অন্ধকার রাত, সোনালী সকাল
উম্মে হাবিবা
গ্রামের নাম শান্তিপুর হলেও রহমতের ঘরে শান্তি নেই অনেকদিন। রহমত সাহেব আর ফাতেমা বিবির একমাত্র ছেলে আকাশ। একসময় মেধাবী ছাত্র হিসেবে গ্রামে নাম থাকলেও এখন সে এক আতঙ্ক।
রহমতের উঠোনে পা রাখলেই এখন শোনা যায় কান্নাকাটি আর ভাঙচুরের শব্দ। আকাশ এখন মরণনেশা মাদকে আসক্ত। মাদকের নেশা তাকে শুধু অমানুষ করেনি, করেছে চরম হিতাহিত জ্ঞানহীন। কথায় বলে না যে — “সঙ্গ দোষে লোহা ভাসে”, তেমনি সে তার কিছু বখাটে বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে এই পথে যায়।
সেদিন বিকেলবেলা। আকাশের স্ত্রী সুমি রান্নাঘরে চাল ধুয়ে দিচ্ছিল। অভাবের সংসার, দুবেলা ঠিকমতো হাড়ি চড়ে না। হঠাৎ আকাশ হন্তদন্ত হয়ে ঘরে ঢুকল। চোখে রক্তবর্ণ আভা, হাত কাঁপছে। সে সুমির সামনে গিয়ে কর্কশ গলায় বলল — টাকা বের কর। আজ জুয়ার আসরে হারানো টাকা উসুল করতে হবে।
সুমি কাঁপা গলায় বলল — টাকা কোথায় পাব? ঘরে চাল কেনার পয়সাটুকুও নেই।
মুহূর্তের মধ্যে আকাশের হাত উঠল সুমির ওপর। সজোরে এক চড় বসিয়ে দিল সে। সুমি চড় সামলাতে না পেরে মাটিতে লুটিয়ে পড়লে আকাশ তার চুল মুঠি করে ধরে বলল — তোর বাপের বাড়ি যা, গিয়ে বলবি কালকের মধ্যে বিশ হাজার টাকা না দিলে তোর কপালে দুঃখ আছে। যৌতুকের বাকি টাকাটা এবার নিয়ে আসবি।
সুমি কাঁদছে আর বলছে — বাবা গরিব মানুষ, উনি কোথা থেকে দেবেন?
কিন্তু আকাশের কানে তখন শয়তান সওয়ার হয়েছে। সে সুমিকে ধাক্কা দিয়ে ঘর থেকে বের করে দিল।
রহমত সাহেব আর তার স্ত্রী ফাতেমা বিবি বাধা দিতে এলে আকাশ নিজের জন্মদাতা বাবাকে গালিগালাজ শুরু করল। ফাতেমা বিবি যখন ছেলের হাত ধরতে গেলেন তখন আকাশ তাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিল। বৃদ্ধ বাবা-মার চোখে তখন শ্রাবণের ধারা। নিজের হাতে বড় করা সন্তান আজ চোর, জুয়াড়ি আর মাদকাসক্ত। নেশার টাকার জন্য আকাশ ঘরের কাঁসার থালাবাসন পর্যন্ত চুরি করে বিক্রি করে দিয়েছে।
গ্রামের মোড়ে মোড়ে আকাশের মতো আরও কিছু বখাটে ছেলে জুটেছে। তারা জনসম্মুখে, এমনকি স্কুলের সামনে দাঁড়িয়ে সিগারেট ফুঁকে ধোঁয়া ছাড়ে। পথচারী মেয়েদের দিকে ছুড়ে দেয় কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য। গ্রামের স্কুলের দশম শ্রেণীর ছাত্রী মিতু যখন রাস্তা দিয়ে যায়, এই বখাটে দল তাকে উত্ত্যক্ত করে।
কিন্তু অন্ধকারের শেষ তো আলোকবর্তিকায়। শান্তিপুর গ্রামে ফিরেছে রৌজান। রৌজান এই গ্রামেরই ছেলে, এখন সে আইনের ছাত্র এবং সমাজকর্মী। গ্রামের এই ভয়াবহ দশা দেখে তার রক্ত টগবগ করে ফুটছে। সে দেখল গ্রামে নারী নির্যাতন, মাদক আর বাল্যবিবাহ গ্রামটাকে গিলে খাচ্ছে।ঠিক তখনই সে জানতে পারে মিতুর কথা।
মিতুর বাবা একজন কৃষক এবং গ্রামের বখাটে ছেলেদের ভয়ে তার মেয়েকে বিয়ে দিয়ে দিতে চান। পাশাপাশি মিতুর বাবা মনে করেন — ‘নারী কুড়িতেই বুড়ি’,
তাই মেয়ে বড় হতেই তাকে ভালো পাত্র দেখে বিয়ে দিয়ে দিতে চান। এদিকে মিতুর স্বপ্ন সে বড় হয়ে ডাক্তার হবে, কিন্তু গ্রামবাসীর চাপে বাবা তার পড়াশোনা বন্ধ করে বাল্যবিবাহের আয়োজন করেন।
বিয়ের ঠিক আগের দিনই রৌজান গ্রামে আসে এবং তার কাজিনকে নিয়ে ঘুরতে বেরিয়ে পরে আর তখনই তার কাজিনের কাছ থেকে মিতুর এই করুণ পরিস্থিতির কথা জানতে পারে। আইনের ছাত্র ও সমাজকর্মী রৌজান বুঝতে পারে মিতুর উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ অন্ধকারের মুখে পড়তে যাচ্ছে।
সে তৎক্ষণাৎ প্রশাসনের সহযোগিতা নিয়ে এবং মিতুর বাবাকে আইনের ভয়াবহতা ও মিতুর মেধার কথা বুঝিয়ে সেই রাতই বিয়েটি ভেঙে দেয়। রৌজানের এই সাহসী পদক্ষেপে মিতু আবার তার হারানো স্বপ্ন ছোঁয়ার সুযোগ পায়।
পরেরদিন সকালেই রৌজান প্রথমেই রহমত চাচার বাড়িতে গেল। সুমির বিধ্বস্ত চেহারা দেখে সে প্রতিজ্ঞা করল যে — এর বিচার সে করবেই।
সে গ্রামের যুবসমাজকে একত্রিত করল। গড়ে তুলল— “জাগরণ সংঘ”। রৌজান গ্রামের সবাইকে বোঝাল — মাদক শুধু একজন মানুষকে মারে না, একটা পরিবারকে ধ্বংস করে। আর যে হাত নারীর ওপর ওঠে, সে হাত পশুর হাত।
একদিন সন্ধ্যায় আকাশ জুয়ার আসর বসিয়েছে গ্রামের পুরনো বটতলায়। সাথে চলছে নেশার আড্ডা। সেখানে হঠাৎ হাজির হলো রৌজান আর তার দলের ছেলেরা। আকাশ গর্জে উঠে বলল —তোরা এখানে কেন? ভাগ এখান থেকে।
রৌজান শান্ত গলায় বলল — আকাশ ভাই, অনেক হয়েছে। মা-বাবার গায়ে হাত তোলা, স্ত্রীকে নির্যাতন করা আর চুরির পথ এবার ছাড়তে হবে। নয়তো আইনের হাত অনেক লম্বা।
আকাশ হাসল। কিন্তু সেই হাসি বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। রৌজান জানত শুধু কথায় কাজ হবে না তাই সে আগে থেকেই পুলিশকে খবর দিয়ে রেখেছিল। পুলিশ এসে যখন আকাশ আর তার সাঙ্গোপাঙ্গদের হাতকড়া পরাল আর তখন আকাশের চোখে ভয় দেখা দিল। কিন্তু রৌজান শুধু পুলিশ ডাকেনি সে পাশাপাশি আকাশের চিকিৎসার জন্য রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টারের সাথেও কথা বলে রেখেছে।
আকাশকে যখন চিকিৎসার জন্য পাঠানো হচ্ছিল, তখন বৃদ্ধ রহমত সাহেব রৌজানের হাত জড়িয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন। রৌজান শান্তকণ্ঠে বলল — চাচা, সমাজটা আমাদের সবার। আজ আকাশকে বাঁচাতে পেরেছি কারণ আমরা ভয় ভেঙে এক হয়েছি। এই ঐক্যই হবে আমাদের ভবিষ্যৎ রক্ষাব্যবস্থা।
আর আমি চায় আকাশ ভাইয়া সুস্থ হয়ে পরিবারের কাছে আপনাদের আগের আকাশ হয়ে ফিরে আসুক।
পরদিন গ্রামে এক বড় সভা বসল। রৌজান জনসম্মুখে ধুমপান ও ইভটিজিং এর বিরুদ্ধে কড়া হুঁশিয়ারি দিল। সে ঘোষণা করল — এই গ্রামে যদি আর কোনো বাল্যবিবাহের চেষ্টা করা হয়, তবে শুধু বর পক্ষ নয়, কাজী এবং অভিভাবকদেরও জেল খাটতে হবে।
এইদিন ওই আকাশের বউ সুমিকে তার বাপের বাড়ি থেকে সসম্মানে ফিরিয়ে আনা হলো। রহমত সাহেব আর ফাতেমা বিবিকে আশ্বস্ত করে রৌজান বলল — আকাশ সুস্থ হয়ে ফিরবে। ও ভুল পথে গিয়েছিল, ওকে সংশোধন করার সুযোগ দিতে হবে। কিন্তু তার আগে আমাদের এই সমাজটাকে পরিষ্কার করতে হবে।
রৌজানের এই আহ্বানে গ্রামের মানুষের চোখে নতুন এক আশার সঞ্চার হলো। রৌজান জানত, শুধু আকাশকে সংশোধন করলেই গ্রামটি বিষমুক্ত হবে না। সে গ্রামের প্রতিটি মোড়ে মোড়ে যুবকদের নিয়ে একটি প্রহরী বাহিনী গঠন করল যাতে কোনো গোপন আস্তানায় জুয়া বা মাদকের কারবার আর মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে। সে ঘোষণা করল — যে হাত স্ত্রীকে মারে, যে মুখ নেশায় ডোবে, সেই হাত আর মুখকে আমরা একঘরে করব, যতক্ষণ না তারা আলোর পথে ফেরে।
সুমির চোখে তখন জল, তবে তা দুঃখের নয়, অপমানের বিষণ্ণতা মুছে যাওয়ার অদম্য স্বস্তির। সে দিনই গ্রামের বটতলায় এক বিশাল শপথ অনুষ্ঠান হলো।
মাসের পর মাস কেটে গেল। প্রশাসনের কড়া নজরদারি আর জাগরণ সংঘের উদ্যম চেষ্টায় শান্তিপুর গ্রামে আমূল পরিবর্তন এল। মোড়ে মোড়ে আড্ডা আর ধোঁয়ার কুণ্ডলী এখন আর দেখা যায় না। মেয়েরা নির্ভয়ে স্কুলে যায়। নারী নির্যাতন প্রতিরোধে পাড়ায় পাড়ায় কমিটি গঠন করা হয়েছে।
ছয় মাস পর আকাশ ফিরে এল। সে এখন সম্পূর্ণ অন্য মানুষ। তার চোখে এখন অপরাধবোধ আর অনুশোচনা। সে ফিরে এসেই বাবা-মার পায়ে ধরে ক্ষমা চাইল। সুমির হাত ধরে বলল — আমাকে মাফ করে দাও। নেশা আর জুয়া আমার বিবেক খেয়ে ফেলেছিল।
গ্রামের সেই অন্ধকার রাত কেটে গিয়ে এখন সোনালী সকাল উঁকি দিচ্ছে। শান্তিপুর এখন সত্যিই এক শান্তির জনপদ। মাদক, জুয়া আর নির্যাতনের বিরুদ্ধে একতাবদ্ধ হয়ে দাঁড়ালে যে কোনো সমাজকে বদলে দেওয়া সম্ভব। রৌজান আর তার দল তা প্রমাণ করে দিল। মিতুর বাল্যবিবাহ রোধ করে তাকে আবার স্কুলে পাঠানো হয়েছে। গ্রামের প্রতিটি দেয়ালে এখন স্লোগান— “মাদককে না বলুন, নারীকে সম্মান করুন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হোন”।
মেধাবী আকাশ আজ ধ্বংসের মুখে শুধুমাত্র ভুল বন্ধু ও মাদকের কারণে। মাদক একজন মানুষের হিতাহিত জ্ঞান কেড়ে নিয়ে তাকে পশুর চেয়েও অধম করে তোলে। তাই সুন্দর জীবনের জন্য মাদককে ‘না’ বলা জরুরি।
স্ত্রীর গায়ে হাত তোলা বা যৌতুকের জন্য নির্যাতন করা পুরুষত্ব নয়, বরং চরম কাপুরুষতা। যে হাত নারীর ওপর ওঠে, সেই হাতকে আইনের আওতায় আনা এবং সামাজিকভাবে বয়কট করা প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব।
রৌজানের মতো তরুণরা যদি এগিয়ে আসে এবং সমাজ যদি অন্যায়ের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়, তবে যেকোনো অপশক্তিকে হারানো সম্ভব। অন্যায়ের বিরুদ্ধে নীরব থাকা মানে অপরাধীকে সমর্থন দেওয়া।
মেয়েদের বোঝা মনে না করে তাদের সুশিক্ষিত করে গড়ে তোলাই বুদ্ধিমানের কাজ। বাল্যবিবাহ একটি মেয়ের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেয়।
অপরাধীকে ঘৃণা করলেও অপরাধকে ঘৃণা করাই পরম ধর্ম। সুস্থ চিকিৎসা ও সঠিক দিকনির্দেশনা পেলে একজন অপরাধীও যে আলোর পথে ফিরে আসতে পারে, আকাশ তার বড় প্রমাণ।
লেখিকার মতামত :
"একটি সুস্থ সমাজ গড়তে হলে যেমন আইনের কঠোরতা প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন মানুষের বিবেক এবং সামাজিক ঐক্য। অন্যায় দেখে মুখ আটকে না থেকে সাহসের সাথে প্রতিবাদ করলেই শান্তিপুর গ্রাম এর মতো আমাদের প্রতিটি গ্রাম ও শহর হবে নিরাপদ এবং শান্তিময়। আসুন, আমরা প্রত্যেকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে গর্জে উঠি। গড়ে তুলি মাদক ও সহিংসতা মুক্ত এক নতুন বাংলাদেশ।"





















