ডিগ্রির ওপারে লজ্জা

উম্মে হাবিবা

শহরের এক কোণে নাম না জানা এক জরাজীর্ণ বস্তি। সেখানে সূর্য ওঠে অভাবের খবর নিয়ে, আর রাত নামে ক্ষুধার জ্বালা নিয়ে।
এই বস্তিরই এক চিলতে ভাঙা ঘরে বাস রাব্বিদের। রাব্বির বাবা কাশেম মিয়া একজন ভিক্ষুক, আর মা মরিয়ম বেগম মানুষের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করেন। অভাব তাদের নিত্যসঙ্গী হলেও, তাদের বুকের ভেতর ছিল এক আকাশ সমান স্বপ্ন। সেই স্বপ্নের নাম ‘রাব্বি’।

মরিয়ম বেগম যখন অন্যের বাড়িতে হাড়ভাঙা খাটুনি শেষে ফিরে আসতেন, তখন তার চোখেমুখে ক্লান্তির চেয়ে বেশি থাকত ছেলের ভবিষ্যতের উজ্জ্বল আভা।
তারা বিশ্বাস করতেন, রাব্বি যদি একবার লেখাপড়া শিখে বড় মানুষ হতে পারে, তবে তাদের এই কষ্টের জীবন থেকে মুক্তি মিলবে।
কাশেম মিয়াকে আর মানুষের কাছে হাত পাততে হবে না, মরিয়মকে আর কারো লাঞ্ছনা সয়ে অন্যের এঁটো বাসন মাজতে হবে না।

​বস্তির প্রতিবেশীরা যখন দেখত মরিয়ম আর কাশেম তিল তিল করে জমানো টাকায় রাব্বিকে স্কুলে পাঠাচ্ছে, তখন তারা আড়ালে হাসাহাসি করত। কেউ কেউ সোজাসুজিই বলে দিত যে —আরে বস্তির ছেলে আবার বড় অফিসার হবে! যত সব ঢং। যার নুন আনতে পান্তা ফুরায়, তার আবার বড় সপ্ন!”

এই টিটকারিগুলো তীরের মতো রাব্বির বাবা-মায়ের বুকে বিঁধত, কিন্তু তারা দমে যাননি। তারা জানতেন, এই অন্ধকারের দেয়াল একদিন রাব্বিই ভাঙবে।

​কিন্তু স্কুলের দিনগুলো রাব্বির জন্য সুখকর ছিল না। বড় বড় ঘরের ছেলেদের ভিড়ে রাব্বি ছিল গরিব আর বস্তিতে থাকা ছেলে। ছেঁড়া জামা আর বস্তির গন্ধ মাখা শরীর নিয়ে সে যখন ক্লাসের এক কোণে বসে থাকত, সহপাঠীরা তাকে নিয়ে উপহাস করত। কেউ তার সাথে কথা বলত না, এমনকি তার পাশে বসতেও ঘৃণা বোধ করত।

একদিন টিফিনের সময় এক সহপাঠী বলে উঠল, “এই বস্তির ছেলে, আমাদের সাথে খেলবি না, তোর বাবা তো ভিক্ষা করে!” সেইদিন অপমানে রাব্বির চোখে জল এসেছিল, কিন্তু সেই জল সে কাউকে বুঝতে দেয়নি।
তার ভেতরে এক অদ্ভুত জেদ আর অভিমান দানা বাঁধতে শুরু করেছিল।

​একদিন রাব্বিদের ঘরে এক দানা চালও ছিল না। সকাল থেকে কারো কোনো কামাই হয়নি। রাব্বির বাবা-মা সারাদিন উপোস ছিলেন, কিন্তু চিন্তা ছিল একমাত্র ছেলেকে নিয়ে। স্কুল থেকে ফিরে রাব্বি কী খাবে? ক্ষুধার্ত ছেলের মুখ দেখার ভয়ে কাশেম মিয়া পাগলপ্রায় হয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরতে লাগলেন।
রাস্তার ধারের একটি দোকানে গিয়ে তিনি অনেক অনুনয় বিনয় করে ৫ টাকা মূল্যের একটি পাউরুটি চাইলেন। কিন্তু দোকানদারের মন গলল না। উল্টো ধমক দিয়ে তাকে তাড়িয়ে দিল।

অসহায় বাবা কোনো উপায় না পেয়ে জীবনের প্রথমবার চুরির পথ বেছে নিলেন। কিন্তু ভাগ্যের কী নিষ্ঠুর পরিহাস! তিনি দোকানদারের হাতে ধরা পড়ে গেলেন। এলাকার মানুষ আর দোকানদার মিলে তাকে নির্দয়ভাবে মারধর করল। রক্তাক্ত শরীরে তিনি যখন ঘরে ফিরলেন, তখন তার হাতে ছেলের জন্য কোনো খাবার ছিল না, ছিল কেবল অপমানের দগদগে ক্ষত।

​অন্যদিকে, মরিয়মও যে যে বাসায় কাজ করতেন, সেখানে খাবারের জন্য হাত পেতেছিলেন। কেউ তাকে দয়া করেনি। শেষ পর্যন্ত তিনিও বাধ্য হয়ে এক বাসা থেকে কিছু খাবার লুকিয়ে নিয়ে আসেন ছেলের জন্য।
এভাবেই চরম অনিশ্চয়তা আর কষ্টের মধ্য দিয়ে তাদের দিন কাটছিল।

​এরপর অনেক কষ্টে, নিজেদের জীবনকে বিলিয়ে দিয়ে তারা রাব্বিকে ঢাকা পাঠালেন উচ্চশিক্ষার জন্য। বস্তিতে থেকে তারা হাড়ভাঙা খাটুনি করে প্রতি মাসে রাব্বির পড়াশোনার খরচ পাঠাতেন। তারা নিজেরা অর্ধেক বেলা না খেয়ে থাকতেন যাতে ছেলের বই কেনায় কোনো টান না পড়ে। দীর্ঘ প্রতিক্ষার পর একদিন সুসংবাদ এল— রাব্বি বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে অফিসার হয়েছে।

বস্তির অন্ধকার ঘরে সেদিন খুশির বন্যা বয়ে গেল। কাশেম আর মরিয়ম ভাবলেন, এবার তাদের দুঃখের দিন শেষ।
কিন্তু তারা জানতেন না, তাদের সাফল্যের সূর্যই তাদের জীবনের চরম অন্ধকার হয়ে দেখা দেবে।

​বিসিএস অফিসার হওয়ার পর রাব্বি ধীরে ধীরে তার অতীত ভুলতে শুরু করল। নতুন পরিবেশ, নতুন মর্যাদা তার মস্তিষ্কে অহংকারের বিষ ঢুকিয়ে দিল।
সে তার মা-বাবার সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দিল। ঢাকাতেই সে সুন্দরী ও সচ্ছল পরিবারের মেয়ে তামান্নাকে বিয়ে করল।
বিয়ের আগে সে তামান্নাকে মিথ্যা বলেছিল যে, সে একজন এতিম, তার আপন বলতে কেউ নেই। তার ভয় ছিল, যদি তামান্না জানতে পারে সে এক ভিক্ষুক আর ঝিয়ের ছেলে, তবে তার এই সন্মান ধুলোয় মিশে যাবে।

​ওদিকে গ্রাম থেকে আসা বৃদ্ধ মা-বাবা ছেলের কোনো খবর না পেয়ে ব্যাকুল হয়ে পড়লেন। তাদের রাব্বি বেঁচে আছে কি না, তা-ও তারা জানেন না। চোখের জলে তাদের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে এল।
শেষমেশ কোনো উপায় না পেয়ে তারা ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হলেন। বড় এই শহরে তারা কোথায় যাবেন, কাকে জিজ্ঞেস করবেন?
চার দিন ধরে তারা পথে পথে ঘুরেছেন। পেটে দানা-পানি নেই, কেবল রাস্তার কল থেকে পানি খেয়ে তারা বেঁচে আছেন। পাগলের মতো তারা শহরের অলিগলি আর বড় বড় মার্কেটের সামনে দাঁড়িয়ে রাব্বিকে খুঁজতে থাকেন।এই দিন গুলোতে তারা অনাহার থাকেন তাদের বেঁচে থাকার জন্য পানিই তাদের সম্বল ছিল।

​সেইদিন ছিল রাব্বির জন্য এক সাধারণ দিন। সে তার স্ত্রী তামান্নাকে নিয়ে শপিং করতে বেরিয়েছিল। বড় একটি মার্কেটের সামনে যখন তারা দাঁড়ালেন, তখনই মরিয়ম বেগমের চোখ পড়ল তার নাড়ীছেঁড়া ধন রাব্বির ওপর। তিনি চিৎকার করে তার স্বামীকে বললেন — “ওগো, ওই দেখো আমাদের রাব্বি!”
কাশেম মিয়া বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। মরিয়ম চোখের পানি মুছতে মুছতে বললেন — “হুম গো, আমি তো মা! যাকে দশ মাস পেটে ধরেছি, সেই ছেলেকে চিনব না? এটাই আমাদের ছেলে!”

​মরিয়ম বেগম আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না। শত অভাব আর অনাহারে ক্লান্ত শরীর নিয়ে তিনি দৌড়ে গিয়ে রাব্বিকে জড়িয়ে ধরলেন আর বললেন — “আমার বাপরে! কতদিন দেখি না তোরে!”
তার কান্নাভেজা গলার আওয়াজ পুরো এলাকা কাঁপিয়ে দিচ্ছিল।
কিন্তু রাব্বি? সে যেন পাথরের মূর্তি হয়ে গেল। তার স্ত্রীর সামনে এই ময়লা কাপড় পরা, জীর্ণ চেহারার বৃদ্ধা তাকে জড়িয়ে ধরছে— এটা তার কাছে ছিল চরম অসম্মানের।

রাব্বি সজোরে তার গর্ভধারিণী মাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিল। কাশেম মিয়া দৌড়ে এসে মরিয়মকে টেনে তুললেন।
তিনি আর্তনাদ করে বললেন — “এই রে রাব্বি বাপ, তুই তোর মাকে ফেলে দিলি রে বাপ? তুই তোর মাকে চিনতে পারলি না?”

​পাশে দাঁড়িয়ে থাকা তামান্না এই দৃশ্য দেখে স্তব্ধ হয়ে গেল। তার কানে বাজছিল রাব্বির বলা সেই মিথ্যা কথা— “আমি এতিম”।
সে বিস্ময়ভরা চোখে রাব্বির দিকে তাকিয়ে বলল — “রাব্বি, তুমি না বলেছিলে তোমার বাবা-মা নেই? তুমি এতিম? তাহলে এই বৃদ্ধ দম্পতি কী বলছে?”

​রাব্বি তখন রাগে কাঁপছিল। সে চিৎকার করে বলল — “তোমার কি মনে হয় তামান্না, এই বস্তির জঘন্য লোকগুলো আমার বাবা-মা হবে? এরা সব পাগল, ভিখারি!”

​সে তার হতবাগা-হতভাগী মা-বাবার দিকে আঙুল তুলে বলল — শোন তোরা দুজন, তোরা যদি আমার জন্মদাতা হইসও, আমি কোনোদিন স্বীকার করব না যে তোরা আমার মা-বাবা।
তোদের জন্য আমি জীবনে অনেক কথা শুনেছি। স্কুলে সবাই আমাকে বস্তির ছেলে বলে ঘৃণা করত। আমার দোষ কী জানিস?
রাব্বি তার মার দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল আমি তোর পেটে জন্মেছি! এটা আমার দোষ,, ছি! ধিক্কা জানাই তোরে, আমার কেন তোর পেটে জন্ম হলো
আর শোন আমার পাশে যেই মেয়ে দেখতেছোস সে আমার বিয়ে করা বউ তামান্না।

তোরা আমাকে দেখতে আসছিস আসছিস, এখন বিদায় হ। বস্তি তে যা নাহ ঢাকায় থাক এটা তোদের ইচ্ছা, আর ভুলেও যদি কাউকে বলিস আমি তোদের ছেলে, তবে তোদের কপালে দুঃখ আছে। দূর হ আমার সামনে থেকে!”

রাব্বির সেই বিষাক্ত কথাগুলো শোনার পর আকাশ-বাতাস যেন স্তব্ধ হয়ে গেল। মরিয়ম বেগম পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। যে হাত দুটো একটু আগে পরম মমতায় রাব্বিকে জড়িয়ে ধরেছিল, সেই হাত দুটো এখন অপমানে কাঁপছে। এরপর মরিয়ম বেগম আর্তনাদ করে ডুকরে কেঁদে উঠলেন। তার সেই কান্না কোনো সাধারণ কান্না ছিল না, এ ছিল এক গর্ভধারিণী মায়ের কলিজা ছেঁড়া হাহাকার।
​মরিয়ম বেগম বুক চাপড়ে চিৎকার করে বলতে লাগলেন:
​”ওরে রাব্বি! তুই আমাকে ধিক্কার দিলি বাপ? তুই বললি আমার পেটে জন্মানো তোর জীবনের সবচেয়ে বড় কলিজার দাগ? ওরে খোদা, তুমি আজ আসমান কেন ভেঙে ফেললে না! আমার পেটকে তুই ঘৃণা করলি বাপ? এই সেই পেট, যে পেটে তোরে দশটা মাস তিল তিল করে রক্ত দিয়ে বড় করেছি। এই জঘন্য বস্তির পেটে যখন তুই ছিলি, তখন অভাবের চোটে আমি তিনদিন না খেয়ে পানি খেয়ে দিন কাটিয়েছি, যাতে তোর শরীরে কোনো কমতি না হয়। আমার নাড়িছেঁড়া ধন তুই, আজ আমার নাড়িটাকেই তুই অস্বীকার করলি?”
​মরিয়ম বেগম তার ফাটা ও খসখসে হাত দুটো রাব্বির দিকে বাড়িয়ে দিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বললেন —
​”দেখ রে বাপ, আমার এই হাতের তালুগুলোর দিকে একবার চেয়ে দেখ! মানুষের বাসায় এঁটো বাসন মাজতে মাজতে, বাথরুম পরিষ্কার করতে করতে হাতের চামড়া উঠে গেছে। নখগুলো পচে গেছে ক্ষার আর সাবানে। কেন করেছি রে বাপ?

যাতে তুই পরিষ্কার জামা পরে স্কুলে যেতে পারিস। তোরে যখন স্কুলে লোকে ‘বস্তির ছেলে’ বলে গালি দিত, তুই এসে আমার কোলে মুখ লুকিয়ে কাঁদতি। তখন তো আমার এই বস্তির মা-ই তোর কাছে জান্নাত ছিল। আজ তুই বড় অফিসার হয়েছিস বলে তোর মা জঘন্য হয়ে গেল?

​তুই আমাকে ঢাকার থেকে তাড়িয়ে দিচ্ছিস? দূর করে দিচ্ছিস?
ওরে শোন, আমি তো তোর কাছে অফিসার রাব্বিকে খুঁজতে আসি নাই। আমি আসছি আমার সেই ছোট রাব্বির খোঁজে, যে কিনা রাতে একটু দুধের জন্য কান্না করত। তোর বাবা যখন চুরির অপবাদে মার খাচ্ছিল, তখনও তার মুখ দিয়ে রক্ত চুইয়ে পড়ছিল, আর তিনি বলছিলেন— রাব্বি যেন না জানে, রাব্বি কষ্ট পাবে।
আমরা তোরে মানুষ করতে গিয়ে নিজেদের জানোয়ারের মতো খাটিয়েছি রে বাপ, আজ তুই আমাদের জানোয়ারের মতো দূর দূর করে তাড়িয়ে দিচ্ছিস?

​এরপর মরিয়ম বেগম আকাশের দিকে দুই হাত তুলে আর্জি জানিয়ে বললেন —
​”হে আল্লাহ! তুমি সাক্ষী থেকো। আমার বুকের দুধের কসম খেয়ে বলছি, আমি কোনোদিন তোর কাছে এই রাজপ্রাসাদ চাইনি। আমি শুধু চেয়েছিলাম আমার ছেলেটা যেন মানুষের মতো মানুষ হয়। তুই তো সাহেব হয়েছিস রে বাপ, কিন্তু তুই তো মানুষ হতে পারলি না! তুই বললি আমাদের কপালে দুঃখ আছে যদি আমরা পরিচয় দেই?
ওরে পাগল ছেলে আমার , মা-বাবাকে যে সন্তান অস্বীকার করে, তার চেয়ে বড় দুঃখ আর দুনিয়াতে কিছু নেই। যা বাপ, তুই তোর এই সাজানো সংসার নিয়ে সুখে থাক।
আমরা আবার সেই বস্তিতেই ফিরে যাব।

কিন্তু মনে রাখিস, যেদিন তোর নিজের সন্তান তোকে এভাবে ধাক্কা দিয়ে বের করে দেবে, সেদিন এই অভাগী মায়ের আর্তনাদ তোর কানে বাজবে!

তখন কাশেম মিয়া জলমল চোখে মরিয়ম কে উদ্দেশ্য করে বলল— আহ! তুই চুপ কর। এতো কথা বলতেছোস কা। চুপ কর হতভাগী।

তামান্না এতক্ষণ নীরব থাকলেও এবার সে গর্জে উঠল। সে ধীর পায়ে রাব্বির কাছে এগিয়ে এল এবং তার চোখে চোখ রেখে বলল — রাব্বি, তার মানে এরা আসলেই তোমার মা-বাবা!
তুমি আমাকে মিথ্যে বলেছ কেন? ওরা বস্তিতে থাকে, এটা কি তাদের অন্যায়?
আরে রাব্বি, তুমিও তো ওই বস্তিতেই বড় হয়েছ। তোমার শিরায় শিরায় তো এই মা-বাবার রক্তই বইছে তাই না, তুমি অস্বীকার করতে পারবে রক্তকে।”

​তামান্না রাব্বির চোখে ঘৃণা ছুঁড়ে দিয়ে বলল —
শোন রাব্বি, আমি তোমাকে ভালোবেসে বিয়ে করেছি। একজন আদর্শ মানুষের সাথে জীবন কাটাতে চেয়েছিলাম, একজন শিক্ষিত পশুর সাথে নয়। আজ আমি বুঝতে পারছি, লেখাপড়া করলেই মানুষ শিক্ষিত হয় না। তুমি বিসিএস অফিসার হয়েছ ঠিকই, কিন্তু মানুষ হতে পারোনি।

যে সন্তান তার বাবা-মায়ের পরিচয় দিতে লজ্জিত, সে কখনো কারো আপন হতে পারে না। আমি ডিভোর্সি হতে চাই না ঠিকই, কিন্তু তোমার মতো অকৃতজ্ঞ মানুষের সাথে এক ছাদের নিচে থাকার চেয়ে একা থাকা ভালো।
তুমি ওদের স্বীকার না করলেও, আমি আজ থেকে ওদের আমার শ্বশুর-শাশুড়ি বলে স্বীকার করছি। তুমি না গেলেও আমি ওদের সাথে ওই বস্তিতেই যাব।”

​তামান্না মরিয়ম বেগমের হাত ধরে বলল —”মা, আমাকে ক্ষমা করবেন। আপনাদের ছেলে শিক্ষিত হতে পেরেছে, কিন্তু মানুষ হতে পারেনি। চলুন, আমি আপনাদের সাথে যাব।”

​রাব্বি রোবট হয়ে দাঁড়িয়ে রইল জনবহুল সেই রাস্তার মাঝে। তার চারপাশের মানুষগুলো তার দিকে ঘৃণার দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। সে আজ মস্ত বড় অফিসার, কিন্তু তার আত্মসম্মান আজ আস্তাকুঁড়ে পড়ে আছে। তামান্না তার মা-বাবাকে নিয়ে চলে গেল।
রাব্বি বুঝতে পারল, তার যে আভিজাত্যের অহংকার ছিল, তা আসলে বালির বাঁধের মতো ধসে পড়েছে। বিসিএস-এর ক্যাডার হওয়া হয়তো সহজ, কিন্তু একজন সত্যিকারের মানুষ হওয়া কত কঠিন, তা সে আজ তিলে তিলে অনুভব করতে লাগল।

পাঠ্যবইয়ের পাতা আর সার্টিফিকেট দ্বারা মানুষকে বড় চাকরি দিতে পারে, কিন্তু বড় মন দিতে পারে না। বিসিএস অফিসার হয়েও রাব্বি যা শিখতে পারেনি, তার স্ত্রী তামান্না তা নিজের বিবেক দিয়ে অনুভব করেছে— “শিক্ষা কেবল মাথায় নয়, হৃদয়ে থাকতে হয়।”

সন্তানকে একবেলা পেট ভরে খাওয়ানোর জন্য যে বাবা চুরির অপবাদ সয়ে মার খায়, আর যে মা মানুষের এঁটো বাসন মেজে নিজের নখ পচিয়ে ফেলে, তাদের পরিচয় দিতে লজ্জিত হওয়া পৃথিবীর সবচেয়ে বড় পাপ।

আভিজাত্য বা পদমর্যাদার অহংকার মানুষকে অন্ধ করে দেয়। রাব্বি তার শেকড়কে অস্বীকার করতে চেয়েছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে একাই হয়ে গেল। তার সাজানো মিথ্যা আভিজাত্য বালির প্রাসাদের মতো ভেঙে পড়ল।

গাছ যেমন তার শেকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হলে শুকিয়ে মরে যায়, তেমনি যে মানুষ তার অতীত এবং মা-বাবাকে অস্বীকার করে, সে সামাজিকভাবে বেঁচে থাকলেও মানসিকভাবে মৃত।

রাব্বি ভেবেছিল বস্তির পরিচয় দিলে তার সম্মান তার বউ চলে যাবে, কিন্তু তার অমানবিক আচরণই তাকে সবার চোখে ঘৃণিত করে তুলল। পক্ষান্তরে, তামান্না সেই বস্তিবাসীদের আপন করে নিয়ে নিজের সম্মানকে আকাশের উচ্চতায় নিয়ে গেল।

লেখিকার মতামত : “পৃথিবীর কোনো ডিগ্রিই একজন সন্তানকে তার মায়ের নাড়ীছেঁড়া কষ্টের ঋণ থেকে মুক্তি দিতে পারে না। পদ-মর্যাদা ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু মা-বাবার আশীর্বাদ চিরস্থায়ী। আমরা যেন রাব্বির মতো তথাকথিত শিক্ষিত পশু না হয়ে, তামান্নার মতো বিবেকবান মানুষ হতে শিখি।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *