মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের দাবানলে বাংলাদেশ

শেখ সুলতানা মীম : বর্তমান বিশ্ব রাজনীতিতে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়। ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে তৈরি হওয়া সামরিক ও কূটনৈতিক উত্তেজনা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন অনিশ্চয়তার জন্ম দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের এই ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব কেবল সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এর প্রভাব ধীরে ধীরে বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারে ছড়িয়ে পড়ছে।

তিনটি রাষ্ট্র নিজেদের মধ্যে সরাসরি যুদ্ধ করলেও তাদের প্রতিশোধের তীরে বিদ্ধ হচ্ছে কাতার, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কুয়েত, ওমান, লেবানন সহ গোটা মধ্যপ্রাচ্য। এসব দেশের ভিতরে অবস্থিত তেল শোধনাগারসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার উপর হামলার কারণে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের উৎস।

যার পরোক্ষ প্রভাব পড়ছে আমদানি নির্ভর দেশগুলোর ওপর। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর এই সংঘাত সরাসরি আঘাত হেনেছে অর্থনৈতিক বাজারে। যেখানে প্রতিটি আমদানি নির্ভর দেশ ঝুঁকিতে রয়েছে। চলমান এই সংঘাতের কারণে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে বাংলাদেশ। কারণ বাংলাদেশের প্রয়োজনীয় অধিকাংশ জ্বালানি তেল ও গ্যাস আমদানি করে প্রয়োজন মেটাতে হয়। কিন্তু হরমুজ প্রণালী বন্ধ ও সংঘাতের কারণে এরই মধ্যে ব্রেন্ড ক্রুড অয়েলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১৫ ডলার অতিক্রম করেছে এবং আশঙ্কা করা হচ্ছে সংঘাত যদি আরও দীর্ঘায়িত হয় তাহলে তা ব্যারেলপ্রতি ১৫০ ডলারে পৌঁছাতে পারে। তেল ও গ্যাসের চলমান সংকট বাংলাদেশের অর্থনীতির উপর নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করছে।

বৈশ্বিক সরবরাহ কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই অভ্যন্তরীণ বাজারে তেলের রেশনিং শুরু হয়েছে। তেলের এই সংকট সরাসরি পরিবহন খাত, কৃষি খাত, শিল্প খাত ও বিদ্যুৎ খাতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে। তেল স্বল্পতার কারনে ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান চলাচল সীমিত হয়ে পড়ছে। যার ফলে দেশে পরিবহন ব্যায় দিগুণ হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। রাজধানীসহ দেশজুড়ে পরিবহন ব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির ফলে দেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। পাশাপাশি সাধারণ মানুষের যাতায়াত খরচও বেড়ে যাচ্ছে। পরিবহন ব্যায় বৃদ্ধি পাওয়ায় বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দামও আগের তুলনায় আরও বেড়ে গিয়েছে। দেশের বাজার ব্যবস্থা আগে থেকেই মূল্যবৃদ্ধি জনিত সমস্যায় জর্জরিত ছিল তা এখন আরও সংকটাপন্ন অবস্থা তৈরি করছে। যা জনসাধারণের মনে উদ্বেগ সৃষ্টি হওয়ার বড় কারণ।

দেশের কৃষি ও শিল্প খাতেও জ্বালানি সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। বর্তমানে বাংলাদেশে বোরো মৌসুম চলছে যেসময় বৃষ্টি হওয়ায় সম্ভবনা খুবই কম থাকে। ফলে কৃষকদের কৃত্রিমভাবে জমিতে সেচ দিয়ে ফসল উৎপাদন করতে হয়। কিন্তু তেলের দাম বেড়ে যাওয়া এবং স্বল্পতার জন্য কৃষকরা সময়মতো জমিতে সেচ দিতে পারবে কি না তা নিয়ে দ্বিধায় আছেন। ফলে তাদের কাঙ্ক্ষিত ফসল উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। যার সরাসরি প্রভাব দেশের খাদ্যের যোগানের ভারসাম্যের উপরে গিয়ে পড়বে।

তাছাড়াও জ্বালানি ও গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ার জন্য সার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এমনকি সার কারখানাগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে যা কৃষি খাতকে আরও বিপর্যস্ত এবং ব্যায়বহুল করে তুলছে। উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ার ফলেও বাজারে নিত্য পণ্যের দাম পাল্লা দিয়ে বাড়ে যা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। এমতাবস্থা চলমান থাকলে দেশ খাদ্য ঝুঁকিতে পড়বে। অন্যদিকে ডিজেল ও ফার্নেস অয়েল চালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো উৎপাদন কমাতে বাধ্য হচ্ছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ফলে দেশের শিল্প কারখানা গুলোতে লোডশেডিং এর মাত্রা বাড়ছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক কারখানা গুলোর মতো রপ্তানিমুখী শিল্পখাতে উৎপাদন ব্যাহত হলে এবং তার সাথে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পেলে বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা হারাবে। যা দেশের অর্থনীতির গতিশীলতাকে প্রভাবিত করবে। গ্যাসের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ ও সংকটাপন্ন।

বর্তমান বাংলাদেশে চাহিদা অনুযায়ী উল্লেখযোগ্য পরিমাণ গ্যাসের ঘাটতি রয়েছে। সেই সাথে দেশের অভ্যন্তরীণ গ্যাসক্ষেত্র গুলোর উৎপাদন প্রতিবছরই প্রায় ৫ শতাংশ হারে হ্রাস পাচ্ছে। যার ফলে আমদানিকৃত এলএনজির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের কারণে কাতারসহ দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিবদ্ধ সরবরাহকারীরা ফোর্স মজিউর বা অনিবার্য পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার জন্য এলএনজি সরবরাহে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। গ্যাসের ঘাটতির কারণে দেশের পাঁচটি সরকারি সার কারখানা সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে যাতে সেই গ্যাস বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহার করা যায়।

বর্তমানে দেশের বিদ্যুৎ খাতের চাহিদাই প্রায় ২ হাজার ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট কিন্তু উৎপাদন হচ্ছে মাত্র ৮৫০ থেকে ৯০০ ঘনফুট। উৎপাদনের এই বিশাল ঘাটতির কারণে শিল্প উৎপাদন ও বিদ্যুৎ উৎপাদন উভয়ই চরম হুমকির মুখে। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে কর্মরত বাংলাদেশী প্রবাসীরা চলমান সংঘাতের কারণে আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন এবং কর্ম থেকে বিরত আছেন। যার ফলে দেশে রেমিট্যান্সের হারও কমে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে।

দেশের এই সংকটাপন্ন পরিস্থিতি মোকাবিলা করার জন্য সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে যা নতুন সরকারের কাছে এক কঠিন চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। তবে কৌশলগত নীতি অবলম্বন করলে এই সংকট উত্তরণ সম্ভব হবে। তাই দেশের অর্থনীতিকে গতিশীল রাখার জন্য জ্বালানির বিকল্প উৎস খুঁজতে হবে এবং সেই সাথে জ্বালানি দক্ষতা ও অপচয় রোধ করতে হবে। গবেষণা বলছে, বাংলাদেশে গ্যাস ও বিদ্যুৎ ব্যবহারে দক্ষতা বাড়াতে পারলে প্রায় ৩.৩ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ জ্বালানি সাশ্রয় করা সম্ভব। পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ গ্যাসকূপগুলো রি-ড্রিলিং এবং নতুন গ্যাসকূপ অনুসন্ধানের জন্য বিনিয়োগ বৃদ্ধি করলে আমাদানিকৃত এলএনজির ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব। এছাড়াও জ্বালানি তেলের একটা বড় অংশ ব্যায় হয় পরিবহন খাতে।

যদি সরকার ব্যাক্তিগত গাড়ির জায়গায় মানসম্মত গণপরিবহনের ব্যাবস্থা করে তাহলে জ্বালানি তেল অনেকাংশেই সাশ্রয় করা সম্ভব হবে। অন্যদিকে অপ্রয়োজনীয় আলোকসজ্জা ও বিদ্যুৎ ব্যবহার সাশ্রয় করার ক্ষেত্রেও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। তবেই চলমান এই সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব হবে। সামগ্রিকভাবে মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধ বাংলাদেশকে এক বহুমুখী সংকটের দিকে ঠেলে দিয়েছে, যেখানে খাদ্য, বিদ্যুৎ, জ্বালানি এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তাসহ প্রতিটি ক্ষেত্রেই চরম ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। তাই সরকার ও দেশের জনগনের সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ও সঠিক কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা এবং তা বাস্তবায়ন করতে পারলেই এই সংকট মোকাবিলা করা যাবে এবং দেশ তার গতিশীলতা বজায় রেখে উন্নতির দিকে এগোতে সক্ষম হবে।

লেখিকা : শিক্ষার্থী,ইডেন মহিলা কলেজ (ইংরেজি বিভাগ)।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *