উম্মে হাবিবা : ‘স্বাধীনতা’—এই শব্দটা আসলে কী? আমাদের মনে কি কখনো এই প্রশ্নটা উঁকি দেয় না? আমরা কি কখনো ভেবে দেখেছি, কেন একটি শব্দকে ঘিরে একটি জাতি অকাতরে প্রাণ দেয়? কেন একটি পতাকার লাল বৃত্তে মিশে থাকে লক্ষ কোটি মানুষের দীর্ঘশ্বাস আর মমতা?
আসুন, আজ আমি আপনাদের বলব স্বাধীনতা আসলে কী। স্বাধীনতা কেবল একটি ভূখণ্ড নয়, স্বাধীনতা হলো এক জননীর পরম মমতা আর সন্তানের অদম্য সাহসের এক মহাকাব্য।
স্বাধীনতা—মানুষের চিরকালীন আরাধ্য এক সত্তা। এটি কেবল একটি মানচিত্র বা পতাকায় সীমাবদ্ধ কোনো অধিকার নয়, বরং এটি মানুষের নিশ্বাসের মতো অপরিহার্য। মা যেমন তার সন্তানকে দশ মাস দশ দিন জঠরে ধারণ করে অসহ্য যন্ত্রণার পর পৃথিবীর আলো দেখান, একটি জাতির স্বাধীনতাও ঠিক তেমনি দীর্ঘ প্রতীক্ষা, সংগ্রাম আর ত্যাগের গর্ভ থেকে জন্ম নেয়। এই স্বাধীনতা শব্দটির প্রতিটি বর্ণে মিশে আছে অগণিত মায়ের চোখের জল, বোনের সম্ভ্রম আর পিতার অকুতোভয় আত্মদান। এটি কেবল শৃঙ্খল মুক্তি নয়, এটি একটি জাতিসত্তার নিজের মতো করে বেড়ে ওঠার নাম।
মানুষ স্বভাবতই স্বাধীনচেতা। সৃষ্টির প্রতিটি অণু-পরমাণু নিজস্ব কক্ষপথে আবর্তিত হতে চায়। কিন্তু যখন সেই স্বাধীন গতিপথে বাধার সৃষ্টি হয়, তখনই জন্ম নেয় বিদ্রোহ। স্বাধীনতার মূল সুরটি আসলে মমতার ওপর দাঁড়িয়ে। নিজের দেশ, নিজের ভাষা আর নিজের সংস্কৃতির প্রতি যে গভীর মমতা, তা থেকেই স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা তীব্রতর হয়। যখন কোনো শোষক গোষ্ঠী একটি জাতির মুখের ভাষা কেড়ে নিতে চায়, যখন তারা মাটির মমতাজাল ছিন্ন করে হুকুমদারি চালাতে চায়, তখনই শুরু হয় মুক্তির সংগ্রাম।
১৯৭১ সালে আমরা যখন আমাদের স্বাধীনতার যুদ্ধ শুরু করেছিলাম, তখন আমাদের মূল চালিকাশক্তি ছিল এই মমতা। দেশের সবুজ ঘাস, মেঠোপথ আর মায়ের আঁচলের গন্ধকে রক্ষা করার এক অদম্য জেদ থেকেই আমরা ঘর ছেড়েছিলাম। সেই মমতা ছিল জীবনের চেয়েও বড়। কারণ, পরাধীনতার গ্লানি নিয়ে বেঁচে থাকা আর খাঁচায় বন্দি পাখির মতো পাখা ঝাপটানো একই কথা। স্বাধীনতা হলো সেই বিশাল আকাশ, যেখানে ডানা মেলে ওড়া যায় পরম মমতায়।
”চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির,
জ্ঞান যেথা মুক্ত, যেথা গৃহের প্রাচীর…”
— বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
সংস্কৃতে একটি প্রবাদ আছে— “জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপি গরীয়সী” অর্থাৎ জননী এবং জন্মভূমি স্বর্গের চেয়েও শ্রেষ্ঠ। মায়ের মমতা আর দেশের প্রতি ভালোবাসা মূলত একই উৎস থেকে উৎসারিত। মা যেমন আমাদের শরীর গঠন করেন, দেশ মাটি তেমনি আমাদের সত্তা গঠন করে।
যুদ্ধের ময়দানে যখন একজন মুক্তিযোদ্ধা আহত হয়ে লুটিয়ে পড়েন, তার শেষ আকুতি থাকে “মা”। সেই ‘মা’ যেমন গর্ভধারিণী জননী, তেমনি তা প্রিয় জন্মভূমি। যে মমতা দিয়ে মা তার সন্তানকে আগলে রাখেন, দেশমাতৃকাও ঠিক তেমনি তার অরণ্য, নদী আর ছায়া দিয়ে আমাদের আগলে রাখে। পরাধীনতার অর্থ হলো সেই মায়ের আঁচল টেনে ছিঁড়ে ফেলা। ১৯৭১ সালে বাংলার দামাল ছেলেরা অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিল কারণ তারা তাদের মায়ের অপমান সহ্য করতে পারেনি। এই মমতা কেবল আবেগ নয়, এটি একটি প্রচণ্ড শক্তি যা কামানের গোলার চেয়েও শক্তিশালী।
”মায়ের মতন আপন কেহ নাইরে এ সংসারে,
সেই সে মাটির দেশ আমায় যে ডাকছে বারে বারে।”
— পল্লীকবি জসীমউদ্দীন
পৃথিবীর কোনো স্বাধীনতাই বিনা পরিশ্রমে বা আপসে আসেনি। প্রতিটির পেছনে রয়েছে এক দীর্ঘ কালপঞ্জি। বাঙালির স্বাধীনতার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এটি ছিল মমতা আর কঠোর সংগ্রামের এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ। ১৯৫২-র ভাষা আন্দোলন ছিল ভাষার প্রতি মমতার বহিঃপ্রকাশ। নিজ মায়ের ভাষাকে রক্ষা করার জন্য যারা রাজপথে বুক পেতে দিয়েছিল, তারা আসলে মমতারই জয়গান গেয়েছিল।
১৯৬৬-র ছয় দফা এবং ১৯৬৯-র গণঅভ্যুত্থান—প্রতিটি ধাপ ছিল আমাদের মমত্ববোধকে রাজনৈতিক আধারে রূপান্তর করা।
১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ যখন স্বাধীনতার ঘোষণা এল, তখন সেই ডাক প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে গিয়ে আছড়ে পড়েছিল। কেন? কারণ সেই ডাকের পেছনে ছিল এক চিরন্তন সত্য—নিজের অধিকার ফিরে পাওয়ার আকুতি। নয় মাস ধরে যে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ চলেছিল, তাতে মমতার এক অভূতপূর্ব ছবি দেখা গেছে। গ্রামবাংলার সাধারণ মায়েরা মুক্তিযোদ্ধাদের নিজের সন্তানের মতো লুকিয়ে রেখেছেন, নিজের শেষ সম্বলটুকু দিয়ে খাবার জুগিয়েছেন। এটি কি কেবল রাজনীতি ছিল? না, এটি ছিল দেশমাতার প্রতি গভীর ভালোবাসা। ৩০ লক্ষ শহীদের রক্ত আর ২ লক্ষ মা-বোনের ত্যাগের বিনিময়ে পাওয়া এই স্বাধীনতা তাই আমাদের কাছে এক পবিত্র আমানত।
”সাবাস, বাংলাদেশ, এ পৃথিবী অবাক তাকিয়ে রয়:
জ্বলে পুড়ে-মরে ছারখার তবু মাথা নোয়াবার নয়।”
— কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য
অনেকের কাছে স্বাধীনতা মানে যা খুশি তাই করা। কিন্তু প্রকৃত অর্থে স্বাধীনতা মানে এক বিশাল দায়িত্ব। যেমন একটি মা তার সন্তানকে অবাধ স্বাধীনতা দেন কিন্তু সবসময় নজর রাখেন যাতে সন্তান বিপথে না যায়, দেশও তেমনি আমাদের স্বাধীনতা দিয়েছে যাতে আমরা নিজেদের সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে পারি।
বাক স্বাধীনতা:— মনের ভাব প্রকাশ করার অধিকার।
অর্থনৈতিক মুক্তি:— দারিদ্র্যের শৃঙ্খল থেকে মুক্তি।
cultural স্বাতন্ত্র্য:— নিজের ঐতিহ্যকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরা।
এই প্রতিটি ক্ষেত্রেই মমতার স্পর্শ প্রয়োজন। যদি আমরা একে অপরের প্রতি সহমর্মী না হই, তবে সেই স্বাধীনতা কেবল নামমাত্র হয়ে দাঁড়াবে। স্বাধীনতার পূর্ণ স্বাদ তখনই পাওয়া যায়, যখন সমাজের শেষ প্রান্তে থাকা মানুষটির মুখেও হাসি ফোটে।
”পরের কারণে স্বার্থ দিয়া বলি,
এ জীবন মন সকলি দাও—
তার মতো সুখ কোথাও কি আছে?
আপনারে লভিয়া বিলাইয়া দাও।”
— কবি কামিনী রায়
আমরা যখন দেশকে ‘মা’ বলে ডাকি, তখন তার প্রতি আমাদের দায়িত্বও সন্তানের মতো হয়ে যায়। মা যেমন তার সন্তানকে আগলে রাখেন, দেশও আমাদের অন্ন, বস্ত্র ও আশ্রয় দিয়ে আগলে রেখেছে। এই মমতার প্রতিদান দেওয়া আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। দুর্নীতি, বৈষম্য আর হিংসা দিয়ে যদি আমরা দেশটাকে ভরিয়ে তুলি, তবে স্বাধীনতার মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হয়।
আজকের তরুণ প্রজন্মের কাছে স্বাধীনতা মানে কেবল বিশেষ দিনগুলোতে জাতীয় পতাকা ওড়ানো নয়। বরং স্বাধীনতা মানে হলো ত্যাগের সেই চেতনাকে ধারণ করা। মমতা নিয়ে দেশের মানুষের পাশে দাঁড়ানো, আর্তমানবতার সেবা করা এবং দেশের সম্পদ রক্ষা করা—এগুলোই হলো আধুনিক যুগের স্বাধীনতার সংগ্রাম। মনে রাখতে হবে, স্বাধীনতা অর্জন করা কঠিন, কিন্তু তা রক্ষা করা আরও অনেক বেশি কঠিন। আর এই রক্ষার হাতিয়ার হলো একে অপরের প্রতি মমতা এবং দেশপ্রেম।
”আমরা ছাত্রদল—
মায়ের চরণে বিলিয়ে দিতে এসেছি মোদের বল।”
— বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম
আমরা কি কখনও ভেবে দেখেছি, কেন একজন মা তার সন্তানকে কোনো বিনিময় ছাড়াই ভালোবেসে যান? ঠিক তেমনই দেশপ্রেম কোনো স্বার্থের ধার ধারে না। দেশকে আগলে রাখা মানে হলো দেশের মাটিকে কলুষমুক্ত রাখা। যখন একটি গাছ কাটা হয়, তখন যেন আমাদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়—এটাই মমতার টান। যখন দেশের কোনো মানুষ কষ্টে থাকে, তখন তাকে নিজের ভাই বা বোন মনে করে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়াটাই হলো স্বাধীনতার প্রকৃত উদযাপন।
মায়ের যেমন বার্ধক্যে সেবার প্রয়োজন হয়, স্বাধীনতার বহু বছর পর আমাদের দেশমাতৃকাও আজ আমাদের সেবা চায়। সে সেবা হলো মেধা দিয়ে দেশকে এগিয়ে নেওয়া, সততা দিয়ে সমাজ গড়া। যদি আমরা মমতা দিয়ে দেশকে আগলে রাখতে না পারি, তবে বাইরের শত্রু নয়, আমাদের ভেতরের অবক্ষয়ই আমাদের পরাধীন করে ফেলবে।
”সার্থক জনম আমার জন্মেছি এই দেশে,
সার্থক জনম মাগো তোমায় ভালোবেসে।”
— বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
পরিশেষেঃ—
স্বাধীনতা কোনো স্থির বস্তু নয়, এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। মমতা যেমন প্রতিদিন নতুন নতুন রূপে প্রকাশিত হয়, স্বাধীনতার স্বাদও আমাদের প্রতিদিন অর্জন করতে হয় সুশাসনের মাধ্যমে। লাল-সবুজের যে পতাকাটি আজ আকাশে ওড়ে, তা কেবল এক টুকরো কাপড় নয়—এটি আমাদের অস্তিত্ব, আমাদের দর্পণ। এই পতাকার নিচে দাঁড়িয়ে আমরা শপথ নিই, আমরা আমাদের দেশকে এতটাই ভালোবাসব যে কোনো অশুভ শক্তি আমাদের গ্রাস করতে পারবে না।
স্বাধীনতা মানেই হলো মমতার বিশাল চাদর, যা আমাদের সবাইকে এক সুতোয় বেঁধে রাখে। এই বাঁধন যেন কখনও আলগা না হয়। শহীদদের রক্তের ঋণ আমরা কখনও শোধ করতে পারব না, কিন্তু একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ দেশ গড়ে তুলে তাঁদের আত্মার শান্তি কামণা করতে পারি। আসুন, আমরা স্বাধীনতার এই অমিয় সুধাকে মমতার সাথে হৃদয়ে ধারণ করি এবং পরবর্তী প্রজন্মের জন্য এক বাসযোগ্য, সুন্দর পৃথিবী রেখে যাই।
”মহা-বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত
আমি সেই দিন হব শান্ত,
যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল আকাশে-বাতাসে ধ্বনিবে না,
অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ ভীম রণ-ভূমে রণিবে না—”
— বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম
দেশের প্রতি এই যে মমতা, তা কেবল হৃদয়ে জমিয়ে রাখার জন্য নয়, বরং তা কর্মে প্রতিফলিত করার জন্য। আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি সুজলা-সুফলা দেশ গড়তে হলে আমাদের প্রত্যেককে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সততার সাথে দায়িত্ব পালন করতে হবে। আমাদের শিক্ষা যেন কেবল পুঁথিগত না হয়, তা যেন হয় দেশ গড়ার হাতিয়ার। আমরা যদি দুর্নীতিকে ঘৃণা করি, পরিবেশকে রক্ষা করি এবং একে অপরের বিপদে মমতার হাত বাড়িয়ে দিই, তবেই আমাদের স্বাধীনতা সার্থক হবে। ৩০ লক্ষ শহীদের আত্মা তখনই শান্তি পাবে, যখন এই বাংলার প্রতিটি ঘরে অন্নের অভাব থাকবে না, প্রতিটি শিশুর হাতে বই থাকবে এবং প্রতিটি মানুষ নির্ভয়ে তার অধিকার ভোগ করতে পারবে। আসুন, আমরা শপথ নিই—আমরা কেবল একটি স্বাধীন দেশের নাগরিকই হবো না, বরং এই দেশকে বিশ্বের দরবারে শ্রেষ্ঠ আসনে বসানোর কারিগর হবো।
”আমরা চলিব পশ্চাতে ফেলি’ পচা অতীত,
গিরি গুহা সম মরুভূমি তট তিতিব।
আমরা আনিব রাঙা প্রভাত,
আমরা ঘুচাব তিমির রাত।”
— জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলা।





















