চৌধুরী রুহাশ

“বিষ।”
“কিসের?”
“ইঁদুরের।”

মুদির দোকানের ভেতরে একটা পুরোনো ফ্যান ঘুরছিল। মাথার ওপরে। ধীরে। যেন বাতাস না, সময় কাটাচ্ছে। লোকটা কথাটা বলল খুব স্বাভাবিক গলায়। যেন প্রতিদিনের মতো। যেন আলু বা পেঁয়াজ চাইছে।

দোকানদার কাঠের তাকের প্যাকেটগুলো ঘাঁটল। একটা ছোট্ট লাল প্যাকেট নামিয়ে দিল কাউন্টারে।
“এইটা ভালো। রাতে রাখবেন, সকালে আর দেখতে পাবেন না।”
লোকটা প্যাকেটটা তুলে নিল। অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল। চোখ নড়ছে না। যেন প্যাকেটের ভেতরে থাকা দানাগুলো দেখছে না — ভেতরে থাকা অন্য কিছু।
তারপর বলল, আস্তে —
“আচ্ছা… অমানুষ মারার বিষ পাওয়া যায় না?”
দোকানদার হাত থামিয়ে তাকাল।
“কী বললেন?”
“অমানুষ।” লোকটার গলা শান্ত। “মানুষ না, তবু মানুষের মতো হাঁটে। কথা বলে। হাসে। খায়। তাদের মারার বিষ।”
দোকানদার ঠিক বুঝল না — লোকটা ঠাট্টা করছে, নাকি সত্যিই কিছু একটা বলছে। একটু অস্বস্তি নিয়ে সে বলল,
“সে রকম তো শুনি নাই।”
লোকটা জানালার দিকে তাকাল। রাস্তার ওপাশে কয়েকটা কাক একটা পলিথিন থেকে টানাটানি করছে। ঠিক সেভাবেই — যেভাবে মানুষ টানাটানি করে। লোকটা একটু থেমে বলল,
“থাকলে ভালো হতো। খাবারের সাথে মিশিয়ে রাখতাম। গন্ধ শুঁকে শুঁকে এসে খেয়ে নিত।”
“কথা কেমন বলেন!” দোকানদারের গলায় এবার বিরক্তি। “মানুষ মারার জিনিস বাজারে বিক্রি হয় নাকি?”
“মানুষ না।” লোকটা মাথা নাড়ল। “অমানুষ।”
দোকানের ভেতরে চুপ হয়ে গেল সব। ফ্যানটা ঘুরছে — মাথার ওপরে — কিন্তু তার শব্দও যেন এই মুহূর্তে অদৃশ্য। দূরে একটা রিকশার বেল বাজল। পাশের দোকান থেকে চায়ের কেটলির শব্দ।
লোকটা ধীরে বলল —
“ইঁদুর আসে খাবারের গন্ধে।”
“হ্যাঁ।”
“অমানুষও আসে। ক্ষমতার গন্ধে। টাকার গন্ধে। দুর্বল মানুষের ক্লান্তির গন্ধে। সব জায়গায় ঢুকে পড়ে — ঘরে, অফিসে, বিছানায়, বুকের ভেতরে।”
দোকানদার এবার আর কিছু বলল না। শুধু তাকিয়ে রইল।
লোকটা পকেট থেকে টাকা বের করল। প্যাকেটটা কাউন্টারে রাখল।
“এইটাই দিন।”
টাকা নিয়ে দোকানদার প্যাকেট এগিয়ে দিল।
“ইঁদুরের বিষ।”
লোকটা একটু হাসল। ঠোঁটের কোণে। খুব সামান্য।
“হ্যাঁ। আপাতত ইঁদুরেরটাই চলবে।”

দোকান থেকে বের হয়ে সে হাঁটতে লাগল। বিকেলের আলো কমে আসছে। রাস্তার ধুলোয় একটা লালচে আভা। কোথাও কেউ ডাকছে — দূর থেকে, নাম ধরে। সে ফিরে তাকাল না।
মনে মনে সে ভাবল —
বাজারে ইঁদুরের বিষ সহজেই পাওয়া যায়।
কিন্তু মানুষের ভেতরে জন্ম নেওয়া অমানুষকে মারার কোনো বিষ আজও কেউ বানাতে পারেনি। হয়তো পারবেও না। কারণ সেই অমানুষ কোনো নির্দিষ্ট চেহারায় আসে না — আসে হাসিমুখে, পরিচিত গলায়, আপনজনের কাঁধ ঘেঁষে।
ঘরের ইঁদুর কমে। পৃথিবীর অমানুষ কমে না।
তারা ঠিকই গন্ধ শুঁকে শুঁকে ঢুকে পড়ে — মানুষের জীবনের একদম ভেতরে। এবং থেকে যায়। নিঃশব্দে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *