সাবিহা তারান্নুম মিম : মানুষ মরণশীল। ক্ষুদ্র এই জীবনে মানুষ সুন্দর করে গড়ে তোলার প্রয়াসে নানাভাবে সংগ্রাম করে। অল্প সময়ের এই জীবনে বেঁচে থাকার উপলক্ষ হিসেবে মানুষ নানা স্বপ্ন দেখে। কখনো সাফল্যের আলোর মুখ দেখে, কখনো ব্যর্থতার অন্ধকারে হীনমন্যতায় ভোগে। এই হতাশা ও মানসিক বিপর্যয় সমাজের গভীরে লুকিয়ে থাকা সংকটেরই প্রতিফলন। ফলস্বরূপ আত্মহত্যার শিকড় গভীরভাবে সামাজিক বাস্তবতার সাথে জড়িত। মূলত মানুষের জীবন, চিন্তা ও আচরণ সমাজের সাথে ওতপ্রোতভাবে সম্পর্কিত। যখন ব্যক্তি নিজেকে অসহায় ও নিঃসঙ্গ মনে করে এবং সমস্যার কোনো পথ খুঁজে পায় না, তখন অনেক সময় সে আত্মহত্যার মতো চরম ও মর্মান্তিক পথ বেছে নেয়। তাই আত্মহত্যা কেবল ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়। এই আত্মবিধ্বংসী প্রবণতা সমাজে ক্রমবর্ধমান হওয়ায় আজ একটি গুরুতর সামাজিক সংকটে পরিণত হয়েছে। স্বাস্থ্য হলো শরীর ও মনের পরিপূর্ণ সুস্থতা।
আমাদের সমাজে স্বাস্থ্য বলতে মূলত প্রাধান্য দেয়া হয় শারীরিক স্বাস্থ্যকে, অন্যদিকে অবহেলিত হয়ে যায় মানসিক স্বাস্থ্য। আমরা সুখের ভিত্তি হিসেবে প্রথমেই শারীরিক সুস্থতাকে বিবেচনা করি। অথচ মন ভালো থাকলে তা মানুষের দৈনন্দিন জীবনে পারিবারিক, সামাজিক সকল সম্পর্কে ইতিবাচক প্রভাব বিস্তার করে। বিপরীতে মানসিক অসুস্থতা মানুষের জীবনে দুর্দশা বয়ে আনে, বিচ্ছিন্ন করে দেয় ধীরে ধীরে সকল ইতিবাচক পরিবেশ থেকে, বয়ে আনে অপরিসীম দুঃখ।
মূলত মানসিক স্বাস্থ্য একটি অবহেলিত বিষয়। যার ফলস্বরূপ আমাদের সমাজে নানা ধরনের মনোসামাজিক সমস্যা দেখা দিচ্ছে। এসব মনোসামাজিক সমস্যার কালো ছায়া পরিবার ও সমাজের গণ্ডি পেরিয়ে জাতীয় সামাজিক সংকটে পরিণত হয়েছে। উন্নত বিশ্বে মানসিক স্বাস্থ্যকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে প্রাধান্য দেয়া হয়। কিন্তু বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে মানসিক স্বাস্থ্যকে এখনো গুরুত্বের সাথে পর্যালোচনা করা হয় না। যখন কোনো সমস্যা সমগ্র সমাজে প্রভাব বিস্তার করে তখন তা একটি দেশের সামাজিক সংকটে পরিণত হয়। আত্মহত্যা ব্যক্তি ও সমাজের পারস্পরিক সম্পর্কের দুর্বলতাকেই নির্দেশ করে। দুঃখজনকভাবে সাম্প্রতিক বাস্তবতায় দেখা যায়, আত্মহত্যা প্রতিনিয়ত ব্যাধির মতো ছড়িয়ে পড়ছে। বাংলাদেশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আত্মহত্যার হার ঊর্ধ্বমুখী। এখানে পারিবারিক কলহ, স্বামী-স্ত্রীর বিচ্ছেদ, আর্থিক সংকট, সম্পর্কের অবনতি কিংবা সন্তানের সঠিক সামাজিকীকরণের অভাব গুরুত্বপূর্ণ এসব কারণ মানসিক বিপর্যয়ের নিয়ামক হিসেবে কাজ করছে। সমাজে যখন পারিবারিক বন্ধন দুর্বল হয়, সামাজিক সহমর্মিতা কমে যায় এবং মানুষ মানসিক সমর্থন থেকে বঞ্চিত হয়, তখন ব্যক্তি নিজেকে বিচ্ছিন্ন করতে শুরু করে।
বিচ্ছিন্নতার চরম পর্যায়ে তাকে হতাশা ও আত্মবিধ্বংসী চিন্তার দিকে ঠেলে দেয়। তাই মনোসামাজিক সমস্যাগুলো নিয়ন্ত্রণে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। সেই লক্ষ্যে ব্যক্তির মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কিত বিভিন্ন সেমিনার, কাউন্সিলিং সেবা কার্যক্রমে সরকার এবং সংশ্লিষ্ট বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। আয়োজিত সেমিনারে মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে বিভিন্ন দিক, মানসিক সুস্থতা অর্জনের উপায় আলোচনা করতে হবে। যাতে সকল পর্যায়ের মানুষ তাদের মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠে। আঁচল ফাউন্ডেশনের এক সমীক্ষার তথ্যে উঠে আসে, “এক বছরে ৪০৩ শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা”। তাই গ্রাম থেকে শহর সকল পর্যায়ের বিভিন্ন স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠানে কাউন্সেলিং প্রোগ্রাম আয়োজন করতে হবে। যাতে শিক্ষার্থীরা মানসিক সমর্থনের মাধ্যমে হতাশা ও হীনমন্যতা কাটিয়ে উঠতে পারে।
আমাদের সমাজে মানসিক রোগ নিয়ে সামাজিক হীনমন্যতা কাজ করে। অনেক মানুষ মানসিক কষ্টকে গুরুত্ব দেয় না, সামাজিক লজ্জার ভয়ে সাহায্য চাইতে পারে না। যার ফলে তাদের সমস্যাগুলো ধীরে ধীরে গভীর হয়ে মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছে যায়। তাই বিভিন্ন স্তরে কাউন্সিলিং প্রোগ্রামের মধ্যে দিয়ে বিভিন্ন ধরনের আবেগগত সহায়তা প্রদান করতে হবে যা তাদের মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করবে। পাশাপাশি আধুনিক জীবনধারায় মানসিক স্বাস্থ্যের উপর বহুমাত্রিক চাপ সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে তরুণ সমাজে প্রত্যাশা ও বাস্তবতার সংঘাত হতাশা বাড়িয়ে দেয়। অর্থনৈতিক চাপ ও বেকারত্ব আত্মহত্যার অন্যতম সামাজিক কারণ। কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ তরুণদের মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে। ফলে তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে ডিজিটাল মাধ্যমকে ব্যবহার করে বিভিন্ন অনুপ্রেরণামূলক ভিডিওর মাধ্যমে উৎসাহ প্রদান করা যেতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি যত্নশীল হওয়ার সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিও প্রচারণা করা যেতে পারে।
সুতরাং আত্মহত্যা প্রতিরোধ করতে হলে কেবল ব্যক্তি দোষারোপ না করে; বরং সমাজকে আরও সহমর্মী, সহায়ক ও সচেতন হতে হবে। জাতীয় পর্যায়ে মানসিক স্বাস্থ্য নীতি বাস্তবায়ন করতে হবে।
যেহেতু পারিবারিক দ্বন্দ্ব, দাম্পত্য কলহ, সামাজিক বৈষম্য ও অপমানও আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়ায়। তাই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ব্যক্তিদের সমাজ থেকে যেন বিচ্ছিন্ন না করে দেয়। এজন্য দেশের জনগণকে মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে শিক্ষিত করে তুলতে হবে। যাতে মানসিক সুস্থতাকে তারা অবমূল্যায়ন না করে এবং মানসিক স্বাস্থ্য সেবার দিকে মনোযোগী হয়। সর্বোপরি দেশের টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে মানসিক স্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দিতে হবে। সকল পর্যায়ের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে আত্মহত্যার মতো সামাজিক সংকটকে মোকাবেলা করতে হবে। জাতির উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে এই সংকট নিরসন একটি সুস্থ, মানবিক ও উৎপাদনশীল সমাজ গঠনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক। স্বাস্থ্যনীতি, সামাজিক সচেতনতা, পারিবারিক সহায়তা, মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সহানুভূতি ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিতের মাধ্যমে এই উপেক্ষিত সংকট মোকাবিলা করে একটি সুস্থ সমাজের ভিত্তি ও উৎপাদনশীল জাতি গড়ে তোলা সম্ভব।
লেখিকা : স্টুডেন্ট ইডেন মহিলা কলেজ, (সমাজকর্ম বিভাগ)
ইমেইল : tarannumsabiha0@gmail.com





















