নাজমুন নাহার : ধর্ষণ কেবল নারীর নিরাপত্তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে না, বরং এটি আইনের শাসন, জননিরাপত্তা এবং একটি সমাজ কতটা সভ্য ও মানবিক— তার ওপরও গভীর প্রশ্ন তোলে। তাই রাষ্ট্রের কাছে ধর্ষকের কঠোর শাস্তির প্রত্যাশা এখন নিছক দাবি নয়, বরং অপরিহার্য প্রয়োজন। অন্যথায় বিচারহীনতার সংস্কৃতি আমাদের সমাজকে আরও গভীর অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেবে। তৈরি করবে বিশৃঙ্খলা, জনমনে অসন্তোষ,ভীতি ও অনিশ্চয়তার পরিবেশ এবং নৈরাজ্যের দেশ ।
বর্তমান সময়ে দেশে ধর্ষণ ও দলবদ্ধ ধর্ষণের মতো নৃশংস ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ যেন ধর্ষণের মহোৎসব, যেখানে ধর্ষক নিশ্চিত জানে যে, কয়েকদিন আলোচিত সমালোচিত হলেও তার অপরাধের কোনো শাস্তি হবে না। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে যে, নারী, শিশু এমনকি বৃদ্ধরাও এই পৈশাচিকতার শিকার হচ্ছেন।
পরিবার থেকে শুরু করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল কিংবা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মতো সামাজিকভাবে নিরাপদ বলে বিবেচিত স্থানগুলোতেও যৌন সহিংসতার ঘটনা ঘটছে। ভোলার হাসপাতালে ভর্তিরত রোগিকে ধর্ষণ তার একটি উদাহরণ।
তথ্য : বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ
২০২৫ সালে দেশে ৭৮৬ জন নারী ও কন্যাশিশু ধর্ষণ ও দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছে, যা ২০২৪ সালের তুলনায় প্রায় ৫২ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়েছে।
তবে বাস্তবে এই সংখ্যা আরও বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ সামাজিক লজ্জা, ভয় এবং বিচারহীনতার আশঙ্কায় অনেক ভুক্তভোগী অভিযোগই করেন না। নরসিংদীর মাধবদীতে ধর্ষণের বিচার চাওয়ায় এক কিশোরীকে বাবার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে পুনরায় ধর্ষণের পর শ্বাসরোধ করে হত্যার অভিযোগ উঠে। এমন ঘটনায় প্রশ্ন জাগে— কোন সমাজে আমরা বসবাস করছি, যেখানে ভুক্তভোগীর নিরাপত্তাও নিশ্চিত করা যায় না? আমরা যেখানে ধর্ষকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির খবর শুনতে চাই, সেখানে ভুক্তভোগীর মৃত্যুর সংবাদ শুনতে হয়।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো— আইন, নীতি, নৈতিকতা কিংবা ধর্মীয় মূল্যবোধের ভয় কার্যকর প্রতিরোধ হিসেবে কাজ করছে না। কারণ দেশে আইন আছে কিন্তু তার বাস্তবায়ন নেই বললেই চলে। এই বিচারহীনতা অপরাধ প্রবণতার প্রধান কারণ।
বেসরকারি সংস্থা নারীপক্ষ এক গবেষণায় বলেছে, দেশের ছয়টি জেলায় ২০১১ থেকে ২০১৮ সালের জুন পর্যন্ত ৪ হাজার ৩৭২টি ধর্ষণের মামলা হয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ১ হাজার ২৮৩টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে, যাতে সাজা হয়েছে মাত্র পাঁচ জনের। প্রতিনিয়ত নতুন করে আরও মামলা যুক্ত হচ্ছে, যা তৈরি করছে মামলার স্তূপ। ফলে, ধর্ষণের বিচারপ্রার্থীদের ন্যায়বিচার পাওয়ার অপেক্ষা হচ্ছে দীর্ঘ। এজন্য প্রয়োজন দ্রুত বিচার ট্রাইবুনালের মাধ্যমে মামলাগুলোর নিষ্পত্তি করা।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, ধর্ষণের ক্ষেত্রে আমাদের সমাজে সাধারণত ভুক্তভোগীকেই একপাক্ষিকভাবে দোষারোপ করা হয়— তার পোশাক, চলাফেরা বা জীবনযাপনকে দায়ী করা হয়। এই মানসিকতা পরিবর্তন না হলে ধর্ষণ প্রতিরোধ করা কঠিন। একই সঙ্গে গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে নারীর পণ্যায়নও একটি বড়ো সামাজিক সমস্যা হিসেবে দেখা দিচ্ছে, যা নারীর প্রতি সম্মানজনক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে ওঠার পথে বাধা সৃষ্টি করে।
যে সমাজ বা রাষ্ট্র নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না, সেখানে উন্নয়নের সব দাবি নিছক মনে হয়। এই ধরনের নৃশংসতা রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও নাগরিক অধিকারকেও প্রশ্ন বৃদ্ধ করে। এর সমাধানে প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা। কারণ রাষ্ট্রের ন্যায়বিচার অপরাধীদের মনে ভীতি সৃষ্টি করে। রাষ্ট্রকে প্রয়োজন পুলিশের তদন্ত ব্যবস্থা শক্তিশালী করা, ফরেনসিক সক্ষমতা বাড়ানো এবং বিচার প্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক প্রভাব মুক্ত রেখে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। আরও প্রয়োজন, ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সাক্ষী সুরক্ষা আইন কার্যকর করা এবং দ্রুত বিচার ট্রাইবুনালের মাধ্যমে মামলাগুলোর নিষ্পত্তি করা।
প্রকৃতপক্ষে,রাষ্ট্র যদি ধর্ষকের বিচার নিশ্চিত না করে, সেটা হবে ধর্ষকদের উৎসাহিত করা। তাই বর্তমানে ধর্ষণ প্রতিরোধে সবচেয়ে প্রত্যাশিত দাবি হলো ধর্ষকের কঠোর শাস্তি কার্যকর করা। এজন্য চাওয়া একটাই বিচার, বিচার, এবং বিচার । শুধু কথায় নয়, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে রাষ্ট্রকে স্পষ্ট বার্তা দিতে হবে যে, এই দেশে নারীরা মর্যাদাপূর্ণ এবং দেশে আইনের শাসন আছে ।
লেখিকা : শিক্ষার্থী, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়।





















