স্মৃতিচারণ: স্মৃতির পাতায় বৈশাখ

শেখ সুলতানা মীম : পহেলা বৈশাখ আমার জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে অসংখ্য আনন্দঘন স্মৃতি। বিশেষ করে শৈশবের বৈশাখ যেন ছিল এক অন্যরকম উৎসব, যার কথা মনে পড়লেই আজও মন ভরে ওঠে অদ্ভুত এক আনন্দে। বৈশাখ মাস আসার আগেই কালবৈশাখী ঝড়ের আভাসে প্রকৃতিতে যেমন নতুন প্রাণের সঞ্চার হতো। সেই সঙ্গে আমার মনেও জন্ম নিত একরাশ উচ্ছ্বাস। মনে হতো, খুব আনন্দের একটি দিন যেন সামনে অপেক্ষা করছে। শৈশবে ১লা বৈশাখ মানেই ছিল নতুন জামা, মজার খাবার আর বন্ধুদের সঙ্গে মেলায় ঘুরতে যাওয়া। মেলা থেকে মাটির পুতুল, হাঁড়ি-পাতিল, ছোট ছোট খেলনা কিনে যে আনন্দ পেতাম, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। বাবার সঙ্গে দোকানে দোকানে ঘুরে হালখাতা খাওয়া এবং মিষ্টি নিয়ে বাড়ি ফেরা—এসব মুহূর্ত আজও মনে পড়ে যায় স্পষ্টভাবে। ১লা বৈশাখের আগের দিন বিকেল হলেই পাড়ায় শুরু হতো পিঠাপুলির উৎসব। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ত আনন্দের আমেজ। সেই সঙ্গে বাড়ির পেছনের জমি বা পুকুরপাড়ে সবাই মিলে ঘিমাই শাক তুলতে যাওয়া ছিল এক দারুণ অভিজ্ঞতা। কে বেশি শাক তুলতে পারে, তা নিয়ে আমাদের মধ্যে চলত মজার প্রতিযোগিতা—যেন ছোট্ট এক উৎসব। আরেকটি বিশেষ আনন্দ ছিল নতুন জামা পাওয়া। বৈশাখের কয়েকদিন আগে থেকেই দর্জির কাছে গিয়ে নতুন জামা বানানোর আবদার করতাম। মা-কে নিয়ে দর্জির দোকানে যাওয়া এবং লাল-সাদা রঙের কাপড় দেখে মন ভরে যাওয়া। এটাই যেন ছিল প্রাপ্তি। আর মা সেই কাপড় দিয়ে সুন্দর করে ফ্রক বানিয়ে দিতেন। বৈশাখের দিন সকালবেলা সেই জামা পড়ে সারা পাড়া ঘুরে বেড়াতাম এবং বন্ধুদের সাথে মেলায় গিয়ে হাওয়াই মিটাই খাওয়ার স্বাদ যেকোনো রেস্টুরেন্টেের দামি খাবারকেও পিছনে ফেলে দিবে। আবার আম গাছের নিচে গিয়ে দাড়িয়ে থাকতাম কখন একটু বাতাসে একটা আম মাটিতে পড়বে আর কে আগে সেই আমটা ধরতে পারবে। আম-কাঠাঁলের বৈশাখে কে প্রথম আম খেতে পারে তা নিয়ে চলতো প্রতিযোগিতা। আজ সময় বদলেছে, অনেক কিছুই আর আগের মতো নেই। তবুও সেই শৈশবের বৈশাখ, সেই আনন্দ আর উচ্ছ্বাস—সবই রয়ে গেছে মনের গভীরে। বৈশাখ এলেই মনে পড়ে যায় সেই সোনালি দিনগুলোর কথা, যা কখনো ম্লান হবার নয়, কখনো ভোলার নয়।

লেখিকা : শিক্ষার্থী, ইডেন মহিলা কলেজ, (ইংরেজি বিভাগ)।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *