ইহুদীদের রাজনৈতিক অস্ত্র অ্যাসিটোন

আল মাসুম হোসেন : আমরা মুসলিম ধর্ম অনুসারী পৃথিবীর জনসংখ্যার সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়েও কেনো পিছিয়ে তার পর্যালোচনা করলে দেখা যায় আমরা পড়াশোনা, বিজ্ঞানচর্চা,শিল্প, সাহিত্য,দর্শন,ব্যাবসা বাণিজ্য, সাীশক্তি, রাজনীতি ও ধর্মনুসারীদের জাতিগত ভালোবাসা ইত্যাদি সকল ক্ষেত্রেই পিছিয়ে।

২০১২ সাল থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত মোট ৩৫ জন ইহুদি নোবেল পুরস্কার বিজয়ী হয়েছেন। এখানে উল্লেখ্য যে ইহুদি বংশোদ্ভূত বা ইহুদি ধর্মাবলম্বী ব্যক্তিদের গণনায় ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয় উভয়ই বিবেচনা করা হয়েছে। বি.দ্র: কিছু ক্ষেত্রে পিতৃসূত্রে ইহুদি হওয়া ব্যক্তিদেরও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে (যেমন: বব ডিলান, লুইস গ্লিক)। আবার কিছু বিজয়ী ইহুদি পরিবারে জন্মগ্রহণ করলেও বর্তমানে অন্য ধর্ম পালন করলেও তাদের ইহুদি বংশোদ্ভূত হিসেবে ধরা হয়েছে।অপরদিকে মুসলিম নোবেলজয়ী ব্যাক্তি হলো মাত্র তিনজন। কিন্তু বিশ্বে খ্রিষ্টান ধর্মের পর দ্বিতীয় বৃহৎ ধর্ম হলো ইসলাম সেই সাথে মুসলমানদের সংখ্যা প্রায় ২ বিলিয়ন আর ইহুদিদের সংখ্যা মাত্র ১৫-১৬ মিলিয়ন। শুধু বুদ্ধিবৃত্তি নয় পার্থিব জীবনের প্রায় সবক্ষেত্রে ইহুদিদের সরব পদচারণা লক্ষণীয়। আধুনিক রাষ্ট্র ও জীবনের এমন কোন খাত নেই যেখানে ইহুদিদের সদর্প উপস্থিতি নেই।

অ্যাসিটোন হলো জৈব যৌগের কিটোন গ্রুপের রংহীন, উদ্বায়ী ও অতি দাহ্য অর্গানিক দ্রাবক। এটি কিটোনের সবচেয়ে ছোট যৌগ এবং প্রোপানোন নামেও পরিচিত। অ্যাসিটোন প্রথমবারের মতো মধ্যযুগীয় আলকেমিস্টদের দ্বারা শনাক্ত হয়েছিল।

অ্যাসিটোন

তারা লেড অ্যাসিটেট গরম করে একটি উদ্বায়ী পদার্থ পেয়েছিলেন, যা এখন অ্যাসিটোন নামে পরিচিত। এই প্রক্রিয়াটিকে বলা হতো “লেড সুগার ডিস্টিলেশন”।অ্যাসিটোন” নামটি লাতিন শব্দ (acetum) (ভিনেগার) থেকে এসেছে, কারণ এটি অ্যাসিটিক অ্যাসিডের সাথে সম্পর্কিত।শিল্পক্ষেত্রে অ্যাসিটোন উৎপাদনের জন্য কাঠের পাতন (উড ডিস্টিলেশন) পদ্ধতি ব্যবহার করা হতো, যেখানে কাঠের টার থেকে এটি আলাদা করা হত।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অ্যাসিটোনের প্রধান ব্যবহার ছিল বিস্ফোরক (কর্ডাইট) উৎপাদনে।কর্ডাইট ছিল একটি ধোঁয়াবিহীন গানপাউডার বা প্রোপেল্যান্ট, যা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ সামরিক বাহিনীর রাইফেল, আর্টিলারি শেল এবং অন্যান্য অস্ত্রের গুলি চালানোর জন্য অপরিহার্য ছিল। এটি নাইট্রোসেলুলোজ (সেলুলোজ নাইট্রেট) এবং নাইট্রোগ্লিসারিনের মিশ্রণে তৈরি হতো।কর্ডাইট উৎপাদনের জন্য নাইট্রোসেলুলোজকে জেলাটিন আকারে পরিণত করতে অ্যাসিটোন একটি দ্রাবক (সলভেন্ট) হিসেবে ব্যবহৃত হতো। অ্যাসিটোন ছাড়া নাইট্রোসেলুলোজ ও নাইট্রোগ্লিসারিনের মিশ্রণ তৈরি করা সম্ভব ছিল না, ফলে কর্ডাইট উৎপাদন বন্ধ হয়ে যেত।যুদ্ধ শুরুর পর ব্রিটেনে অ্যাসিটোনের চাহিদা ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়, কিন্তু প্রচলিত পদ্ধতিতে (কাঠের পাতন) পর্যাপ্ত পরিমাণে উৎপাদন করা যাচ্ছিল না। এই সংকটে ব্রিটিশ সামরিক সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

তখনই ত্রাতা হয়ে আসেন ডা. চেইম ওয়াইজম্যান, তিনি ব্রিটেনের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ডেভিড লয়েড জর্জ-এর সরাসরি অনুরোধে অ্যাসিটোন উতপাদন সম্পর্কিত গবেষণায় নিয়োজিত হন। তিনি ভুট্টা থেকে Clostridium acetobutylicum ব্যাকটেরিয়ার মাধ্যমে ABE ফার্মেন্টেশন (অ্যাসিটোন-বিউটানল-ইথানল) পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন। এই প্রযুক্তি প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশ সামরিক বাহিনীর জন্য অ্যাসিটোনের চাহিদা মেটাতে সাহায্য করেছিল।এরই মাধ্যমে ব্রিটিশরা প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জয় লাভ করে তারই স্বীকৃতি স্বরুপ ওয়াইজম্যানকে পুরস্কার দিতে চাইলে উনি সেটা প্রত্যাখান করেন এবং তিনি ইহুদিদের কষ্টের কথা তুলে ধরেন। ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে ফিলিস্তিনে ইহুদি জাতীয় আবাসভূমি প্রতিষ্ঠার জন্য সমর্থন লাভ করে। তারই ভিত্তিতে বেলফোর চুক্তি সম্পাদিত হয়ে থাকে (সোর্সঃ ইসরায়েলের পুত্রগণ)।

বেলফোর চুক্তির কথা আশা করি কাউকে বলে দিতে হবে না। ইসরায়েলিরা এই বেলফোর ঘোষণাকে আজকের আধুনিক ইসরায়েল গঠনের ভিত্তি বলে মনে করে।বেলফোর ঘোষণার পর, ইহুদি অভিবাসীরা ফিলিস্তিন অঞ্চলে ভিড় করতে থাকে। পরবর্তীতে চেইম ওয়াইজম্যান নতুন ইসরাইল রাষ্ট্রের প্রথম রাষ্ট্রপতি হোন। এভাবেই পুরো একটি জাতির ভাগ্য বদলে যায়।

২০২১ সালে বিজনেস ইনসাইডার এবং জিউইশ টেলিগ্রাফিক এজেন্সি (জেটিএ) এর বিশ্লেষণে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ ১০০ ধনীর মধ্যে প্রায় ৩০-৪০ জন ইহুদি ধর্ম বা পৈতৃক সংস্কৃতির সাথে যুক্ত। ইন্টারনেটে যুক্তরাষ্ট্রের যেকোন বড় বা মধ্যম আকারের শহরের বিশেষজ্ঞ অথবা জেনারেল প্রাকটিস ডাক্তারের তালিকা চাইলে যে তালিকা পাওয়া যাবে তাতে ২৫ থেকে ৫০ শতাংশ নাম পাওয়া যাবে ইহুদি ডাক্তারদের। বলা হয়ে থাকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রচার ও গণ-বিনোদনের মাধ্যম পাঁচটি বড় কোম্পানি নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। এই কোম্পানিগুলো হল ওয়ার্ল্ড ডিজনি কোম্পানি, টাইম ওয়ার্নার কর্পোরেশন, ভিঅকম (ভিডিও এন্ড অডিও কমিউনিকেশনস) কর্পোরেশন, নিউজ কর্পোরেশন, সনি কর্পোরেশন অব আমেরিকা। আমরিকায় প্রকাশিত ১৫০০ দৈনিক পত্রিকার মধ্যে প্রায় ৭৫শতাংশ পত্রিকা হাতেগোনা কয়েকটি কোম্পানি কতৃক প্রকাশিত আর সেই সকল কোম্পানি ইহুদি কতৃক নিয়ন্ত্রিত যেমনঃ পত্রিকার প্রচারসংখ্যায় সবচেয়ে বড় কোম্পানি গ্যানেট যার প্রকাশিত পত্রিকা হলো ‘ইউএসএ টুডে’ এর প্রতিষ্ঠাতা ফ্রাংক গ্যানেট ও প্রধান নির্বাহী গ্রাসিয়া মর্টোরে একজন ইহুদি। যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় ১৫ টি পত্রিকা-মালিকানার ৯টি কোম্পানির মালিকানা অথবা নিয়ন্ত্রণ ইহুদিদের হাতে।প্রচারের সকল মাধ্যম, বিনোদনের মাধ্যম-রেডিও,টিভি, সিনেমা, ভিডিও, ভিডিও গেইমস, অনলাইন গেইমস-পুস্তক ও সাময়িকীসহ সকল কিছুর উপর ইহুদিদের কর্তৃত্ব থাকার ফলে একজন আমেরিকান কী পড়বে, শুনবে অথবা দেখবে তা নির্ধারণ করে ইহুদিরা। শুধু আমেরিকানরাই নয়, বলতে গেলে সারা বিশ্বই ইহুদি প্রচারমাধ্যমের বন্দি। কারণ আমরা এবং বিশ্বের অন্যান্য দেশের মানুষ যারা উত্তর কোরিয়ার মত বহির্বিশ্বকে ‘ব্ল‍্যাক আউট’ করে রাখি না তারা সকলেই আমেরিকান তথা ইহুদি মিডিয়ার প্রচারের শিকার হই। বহির্বিশ্বের এমনকি দেশেরও বহু ঘটনার চিত্র ও তথ্য আমাদের কাছে আসে আমেরিকান তথা ইহুদি প্রচারযন্ত্রে পরিশোধন হয়ে।আমাদের অজান্তেই ইহুদি প্রচারযন্ত্র অনেক বিষয়ের উপর আমাদের মতামত ও মনোভাব প্রভাবিত করে। আপনি টিভিতে কী দেখবেন, কী বই আপনি পড়বেন, আপনি কীভাবে ইন্টারনেট সার্ফ করবেন, এবং কীভাবে খবর আপনার কাছে পরিবেশন করা হবে, তা তারা নিয়ন্ত্রণ করেন।

পানির মতো পরিষ্কার যে ইহুদিরা যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণকারী। যুক্তরাষ্ট্রের উপর আধিপত্য বিস্তারের মাধ্যমে জাতিসংঘকেও হাতের মুঠোয় রেখেছে তারা।জাতিসংঘের অপর চার ভেটো ক্ষমতাসম্পন্ন দেশ সম্মিলিতভাবে যতবার নিরাপত্তা পরিষদে ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগ করেছে তারচেয়ে বেশীবার ভেটো প্রয়োগ করেছে যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘের ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কোনো ব্যাবস্থা নিতে।

লেখক : শিক্ষার্থী, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়,সভাপতি, (বাংলাদেশ তরুণ কলাম লেখক ফোরাম কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়)।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *