উম্মে হাবিবা
কুমিল্লার দেবিদ্বার থানা। যে জনপদ গোমতী নদীর কলতানে মুখরিত, যেখানে সবুজ শ্যামলিমার ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে থাকে সাধারণ মানুষের হাজারো স্বপ্ন। সেই জনপদের একটি অত্যন্ত সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম নেয় একটি শিশু। নাম রাখা হয় ফারহান। জন্মের পর যখন তার বাবা-মা জানতে পারলেন তাদের আদরের সন্তানটি তথাকথিত স্বাভাবিক পুরুষ নয়, বরং সে একজন হিজড়া—তখন তাদের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ার কথা ছিল। কিন্তু রক্ত কি আর সামাজিক সংস্কার মানে?
ফারহানের বাবা-মা তাকে পরম মমতায় আগলে নিলেন। তারা ভাবলেন, এ তো মহান আল্লাহর সৃষ্টি। এতে ফারহানের কী দোষ?
ফারহান বড় হতে লাগল। তার চোখেমুখে ছিল এক অদ্ভুত মায়া। কিন্তু সমাজের বিষাক্ত দৃষ্টি তখনও তার গায়ে লাগেনি। তাকে স্কুলে ভর্তি করানো হলো। ফারহান পড়াশোনায় ছিল অত্যন্ত মেধাবী। কিন্তু তার এই সুন্দর পৃথিবীতে প্রথম বিষাদ ঢেলে দিল তারই আপনজন। ফারহানের চাচাতো ভাই কবির।
রক্ত সম্পর্কের ভাই হয়েও কবিরের মনে এক অদ্ভুত কুটিলতা ছিল। একদিন সে বন্ধুদের আড্ডায় ফারহানের শারীরিক অবস্থার কথাটি ফাঁস করে দিল। কবিরের এক বন্ধু আবার তার মায়ের কাছে বলল। আর এভাবেই আগুনের ফুলকির মতো সারা পাড়ায় ছড়িয়ে পড়ল—ফারহান একজন হিজড়া।
পরদিন যখন ফারহান স্কুলে গেল, পৃথিবীটা তার কাছে অচেনা মনে হতে লাগল। যে বন্ধুদের সাথে সে কাল পর্যন্ত খেলেছে, আজ তারা তাকে দেখে টিটকারি দিচ্ছে। কেউ হাসছে, কেউ দূরে সরে যাচ্ছে। এমনকি শিক্ষকরাও যেন এক অদ্ভুত করুণার চোখে তাকে দেখছিলেন, যার পেছনে লুকিয়ে ছিল এক প্রচ্ছন্ন ঘৃণা।
ক্লাসের পেছনে বসে ফারহান শুনতে পেল কেউ একজন বলছে —ওই দেখ, হিজড়া আসছে!
ফারহানের রক্ত চনমন করে উঠত, কান্না আসত বুক ফেটে। কিন্তু সে নিজেকে সামলে নিল। সে তো আর নিজের ইচ্ছায় এমন হয়ে জন্মায়নি। জন্ম ও মৃত্যু তো কেবল আল্লাহর হাতে। সে ভাবল — আল্লাহ যদি আমাকে এভাবেই সৃষ্টি করে থাকেন, তবে আমি কেন লজ্জিত হব?
পরিস্থিতি মেনে নেওয়ার এক অদ্ভুত শক্তি তার মাঝে দানা বাঁধতে লাগল। কিন্তু কবিরের অত্যাচার দিন দিন বাড়তে থাকল।
কবির তাকে দেখলেই অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি করত, নোংরা ভাষায় গালি দিত। তার বন্ধুরা বলত —কিরে ফারহান! হাততালি দিস না কেন? শাড়ি পরে নাচলে তো অনেক টাকা কামাতে পারবি! আমাদের তো আর সেই কপাল নেই।
একদিন অপমানের মাত্রা সহ্যসীমা ছাড়িয়ে গেল। ফারহান স্কুল থেকে ফিরে সরাসরি নিজের রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল। ঘরটা ঘুটঘুটে অন্ধকার। সে অন্ধকারের মাঝে ধপ করে মেঝেতে বসে পড়ল। তার দুচোখ বেয়ে তখন প্লাবনের মতো অশ্রু ঝরছে। সে হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে আল্লাহর কাছে প্রশ্ন করতে লাগল — হে খোদা! আমার অপরাধ কী? আমি কি চেয়েছিলাম এমন হতে? কেন এই সমাজ আমাকে মানুষ হিসেবে গণ্য করে না? কেন কবিরের মতো মানুষরা আমাকে প্রতিনিয়ত রক্তাক্ত করে?
সে ভাবল, এই সমাজে তার কোনো প্রায়োরিটি নেই। হিজড়ারা কি মানুষ নয়? তাদের কি বাঁচার অধিকার নেই? সমাজ কেন তাদের শুধু ঘৃণাই উপহার দেয়?
ভাবতে ভাবতে সে এক চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিল। এই অপমানিত হয়ে বেঁচে থাকার চেয়ে নিরুদ্দেশ হওয়া ভালো। ওইদিন রাতেই, যখন সারা বিশ্ব নিস্তব্ধতায় মগ্ন, ফারহান তার পরিবারের অজান্তে ঘর ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিল।
যাওয়ার আগে সে একটি চিঠি লিখে রেখে গেল তার টেবিলের ওপর। চিঠিতে লেখা ছিল:
মা, আমার লক্ষ্মী মা। তোমার এই হতভাগা সন্তানের জন্য চিন্তা করো না। বাবা, আপনি সমাজের কথায় কান দেবেন না। আমি আপনাদের ছোট করতে চাই না। আর কবির ভাই… তোমাকে শুধু বলি, আল্লাহর সৃষ্টিকে সম্মান দিতে শেখো। আমি তোমার পর ছিলাম না, তোমার রক্তের চাচাতো ভাই ছিলাম,,, পৃথিবীতে সবারই সমানভাবে বেঁচে থাকার অধিকার আছে,,,আজ যদি আমার জায়গায় তুমি হিজরা হইতে তাহলে তোমার কেমন লাগত,,,, তোমার সাথে যদি আমি তোমার করা আচরণ গুলো করতাম?
আমি চললাম কোনো এক অজানা গন্তব্যে। আল্লাহ হাফেজ।
ইতি
তোমাদের সেই অভিশপ্ত ফারহান
ফারহান তার জমানো সামান্য কিছু টাকা নিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে এল। তখন ভোর হতে বাকি। চারদিকে হালকা কুয়াশা আর আবছা আলো। সে নির্জন পথে হাঁটতে হাঁটতে দেবিদ্বার বাস স্টেশনে পৌঁছাল। সেখান থেকে সিলেটের উদ্দেশ্যে রওনা দিল। অচেনা শহর, অচেনা মানুষ। সিলেটে পৌঁছে সে সোজা চলে গেল হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজার শরীফে।
সেখানে তার সাথে দেখা হলো এক হিজড়ার। লোকটির পরনে জমকালো পোশাক। সে ফারহানকে দেখে একপলকেই চিনে ফেলল। সে হাত তালি দিয়ে বলল — কিরে তুই তো আমাদেরই দলের! যাবি আমাদের ডেরায়? আয় না আমাদের সাথে, জীবনটা সুন্দর হবে।
ফারহানের মনে ভয় ও সংশয়। কিন্তু সে কোথায় যাবে? পকেটে টাকা ফুরিয়ে আসছে। সে ভাবল,,,, আমি যদি ওনার সাথে না যাই তাহলে আমি থাকবো কোথায়,,, টাকা পয়সার সাথে তেমন নাই,,,, সে এইসব ভেবে শেষে প্রস্তুতি নিলো সে যাবে ওনার সাথে,,,,,
তখন সে তার সামনে দাড়িয়ে থাকা হিজরাটার দৃষ্টি চেয়ে বলল চলেন আমি যাব আপনার সাথে।
মানুষের দ্বারে দ্বারে লাঞ্ছিত হওয়ার চেয়ে নিজের মানুষদের সাথে থাকাই ভালো।
হিজরাটাও মাথা নেড়ে সম্মতি দিল। সে গেল তাদের বস্তিতে। সেখানে গিয়ে দেখা হলো তাদের ‘সর্দার’ মায়ের সাথে। গুরু মা ফারহানকে দেখে মায়াবী কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন — তোমার নাম কী বাবা?
ফারহান নিচু স্বরে বলল — আমি ফারহান। আমার বাড়ি দেবিদ্বার।
মা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন — ওহ! তাহলে সমাজ তোমাকেও বাঁচতে দিল না? এসো বাবা, তোমার সাথে হয়ে যাওয়া অন্যায় গুলো আমার কাছে বলে ভেতরের কষ্টগুলো মুছে ফেলো।
ফারহান তার জীবনের সব কথা মা’র কাছে খুলে বলল। মা’র চোখ ভিজে উঠল। তিনি বললেন — বাবা, এই সমাজ বড় বিচিত্র। ওরা আমাদের শুধু পণ্য মনে করে, মানুষ মনে করে না। এখন তুমি কী করবে? হাততালি দিয়ে টাকা তুলবে নাকি লেখাপড়া করবে?
জানো বাবা, আমার খুব ইচ্ছে ছিল বড় হওয়ার, কিন্তু সমাজ আমাকে সুযোগ দেয়নি। আমি তোমাকে সুযোগ দেব। আমার পরিচয়ে তুমি পড়বে, তোমার পড়াশোনার সব খরচ আমি দেব।
ফারহানের চোখে নতুন স্বপ্নের আলো জ্বলে উঠল। সে প্রতিজ্ঞা করল, সে পড়বে এবং এই সমাজকে বদলে দেবে।
সিলেটের সেই ঘিঞ্জি বস্তির এক কোণে, যেখানে বৃষ্টির দিনে ছাদ দিয়ে জল পড়ে আর ভ্যাপসা গন্ধে দম বন্ধ হয়ে আসে, সেখান থেকেই শুরু হলো ফারহানের যুদ্ধের দ্বিতীয় অধ্যায়। তার গুরু মা, যাকে সমাজ শুধু ‘হিজড়া সর্দার’ বলে জানে, তিনি ফারহানের হাতে একটি পুরনো ছেঁড়া বই তুলে দিয়ে বলেছিলেন — বাবা, আমি তোকে নিয়ে এমন এক জায়গায় পৌঁছাতে চাই, যেখান থেকে কেউ তোকে হিজড়া বলে গালি দেওয়ার সাহস পাবে না।
ফারহানের পড়াশোনার খরচ জোগাতে গুরু মা অমানুষিক পরিশ্রম শুরু করলেন। প্রতিদিন ভোরে যখন কুয়াশাচ্ছন্ন সিলেটে মানুষ ঘুমে বিভোর, তখন সেই বৃদ্ধা মা মানুষের দুয়ারে দুয়ারে যেতেন। অনেক সময় মানুষ তাকে দেখে মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দিত, অনেকে অকথ্য ভাষায় গালি দিত। ফারহান একদিন রাতে লুকিয়ে দেখল তার মা পা টিপছেন আর ব্যথায় কোঁকাচ্ছেন। তার পা দুটো ফুলে কলার গাছের মতো হয়ে গেছে, সারাদিন হাঁটার ফলে পায়ের চামড়া উঠে রক্ত পড়ছে।
ফারহান দৌড়ে গিয়ে মায়ের পা জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। সে বলল — মা, আমার আর পড়ার দরকার নেই। আমি আপনার এই কষ্ট সইতে পারছি না।
মা ফারহানের চোখের জল মুছে দিয়ে ধরা গলায় বললেন — পাগল ছেলে! আমি তোকে ডাক্তার বানাব। আমাদের জাতের কপালে যে কলঙ্ক লেগে আছে, তা তুই মুছবি। তুই যদি আজ হাল ছেড়ে দিস, তবে এই সমাজ জিতে যাবে ফারহান।
সেই রাতে ফারহান আর ঘুমাতে পারেনি। সে ক্ষুধার জ্বালায় পেট চেপে ধরে সারারাত টেবিল ল্যাম্পের আবছা আলোয় বই পড়েছে।
মেডিকেল কলেজে ভর্তি হওয়াটা ছিল ফারহানের জীবনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। যখন সে প্রথম দিন ক্লাসে ঢুকল, পুরো ক্লাস নিস্তব্ধ হয়ে গেল। তারপর শুরু হলো ফিসফাস, হাসাহাসি। কেউ তার পাশে বসতে চাইল না। ফারহান যখন সামনের বেঞ্চে বসল, পাশের ছেলেটি ঘৃণাভরে উঠে গিয়ে একদম পেছনে বসল। করিডোর দিয়ে যাওয়ার সময় কেউ একজন পাশ থেকে বলে উঠল —
কিরে হিজড়া! স্টেথোস্কোপ দিয়ে কি এখন মানুষের নাড়ি ধরবি নাকি তালির তাল গুনবি?
ফারহান মাথা নিচু করে চলে যেত। তার লকার রুমে কেউ লিখে রাখত— Hijra Doctor: Enter at your own risk।
এনাটমি ল্যাবে যখন সবাই মিলে গ্রুপ স্টাডি করত, ফারহান একা এক কোণে দাঁড়িয়ে লাশের ওপর প্র্যাকটিস করত। কারণ, কোনো স্বাভাবিক মানুষ তার সাথে একই গ্রুপে থাকতে রাজি ছিল না।
কতদিন এমন হয়েছে যে, সারা কলেজে কেউ তার সাথে একটা কথা বলেনি। সে যেন এক জ্যান্ত লাশ, যাকে সবাই দেখতে পায় কিন্তু কেউ স্পর্শ করতে চায় না।
কিন্তু ফারহানের পড়াশোনার বইয়ের দাম অনেক। গুরু মা যা আয় করতেন তার সবটুকু ফারহানের ফি আর বই কিনতে শেষ হয়ে যেত। ফারহান অনেক দিন শুধু জল খেয়ে রাত কাটিয়েছে। একদিন কলেজের ক্যান্টিনে গিয়ে দেখল সবাই বিরিয়ানি খাচ্ছে। ফারহানের পেটে তখন তিনদিন ধরে অন্ন জোটেনি। ক্ষুধার চোটে তার মাথা ঘুরছিল। সে শুধু এক গ্লাস জলের অর্ডার দিয়ে এক কোণে বসে ছিল। তখন এক সহপাঠী ইচ্ছা করে তার গ্লাসে ধাক্কা দিয়ে বলল — আহা! হিজড়াদের কি আবার খিদে পায় নাকি? তোরা তো মানুষের অভিশাপ খেয়েই বেঁচে থাকিস।
ফারহান সেদিন ক্যান্টিন থেকে বেরিয়ে কলেজের পেছনের বাগানে গিয়ে ডুকরে কেঁদেছিল। সে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলেছিল — হে খোদা! তুমি যদি আমাকে মানুষ হিসেবে সৃষ্টি করেই থাকো, তবে কেন এই জ্বালা দিলে? কেন এই অপমান? কিন্তু পরক্ষণেই তার মনে পড়ত তার গুরু মায়ের সেই রক্তাক্ত পায়ের কথা। সে আবার চোখে জল মুছে লাইব্রেরিতে গিয়ে ঢুকে পড়ত।
অপমান যখন পাহাড় সমান হয়, তখন জেদটাও হতে হয় আকাশের মতো বিশাল। ফারহান ঠিক করল, সে কথায় নয়, কাজে উত্তর দেবে। মেডিকেল কলেজের ফাইনাল প্রফেশনাল পরীক্ষায় যখন রেজাল্ট বের হলো, দেখা গেল পুরো কলেজের মধ্যে ‘গোল্ড মেডেল’ পেয়েছে সেই অবহেলিত ফারহান।
যেই শিক্ষকরা তাকে এড়িয়ে চলতেন, তারা আজ তার দিকে বিস্ময়ে তাকিয়ে রইলেন। ফারহান যেদিন মঞ্চে মেডেল নিতে উঠল, তার পরনে ছিল একটি অতি সাধারণ ইস্ত্রি করা এপ্রন, যা তার গুরু মা নিজের গায়ের কাপড় বিক্রি করে কিনে দিয়েছিলেন। মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়িয়ে ফারহান শুধু একটি কথাই বলেছিল— আমি আজ ডাক্তার হয়েছি কারণ একজন ‘হিজড়া মা’ নিজের সম্মান বিসর্জন দিয়ে আমাকে মানুষ করেছেন। আমি আপনাদের কাছে কোনো করুণা চাই না, শুধু অনুরোধ করছি— আমাদেরও একটু মানুষ হিসেবে বাঁচতে দিন।
পুরো অডিটোরিয়াম তখন নিস্তব্ধ। অনেকের চোখেই তখন জল। ফারহান সেখান থেকে সোজা চলে গেল তার বস্তির সেই ছোট ঘরে। গুরু মা-র পায়ের কাছে গোল্ড মেডেলটা রেখে সে বলল —মা, আমি পেরেছি! মা তাকে জড়িয়ে ধরে যে কান্নাটা কাঁদলেন, সেই কান্নার শব্দে যেন হাজার বছরের জমে থাকা হিজড়া সমাজের হাহাকার মিশে ছিল।
দীর্ঘ পরিশ্রম আর ত্যাগের পর ফারহান একজন দক্ষ সার্জন ডক্টর হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করল।
সে ঢাকার একটি বড় পাবলিক হাসপাতালে যোগ দিল। একদিন তার চেম্বারের বাইরে অনেক ভিড়। হঠাৎ একজন রোগী ভেতরে প্রবেশ করল। ফারহান লোকটির দিকে তাকিয়ে চমকে উঠল। এই লোকটি আর কেউ নয়, সেই দেবিদ্বারের একজন যে তাকে ছোটবেলায় সবচেয়ে বেশি টিটকারি মারত। লোকটিও ফারহানকে চিনতে পারল এবং বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল।
লোকটি ঘৃণাভরে বলল — তুই! তুই এখানে ডাক্তার? আমি তোর কাছে অপারেশন করব না!
সে রুম থেকে বের হয়ে গেল। কিন্তু হাসপাতালের অন্য স্টাফরা তাকে জানাল যে, ডক্টর ফারহানের মতো দক্ষ সার্জন এই হাসপাতালে আর দ্বিতীয় কেউ নেই। অবশেষে প্রাণের দায়ে এবং অনন্যোপায় হয়ে সেই লোকটি ফারহানের কাছেই নিজের জটিল অপারেশন করাতে বাধ্য হলো। ফারহান নিজের পেশাদারিত্ব আর মেধা দিয়ে সফলভাবে অপারেশন সম্পন্ন করল। এই খবর দ্রুত দেবিদ্বারের গ্রামে পৌঁছে গেল।ফারহান ঠিক করল সে তার জন্মস্থানে যাবে।
বহু বছর পর ফারহান তার জন্মস্থান দেবিদ্বারে ফিরল। সাথে তার সেই ‘হিজড়া মা’। একটি দামি গাড়ি এসে যখন তাদের বাড়ির সামনে থামল, গ্রামের মানুষ ভিড় জমাল। ফারহান গাড়ি থেকে নামতেই তার মা-বাবা তাকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়লেন। কবিরও সেখানে অপরাধীর মতো দাঁড়িয়ে ছিল।
গ্রামের মানুষ যখন তাকে দেখতে ভিড় জমাল, ফারহান তখন গম্ভীর কণ্ঠে ভাষণ দিতে শুরু করল। তার কণ্ঠ ছিল বজ্রের মতো কঠিন। সে বলল:
“আজ আপনারা আমাকে সম্মান দিচ্ছেন কারণ আমি ডাক্তার। কিন্তু যেদিন আমি শুধু ফারহান ছিলাম, সেদিন কেন আমাকে পশুর মতো তাড়িয়ে দিয়েছিলেন? আমরা হিজড়া বলে কি আমরা মানুষ নই? আমাদের রক্ত কি লাল নয়? আমাদের কি স্বাধীনভাবে চলার অধিকার নেই? আমার দোষ কী ছিল? আমি তো আল্লাহর সৃষ্টি। কবির ভাই, আজ আপনি কোথায়? আমাকে দেখে আজ আপনার ঘৃণা হয় না?
সে তার গুরু মাকে সবার সামনে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বলল — আপনারা জানেন না, আমার এই সাফল্যের পেছনে কার অবদান? আমার এই মা, যাকে আপনারা সমাজচ্যুত করেছেন, তিনি মানুষের লাথি-ঝাঁটা খেয়ে আমাকে মানুষ করেছেন।
মনে রাখবেন, লিঙ্গ মানুষের পরিচয় নয়, পরিচয় তার মনুষ্যত্বে। আজ যদি আমার জায়গায় আপনার সন্তান জন্ম নিত, তবে কি তাকেও এভাবে সমাজচ্যুত করতেন? আজ থেকে দেবিদ্বারের মাটিতে কোনো হিজড়া অবহেলিত হবে না। আমরা দয়া চাই না, আমরা আমাদের অধিকার চাই। আমরা বাঁচতে চাই— মাথা উঁচু করে, মানুষ হিসেবে।
ফারহান আরও বলল — মনে রাখবেন, জন্ম মানুষের হাতে নয়, কিন্তু কর্ম মানুষের হাতে। আমাদের ঘৃণা করা মানে আল্লাহর সৃষ্টিকে ঘৃণা করা। আমরাও এই দেশের নাগরিক, আমরাও মেধা দিয়ে দেশ গড়তে চাই। দয়া করে আমাদের সমাজ থেকে আলাদা করে রাখবেন না।
ঠিক সেই মুহূর্তে ফারহানের ‘দ্বিতীয় মা’ ভিড়ের সামনে এসে দাঁড়ালেন। তার কণ্ঠ ছিল একদিকে কান্নায় ভেজা, অন্যদিকে বজ্রের মতো কঠিন। তিনি সবার দিকে তাকিয়ে বললেন —
ওরে নরাধমের দল! আজ তোরা এই ছেলেকে মালা দিচ্ছিস কেন? ও কি ডাক্তার হওয়ার আগে মানুষ ছিল না? তোরা তো ওকে ঘর থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিলি। তোরা কি জানিস, এই ছেলেকে বড় করতে গিয়ে আমাকে কতবার মানুষের লাথি খেতে হয়েছে? কতজন আমার মুখে থুতু দিয়ে বলেছিল— হিজড়ারা আবার মানুষ নাকি?
শোনেন দেবিদ্বারের মানুষ, আল্লাহ যখন আকাশ থেকে বৃষ্টি দেন, তখন কি তিনি শুধু পুরুষ বা নারীর ওপর দেন? হিজড়াদের ওপর কি দেন না? সূর্যের আলো কি আমাদের গায়ে লাগে না? তবে কেন তোরা আমাদের অস্পৃশ্য মনে করিস? আজ ফারহান যদি ডাক্তার না হয়ে আপনাদের মতো চোর বা খুনি হতো, তবে কি আপনারা শান্তি পেতেন?
আমার ফারহান আজ প্রমাণ করেছে যে, লিঙ্গ দিয়ে মেধা মাপা যায় না। আমাদের রক্তও লাল, আপনাদের রক্তও লাল। আমরা যদি আজ হাততালি ছেড়ে দিয়ে কলম ধরি, তবে এই সমাজ বদলে যাবে। আর খবরদার! যদি কোনো হিজড়া সন্তান জন্ম নেয়, তবে তাকে ডাস্টবিনে ফেলবেন না। তাকে স্কুলে পাঠান। মনে রাখবেন, হিজড়ারা আল্লাহর সৃষ্টি, তারা কারো অভিশাপ নয়। আপনারা যদি আমাদের সম্মান দিতে না পারেন, তবে নিজেদের মানুষ হিসেবে দাবি করার অধিকার আপনাদের নেই।
তখন ফারহানের জন্মদাত্রী মা তখন ভিড়ের সামনে এসে দাঁড়ালেন। তার গলার স্বর কান্নায় বুজে আসছিল, কিন্তু তার চোখে ছিল এক অদ্ভুত তেজ। তিনি উপস্থিত সবার উদ্দেশ্যে বললেন —
ওরে নিষ্ঠুর সমাজ! আজ তোরা আমার ছেলেকে ডাক্তার বলে সম্মান দিচ্ছিস? কই, কুড়ি বছর আগে তো কেউ আমার বুক খালি করা কান্নার শব্দ শুনিসনি! আমার কলিজার টুকরোকে যখন তোরা হিজড়া বলে গ্রামছাড়া করেছিলি, তখন তোদের বিবেকে একবারও বাঁধেনি? তোরা কি জানিস, প্রতিটা রাতে আমি দরজার দিকে তাকিয়ে থাকতাম, যদি আমার ছেলে ফিরে আসে!
একটা মায়ের বুকের কষ্ট তোরা বুঝবি না। আজ তোরা তার পায়ের ধুলো নিচ্ছিস, কিন্তু সেদিন তো তোরাই ওর মুখে থুতু দিয়েছিলে। আমার ছেলে তো আল্লাহর সৃষ্টি। তোদের যদি এতই ঘৃণা, তবে আমার আল্লাহকে বলিস না কেন এমন সৃষ্টি না করতে? মনে রাখিস, আমার ছেলের গায়ে ‘হিজড়া’ লেখা নেই, ওর শরীরে বইছে আমারই রক্ত। রক্ত কি কখনো লিঙ্গ ভেদে আলাদা হয়? আজ তোদের লজ্জা হওয়া উচিত যে, তোরা যাকে পশুর মতো তাড়িয়েছিলি, আজ তার হাতেই তোদের জীবন বাঁচাতে হচ্ছে!
ফারহানের জন্মদাত্রী মা গুরু মায়ের হাত দুটো জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠলেন। কান্নায় ভেঙে পড়া গলায় তিনি বললেন —
বোন, আজ আপনার সামনে দাঁড়াতে আমার বড় লজ্জা হচ্ছে। আমি ওকে শুধু গর্ভে ধরেছি, কিন্তু আপনি ওকে জীবন দিয়েছেন। সমাজ যখন ওকে ছুড়ে ফেলে দিয়েছিল, আপনি তখন নিজের আঁচল দিয়ে ওকে আগলে রেখেছেন। আজ লোকে আমাকে ডাক্তারের মা বললেও আমার হূদয় জানে—ওর আসল মা আপনিই। আমার নাড়িকাটা ধনকে আজ আপনি হীরা বানিয়ে আমার কোলে ফিরিয়ে দিলেন। এই ঋণ শোধ করার সাধ্য আমার নেই বোন, শুধু দোয়া করি—আল্লাহ যেন আপনার মতো বড় হূদয় সবাইকে দান করেন।
ফারহান কবিরের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। কবির তখন লজ্জায় মাথা নিচু করে কাঁপছে। ফারহান তার কাঁধে হাত রেখে শান্ত স্বরে বলল — কবির ভাই, আপনার মনে আছে? আপনি বলেছিলেন হাততালি দেওয়াই আমার ভাগ্য। আজ দেখুন, এই হাতগুলোই মানুষের জীবন বাঁচায়। আপনি আমাকে রক্ত সম্পর্ক থেকে মুছে দিয়েছিলেন, কিন্তু আমার ধমনীতেও আপনার মতোই লাল রক্ত। আমি আপনাকে ঘৃণা করি না, বরং করুণা করি। কারণ আমি ‘হিজড়া’ হয়েও আজ একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ হতে পেরেছি, কিন্তু আপনি সুস্থ ‘পুরুষ’ হয়েও আজ পর্যন্ত মানুষ হতে পারলেন না।
সেদিন দেবিদ্বারের মানুষের চোখের পর্দা সরে গেল। তারা বুঝতে পারল, লিঙ্গ পরিচয় কোনো মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি হতে পারে না। ফারহান প্রমাণ করে দিল, ইচ্ছাশক্তি আর সুযোগ থাকলে একটি অবহেলিত প্রাণও হয়ে উঠতে পারে সমাজের আলো। ফারহান তার মা-বাবাকে প্রণাম করল এবং তার সেই ছোটবেলার ঘরটিতে গুরু মা-কে নিয়ে প্রবেশ করল। গ্রামবাসী সেদিন মাথা নিচু করে তাদের বিদায় দিল, কিন্তু হৃদয়ে গেঁথে নিল এক বড় শিক্ষা।
লেখিকার মতামত : ফারহান আজ ডাক্তার হয়ে নিজেকে প্রমাণ করেছে। কিন্তু আমাদের চারপাশে হাজারো ফারহান আজও কবিরদের হাসাহাসির শিকার হয়ে অকালে ঝরে পড়ছে। আমরা কি পারি না এই সমাজটাকে তাদের জন্য একটু নিরাপদ করতে? আজকের এই গল্প যেন কেবল হাততালিতে শেষ না হয়, বরং আমাদের ভাবনার জগতটাকে বদলে দেয়।





















