প্লাস্টিকের শহরে শ্বাস নিচ্ছে ভবিষ্যৎ

রাখি আক্তার : মানুষের জীবন যতই উন্নত হচ্ছে পরিবেশ ততোই আরও বেশি বিপর্যস্ত হয়ে উঠছে। বর্তমানে বাংলাদেশে পরিবেশ দূষণের অন্যতম একটি কারণ প্লাস্টিক দূষণ। বিশ্বব্যাপী এই দূষণ রোধ করতে যেখানে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে সেখানে বাংলাদেশে অহরহ প্লাস্টিকের ব্যবহার করতে দেখা যায়। সামান্য সবজি ক্রয় থেকে শুরু করে নামি দামি ঔষধ ক্রয়, সবখানেই প্লাস্টিকের ব্যবহার চোখে পড়ে। এবং এর বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা গ্রহণের চিত্র আজও দেখা যায় না। ফলে পরিবেশ চরম বিপর্যয়ের সাগরে তলিয়ে যাচ্ছে।

প্লাস্টিক যেনো মানুষের জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাজারের ব্যাগ, পানির বোতল, খাবারের মোড়ক, ওষুধের প্যাকেট, এমনকি শিশুর খেলনাতেও প্লাস্টিকের আধিপত্য দেখা যায়। প্লাস্টিকের এই আধিপত্যের অন্যতম এক কারণ এর সহজলভ্যতা। যেকোনো স্থানে খুব কম মূল্যে এটি পাওয়া যায় ফলে মানুষ সহজেই তার দৈনন্দিন কাজে প্লাস্টিক ব্যবহার করছে। বিশেষ করে শহরাঞ্চলে প্লাস্টিক দূষণের চিত্র বেশি চোখে পড়ে।

জরিপে দেখা গেছে, বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় আট লাখ টনেরও বেশি প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপন্ন হয় যার একটি বড় অংশই পুনর্ব্যবহারযোগ্য নয়। এসব প্লাস্টিক একবার ব্যবহার করেই সরাসরি ফেলে দেওয়া হয়। রাজধানী ঢাকায় প্রায় প্রতিদিনই হাজার হাজার টন বর্জ্যের সাথে প্লাস্টিক মিশে থাকে যা অপসারণ করা সম্ভব নয়।

এসব প্লাস্টিক বিভিন্ন সময় বিভিন্ন স্থানে গিয়ে পরিবেশ মারাত্মকভাবে দূষিত করছে। প্রতিনিয়ত এই প্লাস্টিক ব্যবহার বৃদ্ধির নানাবিধ কারণ রয়েছে। প্রথমত, এটি কম খরচেরই এবং সহজেই পাওয়া যায়। কাগজ, কাপড় বা পাটের বিকল্পগুলোর তুলনায় প্লাস্টিক অনেকটাই সস্তা এবং সহজে উৎপাদন করা যায়। ফলে সকল ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ উভয়ের কাছেই এটি একটি সাশ্রয়ী ও সুবিধাজনক উপকরণ। দ্বিতীয়ত, হালকা ও টেকসই বৈশিষ্ট্যের কারণে সকল স্থানে ব্যবহারযোগ্য। এটি সহজে ভাঙে না এমনকি পানি বা আর্দ্রতায় নষ্ট হয় না এবং বহন করতেও সুবিধাজনক। তৃতীয়ত, প্লাস্টিকের বিকল্পের অভাব। পাট বা কাপড়ের ব্যাগ পরিবেশবান্ধব, কিন্তু সেগুলো সব জায়গায় সহজেই পাওয়া যায় না কিংবা তুলনামূলক ব্যয়বহুল বলা যায়। ফলে মানুষ দ্রুত ও সহজ সমাধান পেতেই প্লাস্টিকের দিকেই ঝুঁকে পড়ে। চতুর্থত, সচেতনতার অভাব। এখনও অনেক মানুষ প্লাস্টিকের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে অবগত নয় কিন্তু বহু মানুষ আছে যারা জানলেও এর ব্যবহার কমানোর ব্যাপারে ততটা আগ্রহী নয়।

আইনের দুর্বল প্রয়োগ ও নগরায়ণের দ্রুত বিকাশের ফলে প্লাস্টিক ব্যবহারকে আরও বাড়িয়ে তুলছে। নদী-নালা, খালবিল, রাস্তাঘাট, ড্রেন সবখানেই প্লাস্টিক বর্জ্য জমে থাকতে দেখা যায়। ফলে নদী-নালা দূষিত হয়, মাছসহ অন্যান্য প্রাণীর বেঁচে থাকা কষ্টকর হয়ে ওঠে। রাস্তাঘাটের বর্জ্য ড্রেনে প্রবেশ করে ড্রেনেজ ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যায় ফলে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। এমনকি যেকোনো স্থানে প্লাস্টিক পড়ে থাকলে মাটির উর্বরতা নষ্ট হয়। পোড়ানো প্লাস্টিক থেকে নির্গত বিষাক্ত ধোঁয়া মানুষের শ্বাসযন্ত্র, ফুসফুস ও ত্বকের মারাত্মক ক্ষতি করে।

বাংলাদেশে পলিথিন নিষিদ্ধ থাকলেও এর ব্যবহার আজও কমেনি। বিভিন্ন সময়ে অভিযান পরিচালনা করলেও এর উৎপাদন ও সরবরাহ বন্ধ না হওয়ার পলিথিনের ব্যবহার বহাল আছে। ফলে মানুষ তার দৈনন্দিন সকল কাজে পলিথিন ব্যবহার করে যাচ্ছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যায় অনেক সুপারশপ, বিভিন্ন দোকানে ও সরকারি কিছু দপ্তরে পলিথিন ব্যবহার না করে কাপড়ের ব্যাগ কিংবা কাগজের ব্যাগ দেওয়া হচ্ছে। যা নিসন্দেহে একটি ভালো উদ্যোগ। কিন্তু অনান্য স্থানে প্লাস্টিক ব্যবহার হ্রাস করা সম্ভব হচ্ছে না। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে প্রথমেই প্লাস্টিকের বিকল্প পণ্যের উৎপাদন বাড়াতে হবে। যেমন, পাট, কাগজ ও কাপড়ের তৈরি ব্যাগ। এসব পরিবেশবান্ধব পণ্য যাতে বাজারে সহজলভ্য হয় তা নিশ্চিত করতে হবে। এর ফলে পরিবেশের জন্য যেমন পাটশিল্প উপকৃত হবে তেমনি এর পুনরুজ্জীবিত কৃষকরা অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবে। অন্যদিকে প্লাস্টিক ব্যবহার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

কেউ প্লাস্টিক ব্যবহার করলে জরিমানা সহ কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে এবং নিয়মিত তদারকি করতে হবে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে আধুনিকায়ন করা জরুরি। প্লাস্টিক বর্জ্য আলাদা করে সংগ্রহ করা, এরপর পুনর্ব্যবহার বা রিসাইক্লিং করা এবং পুনঃপ্রক্রিয়াজাত শিল্পকে উৎসাহিত করা হলে এই সমস্যার অনেকটাই কমানো যাবে। নদী-নালা, ড্রেন, খালবিল ইত্যাদি স্থান নিয়মিত পরিষ্কার করতে হবে যাতে প্লাস্টিক জমে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি না হয়। সর্বপরি জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা অপরিহার্য। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, অফিস-আদালত, সামাজিক মাধ্যম, গণমাধ্যমে প্লাস্টিকের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে মানুষের মাঝে সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। এবং নিজ নিজ স্থান থেকে প্লাস্টিকের ব্যবহার কমাতে এবং বিকল্প পণ্য ব্যবহারে সকলকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। ব্যক্তি পর্যায় থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। যদি এখনই কার্যকর কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হয় তবে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের পরিবেশ কঠিন বাস্তবতায় পরিণত হবে।

লেখিকা : শিক্ষার্থী, ইডেন মহিলা কলেজ, ঢাকা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *