লজিং মাস্টার
ইমাম হোসেন সবুজ
আজ কলেজে পৌঁছাতে শ্রাবণের একটু দেরী হয়ে গেল। দূর হতেই সে লক্ষ্য করলো, কবির স্যারের ইকোনোমিক্স ক্লাস চলছে। শ্রাবণ ভাবলো, স্যার এখন হয়তো তাকে দেখলে রাগ করতে পারেন। তাই সন্তঃপনে, ছাত্রদের হোস্টেলের একটি কক্ষে নীরবে বসে রইল। কবির স্যার , ঠিকই তার এই প্রিয় ছাত্রটিকে লক্ষ্য করেছিল সবার চোখের ফাঁকে। তিনি হাতের ডাস্টার নিয়ে বেরিয়ে গেলেন। সমস্ত ছাত্রছাত্রীরা অবাক হয়ে ,কি ঘটে তা দেখার জন্য উদগ্রী হয়ে রইল। কবির স্যার, শ্রাবণের কক্ষে ঢুকেই, শ্রাবনের কান টেনে ধরলেন। হাস্য মুখে বললেন তুমি দুষ্ট বুঝেছি, ভেবেছ আমি তোমাকে দেখতে পাইনি তাইনা পাজি?
-স্যার, প্লিজ মাফ করেন, কানে ব্যথা পাচ্ছি তো। কবির স্যার ,মৃদুভাবে আঘাত করলেন ডাক্তার দিয়ে তার পিঠে।
-কান ছিঁড়েই ফেলব, আমার ক্লাসে যাওনি কেন? শ্রাবনের হাতটি শক্ত করে ধরেই, তিনি ক্লাসে ফিরলেন। এই মুহূর্তে ছেলেদের তুলনায়, মেয়েরা অধিক হাস্য জুড়ে দিল। শ্রাবণ লজ্জায় লাল হয়ে, ফয়েজ ও তুহিন এদিকে তাকিয়ে রইল। তারা বেশ মজাই পাচ্ছে প্রিয় বন্ধু বরেষুর বেহাল অবস্থা দেখে। কবির স্যার, মেয়েদেরকে মৃদু ধমক প্রদান করল,
-এই আন্টিরা তোমরা হাসতাছো কেন?
ডলি, মিতালী হাসতে হাসতে বলল, স্যার হাসতাছি, এই জন্য যে, আমরা জানতাম কলেজে শিক্ষকরা, কোনো ছাত্রকে, দৈহিক শাসন করেন না। অথচ আজ আপনার প্রিয় গুড বয়কে, ডাস্টার বিট দিচ্ছেন। হিঃ হিঃ।
-এই চুপ। ওকে শাসন করার অধিকার আমার আছে। এইজন্য যে, ও একদিন, আমার মতই তার ছাত্রদের শাসন করবে বলে। শ্রাবণ বুঝতে পারল, প্রতিটি ক্লাসে ছাত্রছাত্রীদের উপস্থিতি অপরিহার্য। স্যারকে, সে মন থেকে সরি বলল। ক্লাস শেষে, তিন বন্ধুতে সবুজ গালিচার উপর বসে গল্প করছে। হঠাৎ শ্রাবণের মনে পরল, তার লজিং থাকার বিষয়টি। লজিং থাকা হলো, এক ধরনের গৃহপালিত শিক্ষক। আরো সহজ কথায়, অন্যের বাড়িতে অন্যের ছেলেমেয়েদের, পড়াশোনা করিয়ে, বিনামূল্যে থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা। শ্রাবণ, প্রিয় বন্ধু ফয়েজ ও তুহিনকে বিস্তারিত খুলেই বলল। শ্রাবনের লজিং থাকার বিষয়টি এতটা জরুরী যে, প্রায় প্রতিদিনই তাকে, দীর্ঘ ৮ মাইল পথ পায়ে হেঁটেই কলেজে যাওয়া আসা করতে হয়, এবং সৎ ভাইদের স্ত্রীদের, অমানবিক আচরণ আর তার ভালো লাগেনা। শ্রাবণের কথা শুনে, দুই বন্ধুই এই ক্ষণে ,আনন্দিত ও পুলকিত। কারণ তারাও শ্রাবণকে চোখের আড়াল হতে দিতে চায় না। যেন এক মায়ের উদরে জন্ম নেওয়া তিনটি ভাই। ফয়েজ শ্রাবনের গলা জড়িয়ে বলল, দোস্ত তুই এতদিন একখান কামের কথা কইছস। আমার যে কি ভাল লাগতাছে। তুই আমাগো গ্রামে লজিং থাকলে, সব সময় আমাগো সাক্ষাৎ হইব। পড়াশোনার ব্যাপারে তোর অনেক হেল্প পাওন যাইবো। শ্রাবণ যদিও চিন্তামুক্ত হলো। তথাপি তার মনটা কেমন যেন খচখচ করছে। না জানি লজিং থাকার পরিবেশটা কেমন হয়। নিজের বাড়িতে যতই কষ্ট ছিল ,তাও নিজের পরিচিত পরিবেশ। কারণ শ্রাবণ জীবনে প্রথম লজিং থাকতে যাচ্ছে। আনমনে ভাবছে ,বাড়ি ফিরবার মেঠো পথ দিয়ে। পরদিন, শ্রাবণ বাংলা ক্লাস শেষ করে, তার গ্রুপের ক্লাস করতে যাচ্ছে। হঠাৎ পিছন থেকে কে যেন শ্রাবণ ভাই বলে ডাক দিল। শ্রাবণ দেখল মনির তাকে ডাকছে। হ্যাঁ এই সেই মনির। যাকে কলেজের অধিকাংশই, পাগলা মনির বলেই ডাকে। এ পর্যন্ত প্রায় শেষ শতাধিক প্রেমপত্রের আবেদন করেছে। কিন্তু দুর্ভাগ্য আজও তার কোনো প্রেমের দপ্তরে, নিয়োগ হয়নি।
-হ্যাঁ মনির বলো।
-ফয়েজ ভাই, কইলো। আপনি নাকি লজিং থাকতে চাচ্ছেন?
-হ্যাঁ মনির, তুমি ঠিকই শুনেছ।
-ত্বয়লে, আজ ক্লাস শেষে আমার সাথে চলেন। একজনের লজিং মাস্টার লাগবো, তার সাথে আপনাকে আলাপ করিয়ে দিব।
দ্বিতীয় পর্ব পড়ুন –





















