ফারজানা আক্তার : বিশ্ব মানচিত্রে দক্ষিণ এশিয়ার হিমালয় কন্যা নামক খ্যাত সৌন্দর্যের অপার ভূমি নেপাল। কিন্তু অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, কূটনৈতিক সহ নানা ক্ষেত্রে উত্থান-পতনের সামষ্টিক প্রতিফলনে রাজনৈতিক পালাবদলে বহু সমালোচনা ও তোপের মুখে পড়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে নেপাল সবসময়ই একটি কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ দেশ।
তবে অভ্যন্তরীণ কোন্দল আর প্রবীণ নেতাদের ক্ষমতার পালাবদল দেশটিকে বারবার পিছিয়ে দিয়েছে। নেপালের রাজনীতি দীর্ঘকাল ধরেই রাজতন্ত্রের বিলোপ, মাওবাদী বিদ্রোহ আর সংবিধান প্রণয়নের জটিল আবর্তে ঘুরতে থাকে। পূর্ববর্তী সময়ে এই সকল সমস্যার মূল নেতৃত্বে হোতাও ছিলেন প্রবীণ রাজনীতিবিদরা। বেকারত্ব, দুর্নীতি এবং প্রবীণ রাজনীতিবিদদের অদূরদর্শিতার বিরুদ্ধে নেপালের তরুণ সমাজ রাস্তায় নেমে আসে। কিন্তু অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে মানুষ একদিন না একদিন রুখে দাঁড়াতে শিখে যায় যেমনটা করেছিল নেপালের ছাত্র জনতা। দীর্ঘদিনের সেই প্রথাগত দেয়াল ভেঙে এবং নেপালের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সূচনা করে।
দেশটির কনিষ্ঠতম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন বলেন্দ্র শাহ। তিনি পেশায় একজন স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার এবং নেশায় জনপ্রিয় র্যাপার। র্যাপার থেকে রাজনীতিবিদ হিসেবে পরিচিত বালেন্দ্র শাহ মাত্র ৩৫ বছর বয়সে এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন, যা কেবল নেপালে নয় বরং সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ২০২৫ সালের তরুণ প্রজন্মের Gen Z আন্দোলনের পর কেপি শর্মা অলির পদত্যাগের পর, ২৭ মার্চ ২০২৬ তারিখে বলেন্দ্র শাহ নেপালের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন।
তার দল রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি (RSP) ২০২৬ সালের সাধারণ নির্বাচনে এক বিশাল জয়লাভ করে। ২৭৫ আসনের পার্লামেন্টে তার দল ১৮২টি আসন পেয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো বর্তমানে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বা জনমিতিক সুবিধার স্বর্ণযুগে আছে। অথচ দেশগুলোর নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে তরুণদের প্রতিনিধিত্ব নগণ্য। নেপাল প্রদর্শনের পাশাপাশি প্রমাণ করেছে যে মেধা ও সঠিক জনসমর্থন থাকলে তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্বও রাষ্ট্রের ভার নিতে সক্ষম। তাছাড়া প্রথাগত কিংবা বংশগতির ধারাবাহিকতায় রাজনীতির হাল ধরার প্রবণতার প্রভাবের বিকল্পে দাঁড়িয়েছে নেপালের সরকারব্যবস্থা। রাজনীতির মাঠে বয়সের তুলনায় যে অভিজ্ঞতা,প্রজ্ঞা এবং বিচক্ষণতার জয়গান সম্ভব তার উৎকৃষ্ট প্রতিফলন বলেন্দ্র শাহ। তবে স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে রক্ষা করা কঠিন।
একদিকে বয়সের তুলনায় অভিজ্ঞতার ঝুলিতে ভারসাম্য ধরে রাখা জটিল অন্যদিকে ভুল পদক্ষেপ ভবিষ্যতে ক্ষমতা হারানোর সম্ভাবনা থাকতে পারে। বিগত বছরগুলোতে নেপালের নানা ভঙ্গুর অবস্থা ও অস্থিতিশীল ক্ষেত্রগুলোকে নিয়ন্ত্রণে রাখাই সবচেয়ে বড় চ্যালেন্জ । বিশেষ করে অর্থনৈতিক চাকা সচল রাখা, মুদ্রাস্ফীতি হ্রাস করা, দুর্নীতি দমনে জিরো টলারেন্স নীতি প্রয়োগ, দেশের জনগণের মৌলিক চাহিদা ঠিক রাখা, সামরিক অবস্থান দৃঢ় করার মতো বিষয়ে ভিত্তি মজবুত করা আবশ্যক। তাছাড়া চীন ও ভারতের মধ্যবর্তী অবস্থানের দিকে লক্ষ্য রেখে নিজেদের কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থিতিশীল রাখা মতো বুদ্ধিবৃত্তিক মনোভাব থাকা অতীব জুরুরি দীর্ঘদিন ধরে কাঠমান্ডুর রাজনীতি দিল্লী অথবা বেইজিংয়ের ইশারায় চলে আসছিল এমন একটি ধারণা প্রচলিত ছিল। কিন্তু বালেন শাহর নেপাল ফার্স্ট বা নেপাল-কেন্দ্রিক নীতি অনুসরণ করছে । ফলে নতুন প্রজন্মের এই নেতৃত্ব কোনো নির্দিষ্ট বলয়ের প্রতি অন্ধ আনুগত্য না দেখিয়ে জাতীয় স্বার্থ ও অর্থনৈতিক লাভ-ক্ষতিকে প্রাধান্য দিচ্ছে।
এটি দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের অধিপত্য এবং চীনের ক্রমবর্ধমান বিনিয়োগের দ্বিমুখী চাপের মুখে একটি ভারসাম্যপূর্ণ এবং মর্যাদাশীল পররাষ্ট্রনীতি গড়ে তোলার ইঙ্গিত দেয় নতুন প্রজন্মের তরুণদের রাজনীতির সবচেয়ে বড় আশার আলো হলো যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত ও দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার মনোভাব থাকে। অন্যদিকে, সময়ের ব্যাপক পার্থক্য ও যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলা প্রবীণ রাজনীতিবিদ সদস্যদের কাছে অনেকটাই জটিল সমীকরণের মতো। প্রয়োগিক শিক্ষা ও গবেষণা, আধুনিক যন্ত্রপাতি, স্মার্ট কর্মদক্ষ তরুণ সমাজ বিনির্মাণ, নিত্যনতুন প্রযুক্তির ব্যবহারের মতো বিষয়াদিতে গুরুত্ব আরোপের বিকল্প নেই । যেহেতু রাজনৈতিক দীর্ঘসূত্রতায় প্রথাগত ক্ষমতার বলয় ভেদ করতে পেরেছেন সেহেতু অদূর ভবিষ্যতে নেপালের জনগণকে ঐক্যবদ্ধ রেখে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করতে পারবেন।
নেপালের এই তারুণ্যের জয়জয়কার প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্যও একটি শক্তিশালী সংকেত। দক্ষিণ এশিয়ার সাধারণ মানুষ এখন বুঝতে শুরু করেছে যে, বয়স কেবলই সংখ্যা মাত্র এবং মেধা-মনন,উচ্চতর চিন্তন দক্ষতা এবং স্বচ্ছ জবাবদিহিতায় তরুণ প্রজন্মের মাধ্যমেও রাজনৈতিক বিপ্লবের জয়গান সম্ভব। এই ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্যও এটি একটি শিক্ষণীয় বার্তাবাহক। বাংলাদেশের রাজনীতিতে তরুণদের হাত ধরেই স্বৈরাচারী সরকার ব্যবস্থার পতন হয়েছিল। আগামীর ভবিষ্যত বিনির্মাণে প্রত্যক্ষভাবে তরুণদের অংশগ্রহণের বিকল্প নেই।
দীর্ঘদিনের প্রথাগত রাজনৈতিক মেরুকরণ ভেঙে নেপালের এই নতুন অধ্যায় যদি সফল হয়, তবে এটি কেবল নেপালের সীমানায় সীমাবদ্ধ থাকবে না, দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে তা একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে এবং এর প্রভাবে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক মানচিত্র বদলে যেতে পারে। তরুণ প্রজন্মের কাছে বলেন্দ্র শাহ্ এর দুঃসাহসিক নেতৃত্ব ভবিষ্যতে মহাকাব্য রচনা করবে। পরিবর্তন রাতারাতি না হলেও রাজনৈতিক সংগ্রামে সার্বিক ব্যবস্থাপনা করার আপ্রাণ চেষ্টায় তিনি শুধু দক্ষিণ এশিয়ার নয় বরং সারাবিশ্বের কাছেই সমাদৃত হবে। তার বিচক্ষণ কলাকৌশল আগামীর রাজনীতিতে নতুন মোড় ঘুরাতে সক্ষম হবে এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঠিক পথ দেখাবে তা নিঃসন্দেহে আশা করা যায়।
লেখিকা : শিক্ষার্থী,ইডেন মহিলা কলেজ,ঢাকা।





















