারদিক থেকে তাদের ঘিরে ফেলেছে। ধোঁয়ার ভেতর, আ*গুনের তাপে দু’টা মানুষ একে অপরকে জড়িয়ে ধরে আছে।ভয় নেই, অভিযোগ নেই শুধু ভালোবাসা।
একসময় সবকিছু থেমে যায় ,চি*ৎকার থেমে যায়।
শব্দ থেমে যায়। শুধু ধোঁয়ার ভেতর একটা নীরবতা , যেন পৃথিবী নিজেই থমকে গেছে।
ভোরের আলো তখন ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে ,
নিমতলির সেই এলাকা যেখানে কয়েক ঘণ্টা আগেও ছিল মানুষের কোলাহল, জীবনের শ*ব্দ এখন সেখানে শুধু ধোঁয়া আর পোড়া গ*ন্ধ।
ফায়ার সার্ভিসের গাড়িগুলো তখনও পানি ছিটাচ্ছে। চারদিকে মানুষ কেউ কাঁদছে, কেউ হারিয়ে গেছে, কেউ খুঁজছে তার আপনজনদের।
উদ্ধারকর্মীরা একটার পর একটা পোড়া ফ্ল্যাটে ঢুকছে।কেউ বেঁচে আছে কি নাএই আশায়।
একজন কর্মী বললো এই দিকটা দেখেন , এখানে একটা পরিবার ছিল , ধ্বং*সস্তূপ সরানো হলো ধীরে ধীরে।কালো ছাই, ভাঙা দেয়াল, পুড়ে যাওয়া আসবাব সবকিছুর মাঝে তারা খুঁজে পেলো দু’টা মানুষকে।দু’জন একে অপরকে শ*ক্ত করে জড়িয়ে আছে।
দৃশ্যটা দেখে সবাই থেমে গেলো , একজন ফায়ারম্যান ধীরে বললো শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত একসাথে ছিল । আকাশ তারাকে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে রেখেছিল , যেন এখনো তাকে রক্ষা করার চে*ষ্টা করছে।আর তারা তার হাত এখনো নিজের পেটের ওপর। মাতৃত্ব আর ভালোবাসা দুটোই একসাথে জমাট বেঁধে আছে সেই দৃশ্যে।
কর্মীদের চোখে পানি কেউ একজন কাঁদতে কাঁদতে বললো , ওরা তো নতুন বিয়ে করেছিল।
আরেকজন বললো মেয়েটা মা হতে যাচ্ছিল ,
কথাগুলো বাতাসে ভেসে বেড়াতে লাগলো।
কেউ তাদের নাম জানতো না,কিন্তু তাদের গল্পটা সবাই অনুভব করছিল।
পরের দিনেই এই ঘটনাটা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে।
সংবাদপত্রে, সোশ্যাল মিডিয়ায় সব জায়গায় মানুষ এই গল্পটা বলতে থাকে।এক দম্পতি, যারা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত একে অপরকে ছাড়েনি , কেউ তাদের ছবি আঁকে,কেউ কবিতা লেখে।কেউ লিখে ভালোবাসা কখনো ম*রে না, সেটা ছাইয়ের ভেতরও বেঁচে থাকে।
কয়েক সপ্তাহ পর, সেই জায়গাটায় একটা ছোট্ট স্মৃতিফলক বসানো হয়।কেউ জানে না কে বসিয়েছে।সেখানে শুধু লেখা ছিল এখানে ভালোবাসা হারায়নি,এখানে ভালোবাসা অমর হয়েছে।কেউ বলে, ভালোবাসা কখনো শেষ হয় না।
হয়তো কোনো এক অদেখা জগতে আকাশ আর তারা আবার একসাথে আছে।সেখানে নেই আ*গুন, নেই ভয়।তারা হাঁটছে পাশাপাশি,
আর তাদের মাঝখানে দৌড়াচ্ছে একটা ছোট্ট শিশু হাসছে, ডাকছে আম্মু , আব্বু ।আকাশ আর তারা একে অপরের দিকে তাকিয়ে হাসছে।এইবার তাদের চোখে কোনো ভয় নেই , শুধু শান্তি।
পৃথিবীতে কিছু গল্প থাকে,যেগুলো শেষ হয়ে গিয়েও শেষ হয় না , আকাশ আর তারার গল্পটা তেমনই। তারা হয়তো নেই,কিন্তু তাদের ভালোবাসা রয়ে গেছে মানুষের মনে ।





















