রঙিন শৈশবে বৈশাখের স্মৃতি

আফরিদা ইসলাম : আমার ছোটবেলার দিনগুলো কেটেছে সাভার ক্যান্টনমেন্টে। পহেলা বৈশাখ এলেই পুরো ক্যান্টনমেন্ট যেন এক অন্যরকম আনন্দে ভরে উঠত। এই দিনটাকে ঘিরে থাকত মেলা, নানা আয়োজন আর উৎসবের রঙিন আবহ। আমরা প্রতিবেশীরা মিলে পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে আমাদের বাসাটাকে খুব সুন্দর করে সাজাতাম। বৈশাখের আগের দিন রাতেই শুরু হয়ে যেত সেই প্রস্তুতি। কাগজের ফুল, রঙিন ফিতা আর নানা সাজসজ্জায় বাসাটা হয়ে উঠত একেবারে উৎসবমুখর। পরদিন সকালে কে কত তাড়াতাড়ি উঠতে পারে, সেটাও যেন এক ধরনের প্রতিযোগিতা ছিল। সকাল হলে সবাই মিলে দেখতাম কার বাসা কত সুন্দর হয়েছে।

শুধু সাজসজ্জাই নয়, বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও প্রতিযোগিতার আয়োজনও করা হতো। সেখানে বিজয়ীদের জন্য থাকত পুরস্কার। এসব ছোট ছোট আয়োজনেই আমাদের আনন্দ যেন আরও বেড়ে যেত।

বৈশাখ মানেই নতুন জামা। আর নতুন জামা না হলে যেন উৎসবটাই অসম্পূর্ণ লাগত। আমার এক প্রতিবেশী মেয়ে ছিল, তার নাম হিমিয়া। আমি যেমন জামা পরতাম, সেও ঠিক তেমন জামা চাইত। আমার মতোই ড্রেস পেতে সে তার বাবার কাছে বায়না করত, আর শেষে তার বাবাও তাকে আমার মতোই একই জামা কিনে দিতেন। যা কিনা আমার কাছে তখন বেশ মজার আর ভালো লাগার ছিল ।

সকালে মা পান্তা-ইলিশের আয়োজন করতেন। সেই পান্তা-ইলিশের স্বাদ আজও মনে পড়ে এখন আর যেন সেই আগের মতো স্বাদ খুঁজে পাই না।
তারপর নতুন জামা পরে আব্বু, আম্মু, ভাইয়া আর আমাদের প্রতিবেশীদের সঙ্গে সবাই মিলে মেলায় যেতাম। মেলায় গিয়ে দেখতাম নানা রকম স্টল ফল, মিষ্টি, মাটির জিনিস, ঘর সাজানোর সামগ্রী কত কী! সঙ্গে থাকত নাগরদোলা, সাপের খেলা, পুতুল নাচ বাহারি সব আয়োজন।

মেলায় একটি জিনিস ছিল একদম বাধ্যতামূলক বিভিন্ন রকম মিষ্টি খাওয়া। মোরালি, কটকটি আর আরও নানা আইটেম না খেলে যেন মেলা ঘোরাটাই অসম্পূর্ণ মনে হতো। নাগরদোলার কথা না বললেই নয়। আমি আর আমার সমবয়সী প্রতিবেশী বন্ধুরা নাগরদোলায় উঠতে খুব ভয় পেতাম। তবুও এটাকে আমরা এক ধরনের চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিতাম কে কতটা সাহসী! ভয় পেলেও শেষ পর্যন্ত উঠে পড়তাম। ওপরে উঠে নিচে পুরো মেলাটা দেখার যে আনন্দ সেটা সত্যিই অন্যরকম ছিল। মনে হতো যেন আকাশ ছুঁয়ে ফেলেছি।

মেলায় গেলে আরেকটা মজার ঘটনা প্রায়ই ঘটত অনেক ভিড়ের মধ্যে আমরা কেউ না কেউ হারিয়ে যেতাম! তারপর ফোন করে বা খুঁজে খুঁজে আবার সবাই একসঙ্গে হতাম। তখন একটু ভয় লাগলেও পরে সেটা নিয়ে অনেক হাসাহাসি হতো। সবচেয়ে বেশি ভিড় হতো সাপের খেলার স্টলে। কিন্তু আমি কখনো সাহস করে সেটা দেখতে যাইনি। আমার মনে হতো যদি কোনো সাপ হঠাৎ আমার গায়ে উঠে পড়ে! এই ভয়েই আর দেখা হয়নি। এখন ভাবলে একটু আফসোসই লাগে ইস! যদি একবার দেখতাম! তবে পুতুল নাচ দেখতে আমার খুব ভালো লাগত। বিভিন্ন গানের তালে তালে পুতুলগুলোর নাচ, তাদের নানা ভঙ্গিমা সবকিছুই যেন আমাকে অন্য এক জগতে নিয়ে যেত।

আমি যেহেতু সেনা পাবলিক স্কুলে পড়তাম, তাই ক্যান্টনমেন্টের এই আয়োজনগুলোতে বিভিন্ন স্কুলেরও স্টল থাকত। আমি আগ্রহ নিয়ে আমাদের স্কুলের স্টলে যেতাম দেখতাম কিভাবে সাজানো হয়েছে। সেখানে গিয়ে দেখতাম আমাদের ম্যাম-স্যাররা বৈশাখী সাজে দাঁড়িয়ে আছেন। তাদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করাটাও ছিল বেশ আনন্দের।

মেলা থেকে মাটির জিনিস কেনা ছিল আমার মায়ের খুব পছন্দ। তাই প্রতি বছরই মা মাটির ফুলসহ নানা রকম জিনিস কিনতেন। পহেলা বৈশাখ শেষে রাতে বাড়ি ফিরে আমরা সবাই মিলে মেলার কেনাকাটার ঝুলি খুলতাম। কে কী কিনেছে, কেমন হয়েছে এসব নিয়েই চলত গল্প আর আনন্দ।

আর এভাবেই কেটে যেত আমার ছোটবেলার বৈশাখ উদযাপন। এখন সময় বদলেছে। আগের মতো সেই উত্তেজনা আর অনুভব করা হয় না। আজকের বাচ্চাদের মধ্যেও পহেলা বৈশাখ নিয়ে সেই আগের মতো উচ্ছ্বাস খুব একটা দেখা যায় না। তবুও এখনও সেজে-গুজে ঘুরে বেড়িয়ে বৈশাখ উদযাপন করি। কিন্তু আমার কাছে ছোটবেলার সেই বৈশাখই ছিল সবচেয়ে সেরা সেখানে ছিল নিখাদ আনন্দ, আর অমূল্য স্মৃতি।

লেখিকা : শিক্ষার্থী, ইডেন মহিলা কলেজ,ঢাকা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *