পহেলা বৈশাখ : বাঙালি লোকজ সংস্কৃতির পুনর্জাগরণ

খাদিজাতুল খোরশেদ খুশি : পহেলা বৈশাখ বাংলা সনের প্রথম দিন। প্রতি বছর বাঙালি জাতি নানান আনন্দ, উল্লাসের মধ্যে দিয়ে নতুন বছর শুরু করে। এই দিনটি শুধু নতুন বছরের সূচনাই নয়, বরং বাঙালির ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। পহেলা বৈশাখ বাংলার লোকজ সংস্কৃতি ও হাজার বছরের ঐতিহ্য ধারণ করে। আধুনিক সংস্কৃতির স্রোতে লোকজ সংস্কৃতি বিলীন হওয়ার পথে থাকলেও পহেলা বৈশাখে তা নতুন করে প্রাণ নেয়। তখন বাংলার গ্রাম থেকে শহরে সকল জায়গায় লোকজ সংস্কৃতির আমেজ শুরু হয়। মূলত পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করেই এসব আমেজ এখনো আছে।

এখনো পহেলা বৈশাখ উদযাপনের অন্যতম আকর্ষণ মঙ্গল শোভাযাত্রা। ১৯৮৯ সালে দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সামাজিক সংকটের বিরুদ্ধে প্রতীকী প্রতিবাদ হিসেবে এই শোভাযাত্রা শুরু হয়। এরপর থেকে এটি এখনো চলমান। এই শোভাযাত্রায় বড় বড় রঙিন মুখোশ, পাখি-প্রাণীর প্রতিকৃতি ও নানা প্রতীকী শিল্পকর্ম বহন করা হয়। ২০১৬ সালে ইউনেস্কো কর্তৃক মানবতার অমূল্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি পায় মঙ্গল শোভাযাত্রা। প্রবাসী বাঙালিরা মঙ্গল শোভাযাত্রার আদলে ছোট শোভাযাত্রার আয়োজন করে।

মঙ্গল শোভাযাত্রা

বৈশাখী মেলা: প্রতিবছর বৈশাখকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন স্থানে মেলার আয়োজন করা হয়। এই মেলায় বাঙালিদের লোকজ সংস্কৃতির জীবন্ত প্রদর্শনী দেখা যায়।এখানে বেচা-কেনা হয় বাংলার মৃৎ ও কুটিরশিল্প। যেমন : ডালা,কুলা,বেলুন-পিঁড়ি,মাটির হাড়ি পাতিল প্রভৃতি। তাছাড়া নাগরদোলা, বায়োস্কোপ,পুতুল নাচের আয়োজনও থাকে। অন্যদিকে বাংলার লোকজ খাবার মুড়ি,বাতাসা,জিলাপি,নাড়ুসহ আরও অনেক ঐতিহ্যবাহী খাবারের দোকান থাকে মেলায়।

হালখাতা : পহেলা বৈশাখে বাঙালির অর্থনীতির দিকটিও জড়িত। সারাবছরের যত বকেয়া থাকে তা হিসাব-নিকাশ করে পুরাতন হিসাবের খাতা বাদ দিয়ে নতুন বছরের নতুন খাতা খোলেন ব্যবসায়ীরা। পুরাতন বছরের পাওনা আদায়ের জন্য ক্রেতাদের নিমন্ত্রণ জানানো হয়। ব্যবসায়ীদের দোকানগুলো তখন সাজানো হয়।আর উৎসবের সকাল থেকেই ক্রেতাদের মিষ্টিমুখ করানো হয়। অনেক জায়গায় ডিজিটাল হিসাব চালু হলেও, হালখাতার ঐতিহ্য এখনো অনেক দোকানে পালন করা হয় যা আমাদের লোকজ সংস্কৃতির অংশ।

খাদ্যাভ্যাস : পহেলা বৈশাখে বাঙালির জনপ্রিয় খাবার পান্তা- ইলিশ। ভাত পানিতে ভিজিয়ে রেখে কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজ, লবণ এবং ভাজা ইলিশ মাছের সাথে খাওয়া হয়। সেই প্রাচীনকাল থেকেই বাঙালিরা পহেলা বৈশাখে পান্তা ইলিশ খাওয়ার রেওয়াজ শুরু করেন। তবে সময়ের সাথে সাথে এটি শহুরে সংস্কৃতিতে একটি রূপ নেয়। বিশেষ করে ২০ শতকের শেষভাগে পহেলা বৈশাখ উদযাপনে বাঙালিয়ানা তুলে ধরার জন্য পান্তা-ইলিশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এখন পহেলা বৈশাখে নামি-দামি রেস্টুরেন্টগুলোতেও পান্তা ইলিশের ব্যবস্থা করা হয়। আবার প্রবাসীরাও এসবের আয়োজন করে থাকে।

পোশাকপরিচ্ছদ : পহেলা বৈশাখের সবচেয়ে জনপ্রিয় পোশাক হলো লাল-সাদা শাড়ী ও পান্জাবি। এই রংয়ের মাধ্যমে বাঙালির ঐতিহ্যও প্রকাশ পায়। যারা বছরের অন্যসময় পান্জাবি পড়ে করেনা তারাও পহেলা বৈশাখে পাঞ্জাবি পড়ে। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের অন্যান্য উৎসবের মতো কেনাকাটার আমেজ বাঙালিদের মাঝে পহেলা বৈশাখে এখনও বিরাজমান।

লোকজ সংগীত ও সংস্কৃত চর্চা : পহেলা বৈশাখে লোকজ সংগীতে বাঙালিদের অন্যরকম আকর্ষণ থাকে।বৈশাখ মানেই পালাগান, ভাটিয়ালি, জারি-সারি, বাউল গান। তাছাড়া পহেলা বৈশাখের সকালের সবচেয়ে বড় এবং ঐতিহ্যবাহী আয়োজন হলো রমনা বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠান। সূর্যের প্রথম আলো ফোটার সাথে সাথে রবীন্দ্রসংগীত “এসো হে বৈশাখ, এসো এসো” গেয়ে নতুন বছরকে স্বাগত জানানো হয়। ফলে নতুন প্রজন্মের সকলে লোকজ গানের সাথে পরিচিত হয়।

খেলাধুলা : লোকজ সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো খেলাধুলা। বৈশাখ উপলক্ষে বিভিন্ন অঞ্চলে খেলাধুলার আয়োজন করা হয়। চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে আয়োজিত ঐতিহাসিক ‘জব্বার এর বলীখেলা’ বৈশাখের অন্যতম আকর্ষণ। তাছাড়া গ্রামবাংলার অনেক জায়গায় এখনো পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে লাঠি খেলা এবং আনন্দময় নৌকা বাইচের আয়োজন করা হয়।

প্রতিবছর এভাবেই বাঙালিরা পহেলা বৈশাখ উদযাপন করে লোকজ সংস্কৃতির মাধ্যমে। অতএব, পহেলা বৈশাখ বাংলার লোকজ সংস্কৃতির সংরক্ষণে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।শুধু আমাদের দেশেই নয় প্রবাসী বাঙালিরাও বিদেশের মাটিতে একত্রিত হয়ে পহেলা বৈশাখ উদযাপন করে। পহেলা বৈশাখ কেবল একটি উৎসব নয়, এটি আমাদের হারিয়ে যেতে বসা লোকজ সংস্কৃতিকে পুনরুজ্জীবিত করার একটি বাৎসরিক আয়োজন। আমাদের শেকড়ের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে, ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেয়। আধুনিকতার এই যুগে আমাদের উচিত এই উৎসবের মাধ্যমে লোকজ সংস্কৃতিকে লালন ও সংরক্ষণ করা, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মও এই সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারে।

লেখিকা : শিক্ষার্থী, ইডেন মহিলা কলেজ,ঢাকা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *