মো.জাহিদ হাসান : একজন সুনাগরিক হিসেবে নিয়মিত দেশের বিভিন্ন খবরাখবর জানা অত্যন্ত জরুরি। এর মাধ্যমে নাগরিক হিসেবে জনগণের মধ্যে অধিকার ও কর্তব্য সচেতনতা তৈরি হয়। গণমাধ্যমের সঠিক ও কার্যকরী ভূমিকা যেমন রাষ্ট্রের প্রগতিশীল উন্নয়নে ভূমিকা রাখে, তেমনি এর অকার্যকারিতা ও বিরূপ প্রভাব রাষ্ট্র ও নাগরিকের ভয়ানক ক্ষতি সাধন করে। গণমাধ্যমকে কার্যকরী করে তুলতে হলে আগে এর স্বাধীনতা রক্ষা করা জরুরি।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা মানে হলো কোন রাজনৈতিক দল, সরকার বা যেকোন অপশক্তির কাছে নিয়ন্ত্রণমুক্ত থেকে নিয়মমাফিক ভাবে তথ্য প্রচার করতে পারা। স্বাধীন গণমাধ্যম একটি দেশের ভালো ও মন্দ উভয় দিকই জনগণের কাছে স্বচ্ছভাবে তুলে ধরতে পারে। এর ফলে সর্বস্তরের জনগণ রাষ্ট্রের উন্নয়ন, প্রতিবন্ধকতা, সম্ভাবনা ও সংকট সম্বন্ধে জানতে পারে। বিভিন্ন ধরনের অপরাধ ও শাস্তি সম্বন্ধে বার্তা ও সরাসরি নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের খবর দেখে জনগণ সচেতন হতে পারে। একটি স্বাধীন গণমাধ্যম রাষ্ট্র পরিচালনায় সরকারের বিভিন্ন অঙ্গসংগঠন ও সরাসরি সরকারের নানা গাফিলতির খবর দ্বিধাহীনভাবে প্রচার করতে পারে। স্বাধীন গণমাধ্যমে জনগণ রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থা নিয়ে সরকারের কাছে নির্ভয়ে তাদের মতামত তুলে ধরতে পারে। এতে করে স্থানীয় পর্যায় থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের যেকোন পর্যায়ের সার্বিক পরিস্থিতি সম্বন্ধে জনগণ ও সরকার অবগত হতে পারে।
গণমাধ্যমের সঠিক ভূমিকায় সঠিক সময়ে রাষ্ট্রের সকল প্রয়োজনীয়তা সম্বন্ধে জানা যায় এবং সমালোচনার সুযোগ থাকায় যেকোন সংকট মোকাবিলায় সহজেই কার্যকরী সমাধান তৈরি করা সম্ভব হয়। গণমাধ্যমে সরকার ও জনগণের মধ্যে একটা যোগাযোগ তৈরি হওয়ার ফলে যেকোন সংকটে জনমনে আস্থা তৈরি হয় এবং নাগরিক-শৃঙ্খলা রক্ষিত হয়। গণমাধ্যমে রাষ্ট্রীয় কাজে সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত হয়। সহজেই দেশের মানুষের কাছে সরকারের উন্নয়নমূলক বার্তা পৌছে যায়। সরকারের বাজেট প্রণয়ন, প্রকল্প বাস্তবায়ন, আইন প্রয়োগ, জণগণের দাবি উত্থাপন, সরকারের পদক্ষেপ গ্রহণ প্রভৃতি বিষয়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার সৃষ্টি হয় গণমাধ্যমের ভূমিকায়। গণমাধ্যমের তৎপরতায় অপরাধ দমনের মাধ্যমে রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা বজায় থাকে এবং উন্নয়নের ধারা অব্যাহত থাকে।
দেশের প্রচলিত আইন-কানুন সম্বন্ধে জানার মাধ্যমে মানুষ অধিকার ও কর্তব্য সম্বন্ধে সচেতন হতে পারে। স্বাধীন গণমাধ্যমের তৎপরতায় সরকারের ফ্যাসিস্ট হয়ে ওঠার সুযোগ থাকে না। গণমাধ্যমে জনগণ ও দায়িত্বশীলদের তুলনামূলক সমালোচনার প্রেক্ষিতে আইনের সঠিক সংস্কার করা যায়। আবহাওয়া ও বিভিন্ন দূর্যোগের আগাম বার্তা ও দূর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতি সম্বন্ধে সঠিক তথ্য প্রচারের মাধ্যমে জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়। গণমাধ্যমের সচেতনতামূলক ভূমিকায় সঠিকভাবে রাষ্ট্রীয় সম্পদের রক্ষণাবেক্ষণ ও উন্নয়ন সম্ভব হয়।
দেশের অবকাঠামো নির্মাণ ও যাবতীয় সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা সম্বন্ধে গণমাধ্যমে কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়। এছাড়া গণমাধ্যমে বিনোদন, বিজ্ঞাপন ও নানা বুদ্ধিবৃত্তিক লেখনীর মাধ্যমে দেশের জনগণ উন্নত জ্ঞান ও সংস্কৃতি চর্চার সুযোগ পায়। দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, সভ্যতা, সংস্কৃতি ও অন্যান্য কাঠামো নিয়ে বুদ্ধিজীবীদের লেখনীতে গণমাধ্যমে উঠে আসে নানা উন্নয়ন পরিকল্পনা। গণমাধ্যমের তথ্য ও প্রতিবেদনে মানুষ নিয়মিত সঠিক বাজারমূল্য সম্পর্কে জানতে পারে এবং এর মাধ্যমে ভোক্তা অধিকার রক্ষিত হয়। গণমাধ্যমে বিভিন্ন চাকরির খবর প্রচারের মাধ্যমে এবং নানা কর্মমুখী উদ্যোগে সফলতার নজির প্রকাশের মাধ্যমে উৎসাহ ও পরিকল্পনা পেয়ে বেকারদের কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগ তৈরি হয়।
দেশের কৃষি ও শিল্প উন্নয়নেও গণমাধ্যমের ব্যাপক ভূমিকা রয়েছে। গণমাধ্যম জনকল্যাণমুখী আন্দোলন সৃষ্টিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। দেশের সংকটে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায় ও জনমত সৃষ্টিতে গণমাধ্যম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশের আলোচিত-সমালোচিত রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে দীর্ঘসূত্রিতা ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সম্পূর্ণ নৈতিক দায়িত্ব পালনের ব্যর্থতার অন্যতম একটি কারণ গণমাধ্যমের শক্তিশালী ভূমিকার অভাব। অন্য রাষ্ট্রের সাথে কূটনীতিক সম্পর্ক স্থাপনে গণমাধ্যম সহায়ক ভূমিকা পালন করে। স্বাধীন গণমাধ্যমে জনগণের চাহিদা ও তৎপরতার ফলে জনপ্রশাসনের উৎকর্ষ বৃদ্ধি পায়, ফলে সরকারি সেবা জনগণের দোরগোড়ায় দ্রুত পৌঁছে যায়।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতার বিপরীতেই রয়েছে পরাধীনতা। নির্দিষ্ট কোন দল বা গোষ্ঠী, কিংবা স্বৈরাচারী সরকার নিজ স্বার্থের কারণে বিভিন্ন সময় গণমাধ্যমের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করে। ক্ষমতাবলে সাংবাদিকদের উপর মামলা, হুমকি, ছাপাখানা বন্ধ করে দেওয়া প্রভৃতি দুঃশাসনের মাধ্যমে গণমাধ্যমের কার্যকারিতা সংকুচিত করে দেয়া হয়। ফ্যাসিবাদী হাসিনা সরকারের আমলে আমাদের দেশের অনেক স্বনামধন্য গণমাধ্যমের কার্যকলাপ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল।এছাড়া, সেসময় প্রচলিত বেশিরভাগ গণমাধ্যমগুলোতেই সরকারের নেতিবাচক হস্তক্ষেপ ছিল।
যার ফলে দেশের মানুষকে বোকা বানিয়ে স্বৈরাচারী সরকার খুন, গুম, দূর্ণীতি করে গেছে বহুকাল। সাংবাদিক বা গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে যথেচ্ছভাবে মামলা করে তাদের কন্ঠরোধ করা দূর্নীতিবাজদের একটি অন্যতম হাতিয়ার। গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তীতে সাংবাদিকদের উপর ঢালাওভাবে মামলা না চললেও মবের কারণে একধরনের সেন্সরশিপ তৈরি হয়েছে দেশের গণমাধ্যমের প্রতি। এরা গণমাধ্যমকে নির্দিষ্ট কিছু বিষয় প্রচারে বাধা দিচ্ছে বা নিয়ন্ত্রণ করছে। ফলে দেশের গণতন্ত্র এখনো হুমকির মুখেই রয়েছে। আমাদের দেশের গণমাধ্যমকর্মীদের নূন্যতম নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকা অত্যন্ত দুঃখজনক। সন্ত্রাসীদের সরাসরি হামলায় অনেক সাংবাদিক প্রাণ হারিয়েছে।
গাজীপুরে সাংবাদিক আসাদুজ্জামান তুহিনকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনা অত্যন্ত লোমহর্ষক। সংবিধান ও আন্তর্জাতিক আইনের যথাযথ প্রভাব না থাকার ফলে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষায় বাধার সৃষ্টি হয়। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা মানেই যা ইচ্ছা তা প্রচার করবে এমন নয়। আমাদের দেশে অনেক অনুমোদন ছাড়া গণমাধ্যম ও ভুয়া সাংবাদিক রয়েছে, যারা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলে এবং ব্যক্তিগত লাভের জন্য গুজব ছড়িয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করে এবং দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করে। এ ধরনের কার্যকলাপের সাথে জড়িতদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনার ব্যবস্থা করতে হবে।
সেই সাথে জনগণকেও গণমাধ্যমের সঠিক তথ্য যাচাইয়ের জন্য সচেতন করে তুলতে হবে। ২০২৪ সালের শেষের দিকে সংবাদপত্রের প্রতিবেদনে প্রকাশ পায় যে বাংলাদেশকে নিয়ে বিভিন্ন বিষয়ে ভারতের ৪৯ টি গণমাধ্যমে গুজব ছড়ানো হচ্ছে। যার ফলে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি আমরা ভালোভাবেই লক্ষ্য করেছি। আমাদের দেশে পূজার সময় অনলাইনে বিভিন্ন ভুয়া প্রচারমাধ্যমে মন্দিরে হামলার গুজব ছড়িয়ে প্রতিবছরই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সৃষ্টি করা হয়। এছাড়া, বিভিন্ন সময় অসামাজিক ও কুরুচিপূর্ণ খবর তৈরি করে সমাজে অশ্লীলতা ছড়ায় বিভিন্ন গণমাধ্যম। বিশেষ করে, বিজ্ঞাপনে নারীর ব্যবহার ও অতিরঞ্জন আজকাল সুশীল সমাজের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রশ্নে এসব সমস্যাও বিবেচিত হবে। ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে আমরা দেখেছি যে অনেক গণমাধ্যমকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে স্বৈরাচারী কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে। সত্যকে মিথ্যা, আর মিথ্যাকে সত্য বানিয়ে প্রচার করার ফলে সাধারণ জনগণ হয়েছে শোষণ ও বঞ্চনার শিকার। অনেক গুম, খুন ও নির্যাতনের ঘটনা ধামাচাপা দিয়ে নির্বিচারের শাসন চালিয়েছে ফ্যাসিস্ট সরকার। এছাড়া, অর্থ পাচার সহ আরও অনেক গোপন কার্যক্রম অব্যাহত ছিল সেই সরকারের আমলে। গণমাধ্যমের অসহায়তার কারণেই নির্বিঘ্নে এসব ফ্যাসিবাদী কার্যক্রম চলতো।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় আমরা দেখেছি যে কীভাবে সারাদেশে ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে গণমাধ্যমকে পঙ্গু করে নির্বিচারে গণহত্যা চালানো হয়েছে। গণমাধ্যম নিয়ে কাজ করা অলাভজনক আন্তর্জাতিক সংস্থা রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স (আরএসএফ) -এর ২০২৫ সালের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গণমাধ্যমের স্বাধীনতার সূচকে ১৮০ টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৪৯ তম। বাংলাদেশের গণমাধ্যমের উন্নয়ন নিয়ে বর্তমান সরকারের আরও তৎপর হওয়া দরকার। গণমাধ্যম কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং নিয়ম রক্ষায় দেশের গণমাধ্যমগুলোকে আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। দেশের শাসনব্যবস্থা সহ সার্বিক উন্নয়নের জন্য গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ফিরিয়ে আনতে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
লেখক :শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।





















