মোঃ শরীফুল ইসলাম : ১৯৭১ সালের ২৬’মার্চ শুরু হওয়া মুক্তিযুদ্ধ অল্প সময়েই ছড়িয়ে পড়ে গ্রামবাংলার প্রতিটি কোণে। কৃষকশ্রমিক, কুলি-মজুর, ছাত্র-জনতা-সর্বস্তরের মানুষ অস্ত্র হাতে কিংবা সাহসে বুক পেতে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলার কিশোরগঞ্জ মহকুমার বর্তমান তাড়াইল থানার পশ্চিম জাওয়ার গ্রামও সেই ভয়াবহচন্দ্র সময়ের সাক্ষী। পাশের গিরিশ পালের বাজার এলাকায় তুমুল যুদ্ধ শুরু হলে গোলাগুলির শব্দ জাওয়ার গ্রাম পর্যন্ত শোনা যেত। বুলেট এসে পড়ত নিরীহ মানুষের ওপর।উ
আমার দাদি সেই দিনের গল্প বলতে গিয়ে প্রায়ই শিহরিত হয়ে ওঠেন। দাদা আশেদ আলী ছিলেন ভীতু প্রকৃতির মানুষ। প্রাণ বাঁচাতে তিনি
নূরুল ইসলাম ভূঁইয়ার পুকুরে নেমে কচুরিপানা দিয়ে মাথা ঢেকে রেখেছিলেন, যেন পাকিস্তানি সেনারা টের না পান। মিলিটারি চলে গেলে তিনি পুকুর থেকে উঠে আসেন। আমার বাবা তখন শিশু, যুদ্ধবিমান উড়লেই তিনি ভয়ে লুকিয়ে পড়তেন। বড় চাচা পরিস্থিতি কিছুটা
দাদির মুখে শোনা এসব গল্প আমাকে মনে করিয়ে দেয়-মুক্তিযুদ্ধ ছিল কেবল ভূখণ্ডের নয়, ছিল মানবতার লড়াই। এই স্মৃতিগুলো আমাদের চেতনায় বেঁচে থাকুক, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে
বুঝতেন, চোখের সামনে ধ্বংস ও আতঙ্ক দেখেছেন।
তাড়াইল-সাচাইল এলাকায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী একের পর এক নৃশংস হত্যাযজ্ঞ চালায়। বিভিন্ন গ্রাম থেকে সাধারণ মানুষ ধরে এনে এক কাতারে দাঁড় করিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়। অনেক সময় মৃতদেহ খালে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। নারীদের ওপর চালানো হয় পাশবিক নির্যাতন, অসংখ্য নারী
নূরুল ইসলাম ভূঁইয়ার বাড়ি পাকিস্তানি বাহিনী আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়। স্বাধীনতার পর তিনি দুই বার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন এবং এলাকার রাস্তাঘাট, বৃক্ষ রোপণসহ নানা উন্নয়নমূলক কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। জনকল্যাণমূলক কাজ করতে গিয়ে মামলার মুখোমুখিও হন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি ছিলেন মানুষের শ্রদ্ধার পাত্র।
পশ্চিম জাওয়ার গ্রামে জমিদার আবুল
সম্ভ্রম হারান। এসব ছিল পরিকল্পিত সন্ত্রাস, যাতে মানুষ ভয়ে নীরব হয়ে যায়।
আমাদের গ্রামে কয়েক জন বীর মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন-নূরুল ইসলাম ভূঁইয়া, কামাল হোসেন, আবু কাশেম মুন্সী ও আনোয়ার মাস্টার। তারা জীবন বাজি রেখে স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছেন।
হেকিম চৌধুরীর নামও দাদির মুখে শুনেছি। জনশ্রুতি আছে, পাকিস্তানি সেনারা তার বাড়িতে প্রবেশ করতেন না এবং অনেক সময় তার অনুরোধে বন্দিদের ছেড়ে দিতেন। এতে অনেকে নতুন জীবন ফিরে পেতেন।
এই অঞ্চলে বসবাসকারী হিন্দু সম্প্রদায় বিশেষভাবে নির্যাতনের শিকার হয়। ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রচিন্তা, ভারতপন্থি সন্দেহ এবং জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের লক্ষ্য-সব মিলিয়ে হিন্দুরা হয়ে ওঠে সহজ লক্ষ্যবস্তু। স্থানীয় দোসরদের সহায়তায় তাদের বাড়িঘর লুট, মানুষ হত্যা ও দেশত্যাগে বাধ্য করা হয়।
দাদির কাছ থেকে শোনা আরেকটি ঘটনা হৃদয়বিদারক। পশ্চিম জাওয়ার গ্রামের শিক্ষক অমলের স্ত্রী বাসনা রাণী দেবনাথ ও বিপিন দেবনাথকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয় নৌকায় করে। প্রাণ বাঁচাতে বাসনা রাণী নিজের স্বর্ণালংকার মাঝিকে দিয়ে দেন। মাঝির সহায়তায় তারা পালিয়ে যেতে সক্ষম হন-পুনর্জন্মের মতো ফিরে পান জীবন।
দাদির মুখে শোনা এসব গল্প আমাকে মনে করিয়ে দেয়-মুক্তিযুদ্ধ ছিল কেবল ভূখণ্ডের নয়, ছিল মানবতার লড়াই। এই স্মৃতিগুলো আমাদের চেতনায় বেঁচে থাকুক, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।
লেখক: শিক্ষার্থী, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ,ঢাকা কলেজ।





















