চার দেশের অফার, দুই দেশের ভিসা: নোবিপ্রবির সাঈম হাসানের সাফল্যের গল্প

সামিয়া হোসেন মুনিয়া : নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (নোবিপ্রবি) এর অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী সাঈম হাসান খান আন্তর্জাতিক উচ্চশিক্ষার পথে এক অনন্য সাফল্যের গল্প তৈরি করেছেন। একইসাথে চারটি দেশের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অফার লেটার এবং দুইটি দেশের স্টুডেন্ট ভিসা অর্জন যেখানে অনেকের স্বপ্ন একটি সুযোগেই সীমাবদ্ধ, সেখানে তিনি ছুঁয়েছেন একাধিক সম্ভাবনার দ্বার।

তবে এই অর্জন হঠাৎ করে আসেনি ,এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ প্রস্তুতি, ধৈর্য আর নিরবিচ্ছিন্ন পরিশ্রমের গল্প।

নোবিপ্রবির অর্থনীতি বিভাগেই তার শিক্ষাজীবনের ভিত্তি গড়ে ওঠে। এখানেই তিনি কেবল পাঠ্যবইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেননি বরং গড়ে তুলেছেন বিশ্লেষণধর্মী চিন্তাশক্তি, গবেষণার ভিত্তি এবং বাস্তব জীবনে অর্থনীতির প্রয়োগ সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা। শিক্ষক, সিনিয়র এবং সহপাঠীদের সহযোগিতায় তার এই পথচলা ধীরে ধীরে পরিণত হয় এক সুসংগঠিত যাত্রায়।

অনার্স জীবনের মাঝামাঝি সময় থেকেই তার মনে জন্ম নেয় এক নতুন স্বপ্ন, বিদেশে উচ্চশিক্ষা। আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা, গবেষণার সুযোগ এবং নিজেকে বৈশ্বিক পরিসরে প্রতিষ্ঠিত করার আকাঙ্ক্ষা তাকে সামনে এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করে। সেই স্বপ্নই একসময় তাকে নিয়ে আসে এক অবিশ্বাস্য বাস্তবতার সামনে।

নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য এবং জার্মানি এই চারটি দেশের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অফার পাওয়ার পর সামনে খুলে যায় একাধিক সম্ভাবনার দরজা। প্রতিটি পথই ছিল আকর্ষণীয়, প্রতিটি সুযোগই ছিল মূল্যবান। তবে সব দিক বিবেচনা করে শেষ পর্যন্ত তিনি বেছে নেন জার্মানিকে।

বিশ্বমানের শিক্ষা, তুলনামূলক কম খরচ এবং গবেষণার বিস্তৃত সুযোগের পাশাপাশি জার্মানির সম্পূর্ণ ফ্রি টিউশন ফি এবং শিক্ষার্থীবান্ধব শিক্ষা ব্যবস্থা তার সিদ্ধান্তকে দৃঢ় করে।

এই সাফল্যের পেছনে ছিল একটি সুসংগঠিত ও শক্তিশালী প্রোফাইল। ভালো একাডেমিক ফলাফল, উচ্চ আইইএলটিএস স্কোর, চাকরির অভিজ্ঞতা, সুপরিকল্পিত এসওপি এবং প্রাসঙ্গিক সহশিক্ষা কার্যক্রম সবকিছুর সমন্বয়েই গড়ে উঠেছে তার এই অর্জন। বিশেষ করে এসওপি সম্পর্কে তিনি মনে করেন, এখানেই একজন আবেদনকারীর লক্ষ্য, চিন্তা ও ব্যক্তিত্ব সবচেয়ে স্পষ্টভাবে প্রকাশ পায়।

প্রস্তুতির ক্ষেত্রে তিনি ধাপে ধাপে নিজের প্রোফাইল বিশ্লেষণ করে এগিয়েছেন। এসওপি, সিভি এবং রেকমেন্ডেশন লেটার এই তিনটি ডকুমেন্টের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, এগুলোর মধ্যে এসওপি-ই সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে।

অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী হিসেবে তার একাডেমিক ফলাফল এবং গবেষণা বা প্রজেক্টে কাজ করার অভিজ্ঞতা তাকে অনেকটাই এগিয়ে রেখেছে। এর ফলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কাছে তার প্রোফাইল আরও গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে।

আইইএলটিএস প্রস্তুতি প্রসঙ্গে, একজন ব্রিটিশ কাউন্সিল সার্টিফাইড আইইএলটিএস ইন্সট্রাক্টর হিসেবে তিনি ধারাবাহিক অনুশীলনের ওপর জোর দেন। রিডিং, রাইটিং, লিসেনিং এবং স্পিকিং প্রতিটি স্কিলেই সমান গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি রাইটিং এ নিয়মিত ফিডব্যাক নেওয়া এবং স্পিকিং এ আত্মবিশ্বাসের সাথে কথা বলার বিষয়টিকে তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন।

তবে এই পথচলা একেবারেই বাধাহীন ছিল না। চাকরির পাশাপাশি ডকুমেন্ট প্রসেসিং, দীর্ঘ অপেক্ষা এবং নানা অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে তাকে। অনেক সময় হতাশাও ভর করেছে। কিন্তু লক্ষ্য থেকে সরে যাননি। পরিবারের সমর্থন এবং স্রষ্টার প্রতি অগাধ বিশ্বাস তাকে প্রতিটি ধাপে সামনে এগিয়ে যেতে সাহস জুগিয়েছে।

ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে তিনি দেখতে চান আরও বড় পরিসর। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিজের দক্ষতা কাজে লাগিয়ে ক্যারিয়ার গড়ে তোলার পাশাপাশি গবেষণা এবং আইইএলটিএস সংশ্লিষ্ট কাজেও যুক্ত থাকার ইচ্ছা রয়েছে তার।

নোবিপ্রবির শিক্ষার্থীদের জন্য তার বার্তাও স্পষ্ট সময় নষ্ট না করে এখন থেকেই প্রস্তুতি শুরু করতে হবে। ভালো একাডেমিক ফলাফল, দক্ষতা উন্নয়ন, ইংরেজিতে পারদর্শিতা এবং সঠিক দিকনির্দেশনা এই চারটি বিষয়ই সফলতার পথে এগিয়ে নিয়ে যাবে। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, ধৈর্য ধরে নিজের স্বপ্নের প্রতি অটল থাকতে হবে।

শেষে তিনি বলেন, “স্বপ্ন দেখা সহজ, কিন্তু সেটিকে বাস্তবে রূপ দিতে প্রয়োজন অধ্যবসায়, ধৈর্য ও বিশ্বাস। লক্ষ্য স্পষ্ট থাকলে এবং প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকলে সাফল্য অর্জন সম্ভব।”

লেখিকা : শিক্ষার্থী, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *