লাবণী আক্তার :একটি স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে প্রত্যেকেরই মত প্রকাশের স্বাধীনতা আছে। বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯ নং অনুচ্ছেদে চিন্তা, বিবেক ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছে। এটি একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক অধিকার। কিন্তু বাস্তব জীবনের চিত্র ভিন্ন। চাওয়া থাকলেই যে আমরা স্বাধীনভাবে আমাদের মত প্রকাশ করতে পারি, তা নয়। সমাজ, রাষ্ট্র, রাজনৈতিক পরিবেশ এবং নানা অদৃশ্য চাপের কারণে অনেক সময় মানুষ নিজের মতামত প্রকাশ করতে গিয়ে সংকোচ বোধ করে। ফলে সংবিধানে স্বীকৃত এই অধিকার অনেক ক্ষেত্রেই কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়।মত প্রকাশের ক্ষেত্রে শুধু বর্তমান পরিস্থিতিকে প্রাধান্য দিলেই হবে না, আমাদের সুদূর ভবিষ্যতের কথাও চিন্তা করতে হবে। একটি মতামত তখনই মূল্যবান হয়ে ওঠে, যখন তা যুক্তিসঙ্গত, বিশ্লেষণধর্মী এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ইতিবাচক দিকনির্দেশনা প্রদান করে। একই সঙ্গে এটাও মনে রাখতে হবে, আমাদের মত প্রকাশ যেন কারো ব্যক্তিগত ক্ষতির কারণ না হয়। কারণ মত প্রকাশের স্বাধীনতা মানে এই নয় যে, আমরা অন্যকে আঘাত বা অপমান করার অধিকার পেয়েছি। বরং এটি এমন একটি অধিকার, যা দায়িত্বশীলতার সঙ্গে ব্যবহার করা উচিত।
ইতিহাস আমাদের শেখায়, মত প্রকাশকে কখনো স্থায়ীভাবে দমন করে রাখা যায় না। সত্যের সন্ধানে প্রশ্ন একদিন না একদিন উঠবেই। মানুষ তার চিন্তা-ভাবনা প্রকাশ করতে চায় । এটাই মানবিক স্বভাব। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, স্বাধীন দেশের নাগরিক হয়েও আমরা অনেক ক্ষেত্রে এই স্বাভাবিক অধিকার প্রয়োগ করতে গিয়ে বাধার সম্মুখীন হই। বিশেষ করে সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় সাধারণ মানুষ অনেক সময় নিজেকে নিরাপদ মনে করে না। আমাদের সমাজে পুরুষদের তুলনায় নারীরা মত প্রকাশের ক্ষেত্রে আরও পিছিয়ে রয়েছে।
পারিবারিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক নানা বাধা তাদের কণ্ঠকে সীমাবদ্ধ করে রাখে। অথচ একটি মতামতের মূল্য নির্ধারণে বক্তা নারী না পুরুষ এটি বিবেচ্য হওয়া উচিত নয়। বরং তার বক্তব্যটি যৌক্তিক, এবং সমাজের জন্য কতটা কল্যাণকর , সেটিই হওয়া উচিত প্রধান বিবেচ্য বিষয়। নারীর কণ্ঠকে উপেক্ষা করা মানে সমাজের অর্ধেক শক্তিকে অবমূল্যায়ন করা।অন্যদিকে, কেউ যদি স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করে এবং তার বিপরীতে কেউ আক্রমণাত্মক মনোভাব দেখায়, তবে অবশ্যই তার বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক সমাজে ভিন্ন মতকে শ্রদ্ধা করা শেখা জরুরি। মতের অমিল থাকতেই পারে, কিন্তু তা যেন সহিংসতা বা হুমকির রূপ না নেয়, সেদিকে সবার দৃষ্টি রাখা প্রয়োজন।সরকারের সার্বিক সহযোগিতা ছাড়া নাগরিকের পক্ষে তার মত প্রকাশের অধিকার সুষ্ঠুভাবে প্রয়োগ করা সম্ভব নয়।
রাজনৈতিক ক্ষমতার চাপে যাতে সত্য চাপা না পড়ে যায়, সেদিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। কেবল আইন প্রণয়ন করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না,সেই আইন বাস্তবায়ন এবং তার সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সংবাদমাধ্যম একটি দেশের গণতন্ত্রের অন্যতম স্তম্ভ। তাদের মত প্রকাশের স্বাধীনতা থাকা সত্ত্বেও অনেক সময় তারা সঠিক সংবাদ প্রকাশে বাধার সম্মুখীন হয়। এর ফলে প্রকৃত সত্য জনগণের কাছে পৌঁছায় না, বরং আংশিক বা বিকৃত তথ্য ছড়িয়ে পড়ে। একটি সচেতন সমাজ গঠনের জন্য স্বাধীন ও নিরপেক্ষ সংবাদমাধ্যম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই তাদের স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হলে বিদ্যমান সাইবার নিরাপত্তা আইনসহ অন্যান্য প্রাসঙ্গিক আইনগুলোর সংশোধন প্রয়োজন।
অনেক সময় অস্পষ্ট শব্দে তৈরি আইন সহজেই অপব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি করে। ফলে যৌক্তিক সমালোচনাও অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়। এটি গণতান্ত্রিক চর্চার জন্য ক্ষতিকর। তাই আইন এমনভাবে প্রণয়ন করতে হবে, যাতে তা মত প্রকাশকে সুরক্ষিত রাখে, দমন করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার না হয়। তবে শুধুমাত্র সরকারের ওপর দায় চাপিয়ে দিলে চলবে না। নাগরিকদেরও দায়িত্ব রয়েছে। আমাদের উচিত যুক্তিনির্ভর, শালীন এবং গঠনমূলক সমালোচনার চর্চা করা। মত প্রকাশের স্বাধীনতা তখনই অর্থবহ হয়ে ওঠে, যখন তা সমাজের উন্নয়নে অবদান রাখে এবং অন্যদের মতামতকেও সম্মান জানায়। সবশেষে বলা যায়, মত প্রকাশের স্বাধীনতা কেবল সংবিধানের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না এটি বাস্তব জীবনে কার্যকর করতে হবে। একটি সমাজ তখনই সত্যিকার অর্থে উন্নত হয়, যখন তার নাগরিকরা নির্ভয়ে, যুক্তির ভিত্তিতে এবং দায়িত্বশীলতার সঙ্গে নিজেদের মতামত প্রকাশ করতে পারে। এই দায়িত্ব শুধু রাষ্ট্রের নয়, বরং আমাদের সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই আমরা একটি মুক্ত ও সচেতন সমাজ গড়ে তুলতে পারি। সুষ্ঠু মত প্রকাশের স্বাধীনতা দেশকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মর্যাদা এনে দিবে। এটি দেশের উন্নয়নের চাবিকাঠি হিসেবে কাজ করবে ।
লেখিকা : শিক্ষার্থী , ইডেন মহিলা কলেজ (ইংরেজি বিভাগ)।





















