শেখ সুলতানা মীম : বর্তমান বিশ্বের আধুনিক সভ্যতা মূলত তেলের ওপর দাঁড়িয়ে। আর এই তেলের একটি বিশাল অংশ আমাদের কাছে পৌঁছায় পারস্য উপসাগরের ছোট্ট এক প্রবেশদ্বার দিয়ে, যার নাম হরমুজ প্রণালী। কিন্তু বর্তমান সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্র কে কেন্দ্র করে হঠাৎ করেই এই হরমুজ প্রণালী বন্ধের প্রেক্ষাপট রচিত হয়েছে। এত দিনের ছায়া যুদ্ধ রূপ নিয়েছে সামরিক যুদ্ধে। একদিকে ইরান তার বিপরীতে ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্র। ইরান-ইসরায়েলের পাল্টাপাল্টি হামলার মুখে তেহরান হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিয়েছে। যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বাজারে। হরমুজ প্রণালীর ওপারেই তেল সমৃদ্ধ আরব উপদ্বীপের মুখোমুখি অবস্থান। হরমুজ প্রণালীর একপাশে ইরান এবং অন্য পাশে ওমান ও আরব আমিরাতের অবস্থান। তাই ইরানকে ঘিরে যেকোনো সংঘাতের মাঝে এই প্রণালী কৌশলগত দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে ওঠে।
সরু এই জলপথ বৈশ্বিক তেল ও গ্যাস বাণিজ্যের প্রধান মাধ্যম বলা যেতে পারে। কারণ বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের ২০ শতাংশ এই পথে পরিবাহিত হয়। তাছাড়াও বিপুল পরিমাণ তরলীকৃত গ্যাসও পরিবহন করা হয় হরমুজ প্রণালী দিয়ে। ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে যে চলমান উত্তেজনা তার মূল বিষয়ই হচ্ছে এই তেল। গোটা বিশ্ব এখন শঙ্কায় আছে যদি সংঘাত তীব্র হয় তাহলে তেলের বাজারে অস্বাভাবিক অস্থিরতার সৃষ্টি হবে। কারণ বর্তমানে ইরানের উৎপাদিত তেলের পরিমাণ প্রায় ৩৩ লাখ ব্যারেল যা বৈশ্বিক সরবরাহের প্রায় ৩ শতাংশ। যদি গাণিতিক হিসাব করা হয় তাহলে প্রতি ১ শতাংশ সরবরাহ ব্যাহত হলে তেলের দাম বাড়তে পারে ব্যারেল প্রতি ৩ থেকে ৫ শতাংশ। সেই হিসেবে যদি শুধু মাত্র ইরানের তেল সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায় তাহলে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ৯ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
অন্যদিকে ইতোমধ্যেই কয়েকটি বড় তেল কোম্পানি ও শীর্ষ ট্রেন্ডিং হাউস যেগুলো হরমুজ প্রণালী হয়ে অপরিশোধিত তেল ও জ্বালানি সরবরাহ করতো সেগুলো তাদের সরবরাহ স্থগিত করে দিয়েছে। হরমুজ প্রণালী দিয়ে আংশিক জাহাজ চলাচল হুমকির মুখে পড়লে মূল্যবৃদ্ধি প্রভাব হয়ে ওঠে কাঠামোগত। যার ফলে ব্যারেলপ্রতি ২০ থেকে ৪০ ডলারের ভূরাজনৈতিক প্রিমিয়াম যুক্ত হতে পারে এবং তেলের দাম ৯৫ বা ১১০ ডলার বা তারও বেশি হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।
গত বছর মাত্র ১২ দিনের ইসরায়েল-ইরান সংঘাতের সময় তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ৮০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছেছিল। তাছাড়াও সাম্প্রতিক তথ্য বিশ্লেষণে, ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেল প্রতি প্রায় ৭৩ ডলার,যা এরই মধ্যে চলতি বছরে প্রায় ২০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এ সম্পর্কে ক্যাপিটাইন ইকোনোমিকসের উন্নয়নশীল বাজার বিষয়ক প্রধান বিশ্লেষক উইলিয়াম জ্যাকসনের মতে, সংঘাতের তীব্রতা কম হলেও ব্রেন্টের দাম ৮০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
যার প্রভাব বিশ্বজুড়ে উৎপাদন খরচ এবং ভোক্তামূল্যের উপর পড়বে, বিশেষ করে খাদ্য, পোশাক ও রাসায়নিকের মতো পণ্যের উপর। তেলের এই মূল্যবৃদ্ধির ফলে তেল আমদানিনির্ভর উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এই সংকট আরও ভয়াবহ। এসব দেশের নিজস্ব জ্বালানি উৎপাদন সীমিত, তাই আন্তর্জাতিক বাজারের উপর নির্ভর করতে হয়। তেলের দাম বাড়লে আমদানি ব্যয় বহুগুণ বৃদ্ধি পায় এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ সৃষ্টি হয়। ডলারের চাহিদা বেড়ে গেলে স্থানীয় মুদ্রার মান কমে যায়। ফলে আমদানিনির্ভর অন্যান্য পণ্যের দামও বৃদ্ধি পায়।অর্থনীতিতে একটি চেইন রিঅ্যাকশন তৈরি হয়।এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর ঝুঁকি অনেক বেশি। বাংলাদেশ বিপুল পরিমাণ জ্বালানি ও পরিশোধিত তেল মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করে। যদি হরমুজ প্রণালী দিয়ে সরবরাহ ব্যাহত হয়, তাহলে জ্বালানি আমদানির খরচ বেড়ে যাবে। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে, শিল্পকারখানার উৎপাদন কমে যেতে পারে এবং পরিবহন ব্যয় বেড়ে যেতে পারে। এর প্রভাব পড়বে কৃষি, রপ্তানি ও অভ্যন্তরীণ বাজারে। একই সঙ্গে বাজেট ঘাটতি ও বৈদেশিক ঋণের চাপও বাড়বে। সরকারকে ভর্তুকি বাড়াতে হয়, যা অর্থনীতির উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে। দীর্ঘমেয়াদী এই পরিস্থিতি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকেও প্রভাবিত করতে পারে।হরমুজ প্রণালীর কৌশলগত গুরুত্ব তাই কেবল অর্থনৈতিক নয়; এটি সামরিক ও কূটনৈতিক ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।তবে এই সংকট থেকে উত্তরণের পথও আছে। কূটনৈতিক সমাধান ও সংলাপের মাধ্যমে আঞ্চলিক উত্তেজনা কমাতে হবে।
যুদ্ধ কখনোই স্থায়ী সমাধান এনে দেয় না বরং তা অর্থনৈতিক ও মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনে। কৌশলগত তেল মজুদ বৃদ্ধি এবং বহুমুখী আমদানি উৎস তৈরি করাও প্রয়োজন, যাতে কোনো একটি অঞ্চলে সংকট দেখা দিলে সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ না হয়ে যায়।তাই হরমুজ প্রণালী শুধু একটি জলপথ নয়; এটি বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রাণরেখা। এই প্রণালী ঘিরে সংঘাত বিশ্বকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে আধুনিক বিশ্বব্যবস্থা কতটা পরস্পরনির্ভরশীল। মধ্যপ্রাচ্যের একটি সামান্য অস্থিরতা হাজার মাইল দূরের দেশগুলোকেও প্রভাবিত করে। তাই আঞ্চলিক সংঘাতের দ্রুত ও শান্তিপূর্ণ সমাধান এবং জ্বালানির বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তোলাই বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার একমাত্র পথ। অন্যথায়, হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে যে অস্থিরতা সৃষ্টি হচ্ছে, তা ভবিষ্যতে আরও বড় অর্থনৈতিক ঝড় ডেকে আনতে পারে। আধুনিক সভ্যতাকে ঠিকিয়ে রাখার জন্য এবং একটি শান্তিময় বিশ্ব গড়ে তোলার জন্য কৌশলগত সমঝোতা নীতি নির্ধারণের মাধ্যমে যুদ্ধ বন্ধ করতে হবে। তার পাশাপাশি বৈশ্বিক অর্থনীতি গতিশীল ও স্থিতিশীল রাখতে বিশ্বের সকল দেশগুলোকে পারস্পরিক সহযোগিতায় কাজ করতে হবে। কারণ সংঘাত নয় বরং সহযোগিতা ও শান্তিপূর্ণ সমাধানই হতে পারে টেকসই উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার গেম চেঞ্জার।
লেখিকা : শিক্ষার্থী, ইডেন মহিলা কলেজ (ইংরেজি বিভাগ)।





















