নারীর ক্ষমতায়ন ও নিরাপত্তা: টেকসই উন্নয়নের পূর্বশর্ত

শেখ সুলতানা মীম : সভ্যতার শুরু থেকেই নারী মানবসমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ইতিহাসের প্রতিটি অধ্যায়ে নারীর অবদান কোনো না কোনোভাবে বিদ্যমান থাকলেও দীর্ঘ সময় ধরে তা অবমূল্যায়িত ও উপেক্ষিত হয়ে এসেছে। আধুনিক বিশ্বে আজ নারীরা কেবল পরিবারের গণ্ডির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং সমাজ, রাষ্ট্র ও বৈশ্বিক পরিসরে তারা নিজেদের দক্ষতা, মেধা ও যোগ্যতার স্বাক্ষর রেখে চলেছে। তাই নিঃসন্দেহে বলা যায়, নারী শক্তি ও নারী মেধাই একটি দেশের টেকসই উন্নয়নের মূল ভিত্তি।

নারী ছাড়া উন্নয়ন কেবল একটি অসম্পূর্ণ ধারণা মাত্র।বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকই নারী। এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে পিছনে রেখে কোনো রাষ্ট্র বা সমাজ কখনোই প্রকৃত অর্থে উন্নত হতে পারে না। পরিবারের একজন সাধারণ গৃহিণী থেকে শুরু করে শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রশাসক, বিচারক, রাজনীতিবিদ কিংবা রাষ্ট্রপ্রধান সব ক্ষেত্রেই নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ আজ দৃশ্যমান।

তারা একদিকে পরিবারকে আগলে রাখে, অন্যদিকে সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। নারীর এই বহুমুখী ভূমিকা প্রমাণ করে যে তারা কোনো অংশেই পুরুষের তুলনায় কম দক্ষ নয়।শিক্ষা ক্ষেত্রে নারীদের অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বর্তমানে মেয়েরা স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনায় অসাধারণ সাফল্য অর্জন করছে। অনেক ক্ষেত্রে তারা ছেলেদেরও ছাড়িয়ে যাচ্ছে। নারী শিক্ষকরা ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। চিকিৎসা ক্ষেত্রে নারী চিকিৎসক ও নার্সরা মানবসেবায় নিজেদের নিয়োজিত রেখেছেন।

প্রশাসন, আইন ও বিচার বিভাগে নারীদের অংশগ্রহণ রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমকে আরও মানবিক ও কার্যকর করে তুলেছে। রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করছে এবং অর্থনীতিতে নারীর অবদান জাতীয় উৎপাদন ও উন্নয়নে নতুন গতি সঞ্চার করছে।


এতসব ইতিবাচক অগ্রগতির পরও নারীদের জীবনে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে নিরাপত্তাহীনতা। এটি এক নির্মম ও দুঃখজনক বাস্তবতা যে, সমাজে নারীদের অবদান যতই গুরুত্বপূর্ণ হোক না কেন, তারা এখনো নানাভাবে নিপীড়ন ও সহিংসতার শিকার হচ্ছে।

ধর্ষণ, শ্লীলতাহানি, ইভ টিজিং, পারিবারিক সহিংসতা, মানসিক ও সামাজিক নির্যাতনের মতো ঘটনাগুলো নারীর স্বাভাবিক জীবনযাপনকে বাধাগ্রস্ত করছে। এসব অপরাধ কেবল একজন নারীর নিরাপত্তাকেই নয়, বরং সমাজের নৈতিক ভিত্তিকেও দুর্বল করে দেয়।

বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে এই নিরাপত্তাহীনতা মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। অনেক মেয়েকে প্রতিদিন স্কুল, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার পথে নানা ধরনের হয়রানির মুখোমুখি হতে হয়। রাস্তাঘাটে, গণপরিবহনে কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশে তারা কটূক্তি, বিদ্রূপ ও অপমানজনক আচরণের শিকার হয়। অনলাইন মাধ্যমও আজ নারীদের জন্য আরেকটি ঝুঁকিপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কটূক্তি, অপপ্রচার ও মানসিক নির্যাতন নারীদের আত্মবিশ্বাস ভেঙে দিচ্ছে।এর ফলে অনেক মেধাবী নারী শিক্ষার্থী পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারছে না। কেউ পরিবার বা সমাজের চাপে শিক্ষাজীবন অসম্পূর্ণ রেখে দিতে বাধ্য হচ্ছে, আবার কেউ মানসিক চাপের কারণে নিজের সম্ভাবনাকে বিকশিত করতে পারছে না।

এটি শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতিই নয়; বরং জাতির জন্য একটি অপূরণীয় ক্ষতি। কারণ একটি মেধাবী নারী শিক্ষার্থী ঝরে পড়া মানে একটি সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ হারিয়ে যাওয়া।সমাজের অবক্ষয় এতটাই ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে যে ছোট ছোট কন্যাশিশুরাও সহিংসতার শিকার হচ্ছে। তাদের নিষ্পাপ শৈশব নিরাপত্তাহীন হয়ে উঠছে, যা মানবতার জন্য এক গভীর উদ্বেগের বিষয়। এসব ঘটনা শিশুদের মানসিক বিকাশে দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং একটি সুস্থ সমাজ গঠনের পথে বড় বাধা সৃষ্টি করে। জুলাই ২০২৪ আন্দোলনের মাধ্যমে স্বৈরাচারের পতন ঘটিয়ে বাংলাদেশ আবার নতুন ভাবে স্বাধীন হয়েছে।কিন্তু সেই স্বাধীন গণতন্ত্র দেশ আজও নারীদের জন্য অনিরাপদ থেকে গেলো। প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও কন্যা শিশু ধর্ষণ, নারীদের শ্লীলতাহানি, মানসিক নির্যাতনের খবর শোনা যায় যা সমাজ ও জাতিকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয়। নারীদের প্রতি এই সহিংসতা ও বৈষম্যের মূল কারণ হিসেবে সামাজিক মানসিকতা, অজ্ঞতা ও নৈতিক অবক্ষয়কে দায়ী করা যায়। অনেক ক্ষেত্রে নারীদের দুর্বল হিসেবে দেখার প্রবণতা এখনো সমাজে বিদ্যমান।

এছাড়াও অপর্যাপ্ত আইন প্রয়োগ, বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং সামাজিক সচেতনতার অভাব এসব অপরাধকে আরও উৎসাহিত করে। বাংলাদেশের সংবিধানেের ২৮ নং অনুচ্ছেদে নারী ও পুরুষের সমান অধিকার এবং নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে সেই আদেশ প্রণয়নে যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। অনেক অপরাধী তাদের ক্ষমতা ও অর্থের বিনিময়ে নির্বিঘ্নে বাইরে ঘুরাফেরা করে। প্রশাসন তাদের সঠিক ও কঠোর শাস্তি প্রদানে ব্যর্থ হয়। যার ফলে তারা আবার সেই একই অপরাধ করে পিছু পা হয় না। এসব নিকৃষ্ট মানুষদের জন্য সমাজ ও রাষ্ট্রে নারীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। তাই নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কেবল রাষ্ট্রের একক দায়িত্ব নয়; এটি পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্মিলিত দায়িত্ব। রাষ্ট্রকে কঠোর আইন প্রণয়ন ও তার যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। অপরাধীদের দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করতে পারলেই অপরাধ প্রবণতা কমবে।

একই সঙ্গে বিচার প্রক্রিয়াকে নারীবান্ধব ও সহজলভ্য করে তুলতে হবে, যাতে ভুক্তভোগীরা নির্ভয়ে আইনের আশ্রয় নিতে পারে।তবে আইন প্রয়োগই যথেষ্ট নয়। সমাজে সচেতনতা সৃষ্টি করা আরও বেশি জরুরি। পরিবার থেকেই নারীদের প্রতি সম্মানবোধ ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে হবে। ছেলে ও মেয়েকে সমানভাবে মানুষ করার মানসিকতা তৈরি করতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে নৈতিক শিক্ষা, মূল্যবোধ ও পারস্পরিক সম্মানের শিক্ষা জোরদার করা প্রয়োজন।গণমাধ্যম এক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

নারীকে পণ্য বা দুর্বল হিসেবে নয়, বরং একজন সম্মানিত মানুষ হিসেবে উপস্থাপন করতে হবে। সামাজিক সংগঠন ও স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানগুলোকে নারীর অধিকার ও নিরাপত্তা বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে এগিয়ে আসতে হবে।পরিশেষে বলা যায়, নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে কোনো দেশ বা সমাজের টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।

নারী কেবল ভোগের বস্তু নয়, সে সমাজের অর্ধেক শক্তি ও মেধার ধারক। একটি সভ্য, মানবিক ও উন্নত সমাজ গড়ে তুলতে হলে নারীকে মর্যাদা, নিরাপত্তা ও সমান অধিকার দিতে হবে। তবেই নারী শক্তি ও নারী মেধা দেশের প্রকৃত উন্নয়নের চালিকাশক্তি হিসেবে কার্যকর ভূমিকা পালন করবে এবং দেশ উন্নতির শিখরে পৌঁছাতে পারবে। পরিশেষে বলা যায়, নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে কোনো সমাজের উন্নয়ন সম্ভব নয়। নারী সমাজের অর্ধেক শক্তি ও সম্ভাবনার ধারক। তাই তাদের মর্যাদা, অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করলেই একটি মানবিক, উন্নত ও টেকসই সমাড়ে তোলা সম্ভব।

লেখিকা : স্টুডেন্ট ইডেন মহিলা কলেজ (ইংরেজি বিভাগ)

ইমেইল : sheikhsultanameem@gmail

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *