মিথিলা জসিম তন্নি : বরিশালের মুলাদী উপজেলা নদীর বুকে ভেসে থাকা এক জনপদ, যেখানে জীবনের প্রতিটি ছন্দ নদীর স্রোতের সঙ্গে বাঁধা। আর সেই উপজেলার সফিপুর ইউনিয়ন আজ এক নীরব আতঙ্কের নাম। কারণ এর বুক চিরে বয়ে চলা জয়ন্তী নদী প্রতিনিয়ত কেড়ে নিচ্ছে মানুষের ঘর,স্কুল-কলেজ, জমি আর জীবনের নিরাপত্তা। নদীর ঢেউ যেন এখানে আর শুধু জলের ঢেউ নয় এ যেন হাহাকারের তরঙ্গ, যা প্রতিদিন একটু একটু করে গিলে খাচ্ছে মানুষের স্বপ্ন।একসময় যে ঘর ছিল হাসি-আনন্দে ভরা, আজ তা নদীর গর্ভে বিলীন। একটি পরিবারের বহু বছরের সঞ্চয়, পরিশ্রম, ভালোবাসা সবকিছু এক মুহূর্তেই হারিয়ে যাচ্ছে। জয়ন্তী নদীর ভাঙন এখানে কোনো হঠাৎ ঘটনা নয়; এটি একটি চলমান ট্র্যাজেডি। প্রতিদিন সকালে মানুষ ঘুম থেকে উঠে দেখে নদী আরও একটু কাছে চলে এসেছে। রাত নামলে ভয় আরও বেড়ে যায় এই বুঝি সবকিছু ভেঙে পড়বে। শিশুরা খেলা ভুলে গেছে, বয়স্কদের চোখে ঘুম নেই এ যেন এক অদৃশ্য যুদ্ধ, যেখানে প্রতিপক্ষ প্রকৃতি নিজেই।
নদীভাঙনের ফলে জনজীবনে ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে ব্রজমোহন স্কুলের কয়েকটি ভবন বিলীন হয়ে গেছে এবং হাজী সৈয়দ বদরুল হোসেন কলেজও বিলীন হওয়ার পথে।স্কুল,কলেজ বিলীন হওয়ার কারণে মানুষ শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হয়ে আছে। যার কারণে এলাকার মানুষগুলো যতই দিন যাচ্ছে ততই অমানবিক ও হিংস্র হয়ে যাচ্ছে।
শিক্ষা একটি জাতির মেরুদণ্ড। পুরো একটি এলাকাবাসীই যদি শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হয়ে থাকে তাহলে সেই এলাকাবাসীর উন্নতি অসম্ভব। শিক্ষা থেকে দূরে থাকার কারণে তারা মারামারি,হানাহানি, ভেদাভেদ এছাড়া কিছুই বুঝে না। এই ভয়াবহ বাস্তবতার মাঝেও আশার আলো আছে তা হলো সচেতনতা। নদীভাঙন রোধে প্রথম যে শক্তি প্রয়োজন, তা হলো মানুষের সচেতন মন।সফিপুরের মানুষ যদি নদীর আচরণ বুঝতে শেখে, ঝুঁকিপূর্ণ জায়গা চিহ্নিত করতে পারে, এবং সময়মতো নিরাপদ স্থানে সরে যেতে পারে তবে ক্ষয়ক্ষতি অনেকাংশে কমানো সম্ভব। স্কুল, মসজিদ, স্থানীয় সংগঠন সব জায়গা থেকেই এই সচেতনতা ছড়িয়ে দিতে হবে।
নদীর তীরে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ বন্ধ করা, বৃক্ষরোপণ বাড়ানো, এবং নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ রক্ষা করা এসব বিষয়েও মানুষকে সচেতন করতে হবে। কারণ প্রকৃতিকে রক্ষা করলেই প্রকৃতি মানুষকে রক্ষা করে। বর্ষার আগে জয়ন্তী নদীর ভাঙন রোধে এখনই প্রয়োজন কার্যকর ও টেকসই পদক্ষেপ। নদীর তীরে জিও ব্যাগ স্থাপন, শক্তিশালী বাঁধ নির্মাণ করা অত্যন্ত জরুরি।শুধু সরকারি উদ্যোগই নয়, স্থানীয় জনগণকেও এই কাজে সম্পৃক্ত করতে হবে। কারণ এই নদী যেমন তাদের জীবনের অংশ, তেমনি এর রক্ষার দায়িত্বও তাদেরই। বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করলে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব। প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার এবং পরিবেশবান্ধব পদ্ধতি প্রয়োগই হতে পারে একমাত্র পথ।যদি জয়ন্তী নদীর ভাঙন রোধ করা যায়, তবে সফিপুর ইউনিয়নের চিত্র একেবারে বদলে যেতে পারে।প্রথমত,শিক্ষার আলো পেলে মানুষ সামাজিক, ধর্মীয়, রাজনৈতিক,অর্থনৈতিকভাবে সাবলম্বী হতে পারবে। মানুষের জীবনে ফিরে আসবে স্থিতিশীলতা। ঘর হারানোর ভয় না থাকলে মানুষ স্বপ্ন দেখতে পারবে, পরিকল্পনা করতে পারবে।দ্বিতীয়ত, কৃষিক্ষেত্রে বিপ্লব ঘটবে। ফসলি জমি রক্ষা পেলে উৎপাদন বাড়বে, কৃষকরা স্বাবলম্বী হবে, এবং স্থানীয় অর্থনীতি শক্তিশালী হবে।
তৃতীয়ত, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে উন্নয়ন ঘটবে। স্থায়ী অবকাঠামো গড়ে উঠলে স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল সবকিছুই উন্নত হবে।চতুর্থত, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন হবে। রাস্তা-ঘাট স্থায়ী হলে ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়বে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।সবশেষে, মানুষের মনে ফিরে আসবে শান্তি। ভয় আর অনিশ্চয়তার বদলে আসবে আত্মবিশ্বাস আর একটি সুন্দর, নিরাপদ ভবিষ্যত।জয়ন্তী নদী একসময় ছিল জীবনের উৎস, আজ তা যেন দুঃখের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু মানুষ যদি চায়, সচেতন হয়, এবং একসঙ্গে কাজ করে তবে এই নদী আবারও আশীর্বাদে পরিণত হতে পারে। সফিপুর ইউনিয়নের প্রতিটি মানুষ আজ অপেক্ষায় একটি ভাঙনহীন আগামী দিনের, যেখানে নদী থাকবে, কিন্তু ভয় থাকবে না; থাকবে শুধু জীবন, স্বপ্ন আর সম্ভাবনার গল্প।
লেখিকা : শিক্ষার্থী,ইডেন মহিলা কলেজ,ঢাকা।





















