শেখ সুলতানা মীম : নববর্ষ বাঙালিদের জাতীয় জীবনে এক অনন্য নিদর্শন ও সামাজিক সংস্কৃতির নাম। প্রতি বছরই বাঙালিরা এই দিনটিকে আনন্দ ও জাঁকজমকের সঙ্গে বরণ করে নেয়। বাংলা নতুন বছরকে আরও সুন্দর, প্রত্যাশী এবং পুরনো সবকিছুকে ভুলে নতুনভাবে শুরু করার জন্য বৈশাখ মাসের প্রথমদিনে এই দিনটি পালন করা হয়। গ্রাম থেকে শহর প্রতিটি জায়গা নববর্ষের নতুন সাজে সেজে ওঠে। নতুন স্বপ্ন, নতুন আশা ও নতুন চেতনার প্রতীক বাংলা নববর্ষ। তাই বাঙালি জাতি পুরোনোকে বছরকে বিদায় জানিয়ে নতুন বছরকে তাদের ঐতিহ্যের প্রবাহ দিয়ে বরণ করে নেয়।
শহর এবং গ্রাম উভয়ই নববর্ষকে নতুন সাজে বরণ করে নিলেও তাদের মধ্যে কিছুটা ভিন্নতা ও পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। শহরের নববর্ষে যেমন রয়েছে আধুনিকতার ছোঁয়া তেমনি গ্রাম বাংলা এখনো ধরে রেখেছে তাদের ঐতিহ্য।
প্রাচীনকালে মুঘল সম্রাট আকবর নববর্ষের সূচনা করেছিলেন কৃষকদের জন্য। কৃষকরা তাদের সারাবছরের খাজনা নতুন ফসল তোলার পর নববর্ষের দিন জমিদারকে দিতেন এবং জমিদার পুরোনো খাতা বন্ধ করে নতুন খাতা খুলতেন যাকে বলা হতো হলখাতা। ধীরে ধীরে এই ধারা বিস্তৃত হয়ে ছড়িয়ে পড়ে ব্যাবসায়ীদের মাঝে। গ্রামে যারা ছোট ছোট ব্যাবসা বাণিজ্য করেন তারা সারা বছর খদ্দেরকে কম বেশি বাকি দিয়ে থাকেন এবং নববর্ষের দিন হালখাতার মাধ্যমে তা আদায় করেন।
আবার হালখাতায় ব্যাবসায়ীরা তাদের সাধ্যমতো বিভিন্ন ধরনের মিষ্টি দিয়ে খদ্দেরদের আপ্যায়ণ করে থাকেন। গ্রাম বাংলার প্রতিটি দোকানে এই ঐতিহ্যের ছোঁয়া এখনো বিদ্যমান। আবার নববর্ষ উপলক্ষে বিভিন্ন জায়গায় ছোট ছোট মেলা বসে যেখানে মাটির হাঁড়ি পাতিল, মাটির পুতুল, কাঠের তৈরি বিভিন্ন ধরনের খেলনা পাওয়া যায়। মৃৎশিল্প, কুটিরশিল্প ও কারুশিল্প মেলাকে আরও প্রাণবন্ত ও ঐতিহ্যবাহী করে তুলে। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা নতুন পোশাক সাধারণত লাল-সাদা রঙের পোশাক পড়ে মেলায় ঘুরতে যায় এবং তাদের পছন্দ অনুযায়ী জিনিস কিনে থাকে। গ্রামে গ্রামে মেলায় মাটির জিনিসপত্রের পাশাপাশি লোকজ গান, পালাগান ও যাত্রাপালার আয়োজন করা হয়।
পোশাক ও আয়োজন থাকে খুবই সাধারণ সেই সাথে সাধারণ খাবার, পান্তা-ভাত, ইলিশ। গ্রামে নববর্ষ উৎসব পরিবার ও গ্রামকেন্দ্রিক, সরল এবং আন্তরিক।নতুন ফসল তোলা এবং হালখাতা করার মাধ্যমে কৃষক-ব্যাবসায়ী সকলেই সেদিন ভীষণ খুশি থাকে এবং ঘরে ঘরে আনন্দের জোয়ার বয়ে যায়। কিন্তু শহরে দেখা যায় একেবারে ভিন্ন চিত্র। বাংলা নববর্ষকে বরণ করার জন্য মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয় যা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। আবার শহরজুড়ে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, কনসার্টসহ বড় বড় আয়োজন করা হয়। চারিদিকে আলোকসজ্জা, বাহারি আয়োজন ও আধুনিকতার ছোঁয়ায় সেজে ওঠে শহরের প্রতিটি কোণা। শহরের এই আধুনিক আয়োজনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় রমনার বটমূলে বর্ষবরণ উৎসব।
ছায়ানটের উদ্যোগে এই বিশাল আয়োজন করা হয় যেখানে নৃত্য, আবৃত্তি, গান পরিবেশনসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অন্তর্ভুক্ত থাকে। সূর্য ওঠার সাথে সাথে এই অনুষ্ঠান শুরু হয় সমবেত কন্ঠে রবীন্দ্রনাথের “এসো হে বৈশাখ” গান পরিবেশনের মাধ্যমে। শহরের প্রতিটি রেস্টুরেন্ট, দোকানপাট সেজে ওঠে আধুনিক সাজসজ্জায়। যেখানে চলে বিলাসী খাওয়া দাওয়ার আয়োজন। তবে শহরের এই আধুনিক আয়োজনের মাঝেও কিছু অপসংস্কৃতির উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়, যা অনেক সময় উৎসবের মৌলিক চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে ওঠে।পোশাক-পরিচ্ছদের ক্ষেত্রে অনেকেই লাল-সাদা শাড়ি, পাঞ্জাবি কিংবা ফতুয়ার মাধ্যমে বাঙালিয়ানার ঐতিহ্যকে তুলে ধরেন। কিন্তু এর পাশাপাশি এক শ্রেণির মানুষ অতি আধুনিক বা পাশ্চাত্য প্রভাবিত পোশাক পরিধান করেন, যা অনেকের দৃষ্টিতে এই উৎসবের ঐতিহ্যবাহী সৌন্দর্যের সঙ্গে পুরোপুরি অসামঞ্জস্যপূর্ণ। শুধু পোশাকেই নয়, কখনো কখনো আচরণ ও উদযাপনের ধরনেও এমন কিছু বিষয় পরিলক্ষিত হয়, যা আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও মূল্যবোধ থেকে বিচ্যুতির ইঙ্গিত দেয়। অতিরিক্ত বাহুল্য, অপ্রয়োজনীয় প্রদর্শন কিংবা অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণ উৎসবের স্বাভাবিক সৌন্দর্যকে ম্লান করে দিতে পারে। এর ফলে ধীরে ধীরে সামাজিক ও নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের আশঙ্কা সৃষ্টি হয়। সাধারণত এসব উৎসবের মাঝে নারী ও শিশুর নিরাপত্তাহীনতার বিষয়টি সবচেয়ে বেশি পরিলক্ষিত হয়।
অনেক সময় নারীদের প্রতি অসহনশীল আচরণ এবং শিশু অপহরণ করা থেকে শুরু করে চুরি, ছিনতাইসহ অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে থাকে। যা উৎসবের মূল উদ্দেশ্যকে ব্যাহত করে। তাই আধুনিকতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার পাশাপাশি নিজস্ব সংস্কৃতি, শালীনতা ও ঐতিহ্যের প্রতি সম্মান বজায় রাখা এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। তাহলেই বাংলা নববর্ষ তার স্বকীয়তা অক্ষুণ্ণ রেখে আরও অর্থবহ ও সৌন্দর্যমণ্ডিত হয়ে উঠবে। সবশেষে বলা যায়, শহর ও গ্রামের নববর্ষ উদযাপনের মধ্যে পার্থক্য থাকলেও উভয়ের মূল উদ্দেশ্য একই—নতুন বছরকে স্বাগত জানানো এবং বাঙালি সংস্কৃতিকে ধারণ করা। গ্রামবাংলা এখনো তার সহজ-সরল জীবনধারা ও ঐতিহ্যকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরে রেখেছে, যেখানে পারিবারিক বন্ধন, আন্তরিকতা এবং লোকজ সংস্কৃতির প্রাধান্য স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়। অন্যদিকে শহর আধুনিকতার প্রভাবে কিছুটা পরিবর্তিত হলেও, সেখানেও বাঙালির ঐতিহ্যকে নতুন আঙ্গিকে উপস্থাপনের প্রচেষ্টা লক্ষ করা যায়। মঙ্গল শোভাযাত্রা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান কিংবা সংগীত-নৃত্যের মাধ্যমে শহরের মানুষ তাদের সংস্কৃতিকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরছে।
তবে এই আধুনিকতার সঙ্গে যেন ঐতিহ্যের ভারসাম্য রক্ষা করা হয়, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অন্ধভাবে বিদেশি সংস্কৃতি অনুসরণ না করে, নিজস্ব সংস্কৃতির মূল্যবোধকে ধারণ ও লালন করা প্রয়োজন। কারণ একটি জাতির প্রকৃত পরিচয় তার সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের মধ্যেই নিহিত। তাই শহর ও গ্রামের ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও, উভয়ের সম্মিলিত চর্চার মাধ্যমে বাংলা নববর্ষ আরও সমৃদ্ধ, অর্থবহ ও সর্বজনীন হয়ে উঠতে পারে। এই মিলনই বাঙালির আত্মপরিচয়কে আরও সুদৃঢ় করে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আমাদের সংস্কৃতিকে সঠিকভাবে পৌঁছে দিতে সহায়তা করে।
লেখিকা : শিক্ষার্থী, ইডেন মহিলা কলেজ, ঢাকা।





















