ধর্ষণ বৃদ্ধি: সমাজের জন্য গভীর উদ্বেগ

সুমাইয়া আক্তার সুইটি : বাংলাদেশে নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা দীর্ঘদিনের একটি সামাজিক সমস্যা। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ধর্ষণের ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যাওয়ায় বিষয়টি নতুন করে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। প্রায় প্রতিদিনই সংবাদমাধ্যমে নারী বা শিশু ধর্ষণের শিকার হওয়ার খবর প্রকাশিত হচ্ছে। এসব ঘটনা কেবল একটি অপরাধের পরিসংখ্যান নয়, বরং এটি আমাদের সমাজের নিরাপত্তা, নৈতিকতা এবং আইনের শাসন নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলে। একটি সভ্য সমাজে যেখানে মানুষের মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়ার কথা, সেখানে এমন অপরাধের পুনরাবৃত্তি নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক।

মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে প্রায় ৭৫৯টি ধর্ষণের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। অথচ ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল ৬৩৫টি। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে এই অপরাধ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এসব ঘটনার মধ্যে প্রায় ১৮০টি ছিল গণধর্ষণের ঘটনা এবং ধর্ষণের পর ৩৬ জন নারীকে হত্যা করা হয়েছে।

আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীরা সামাজিক লজ্জা, মানসিক চাপ ও পারিবারিক সংকটের কারণে আত্মহত্যার পথও বেছে নিতে বাধ্য হয়েছেন। শিশুদের ওপর যৌন সহিংসতার ঘটনাও ক্রমেই বাড়ছে, যা সমাজের জন্য আরও ভয়াবহ সংকেত বহন করে। ২০২৪ সালে ধর্ষণের শিকার হয়েছিল প্রায় ২৩৪ জন শিশু। কিন্তু ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সময়েই এই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩০৬ জনে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৭৫ শতাংশ বেশি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়েও বেশি হতে পারে। কারণ অনেক ক্ষেত্রে লজ্জা, ভয় এবং সামাজিক চাপে পরিবারগুলো এসব ঘটনা প্রকাশ করতে চায় না কিংবা আইনি ব্যবস্থা নিতে সাহস পায় না। ধর্ষণের ঘটনা বৃদ্ধির পেছনে বিভিন্ন সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কারণ রয়েছে। অনেক সময় অপরাধীরা দ্রুত ও কঠোর শাস্তি পায় না। বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা এবং শাস্তির অনিশ্চয়তা অপরাধীদের মধ্যে ভয়ের পরিবর্তে এক ধরনের সাহস সৃষ্টি করে। পাশাপাশি সমাজে নৈতিক অবক্ষয় এবং নারীর প্রতি অবমূল্যায়নমূলক মনোভাবও এই সমস্যাকে জটিল করে তুলছে। নারীকে সমান মর্যাদা দেওয়ার মানসিকতা এখনো সমাজের সব স্তরে পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি। আইন-শৃঙ্খলা ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং সামাজিক সচেতনতার অভাবও এ পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলছে ধর্ষণের প্রভাব কেবল ভুক্তভোগীর জীবনেই সীমাবদ্ধ থাকে না, এটি পুরো সমাজের ওপর গভীর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

একজন নারী বা শিশু যখন এমন সহিংসতার শিকার হয়, তখন তার শারীরিক ক্ষতির পাশাপাশি মানসিক ও সামাজিক জীবনও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অনেক ভুক্তভোগী দীর্ঘদিন মানসিক আঘাত ও ট্রমার মধ্যে ভোগেন এবং স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে নানা বাধার সম্মুখীন হন। অনেক সময় তারা সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন এবং তাদের ভবিষ্যৎ জীবন অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যায়। একই সঙ্গে তাদের পরিবারও মানসিক ও সামাজিকভাবে এই ঘটনার ভার বহন করতে বাধ্য হয়। তবে এই পরিস্থিতি পরিবর্তন করা অসম্ভব নয়।

আমরা যদি সম্মিলিতভাবে সচেতন হই এবং কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করি, তবে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব। ধর্ষণের মামলাগুলো দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে অপরাধীদের মধ্যে ভয়ের সৃষ্টি হবে এবং এমন অপরাধের প্রবণতা কমে আসবে। একই সঙ্গে নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও সক্রিয় ও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং গণমাধ্যম যদি একসঙ্গে কাজ করে শিশুদের ছোটবেলা থেকেই মানবিক মূল্যবোধ, পারস্পরিক সম্মান এবং নারীর প্রতি শ্রদ্ধাবোধের শিক্ষা দেয়, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আরও সচেতন ও মানবিক হয়ে উঠবে।

আমরা যদি ধর্ষণের শিকার ভুক্তভোগীদের পাশে দাঁড়াই এবং তাদের জন্য পর্যাপ্ত আইনি সহায়তা, চিকিৎসা ও মানসিক সমর্থনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করি, তবে তারা আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার সাহস পাবে। সমাজ যদি সহমর্মিতা ও সম্মানের সংস্কৃতি গড়ে তোলে, তাহলে ভুক্তভোগীরা আর অবহেলা বা অপমানের শিকার হবে না। ধর্ষণ একটি গভীর সামাজিক সংকট হলেও সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে এই সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব। সচেতনতা, ন্যায়বিচার এবং মানবিক মূল্যবোধকে গুরুত্ব দিলে আমরা অবশ্যই নারী ও শিশুদের জন্য একটি নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও মানবিক সমাজ গড়ে তুলতে পারব।

লেখিকা : শিক্ষার্থী, গার্হস্থ অর্থনীতি বিভাগ, ইডেন মহিলা কলেজ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *