স্বপ্নের স্বাধীনতাকে আমরা কতটা ধারন করেছি?

পংকজ প্রিয়ম : ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ—একটি অবিস্মরণীয় দিন , যা কেবল ক্যালেন্ডারের পাতা নয়, বরং এক গভীর আর্তনাদের প্রতিধ্বনি। তার আগের রাত, পঁচিশে মার্চ, ইতিহাসে শুধু “কালরাত” নামেই চিহ্নিত নয়; এটি ছিল মানবিকতার এক কঠিন পরীক্ষার সময়। চারপাশে যখন আগুন, আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তা ছড়িয়ে পড়ছিল, তখনই অদৃশ্যভাবে গড়ে উঠছিল এক অদম্য সংকল্প—বেঁচে থাকার, মুক্ত হওয়ার, নিজের পরিচয় ফিরে পাওয়ার।
সেই রাতের ভার আজও বাতাসে মিশে আছে, যদিও আমরা তা সবসময় টের পাই না। কারণ সময় আমাদের অনেক কিছু ভুলতে শেখায়, অনেক কিছুকে দূরের গল্পে পরিণত করে। কিন্তু প্রশ্নটা এখানেই—আমরা কি সত্যিই ভুলে যেতে পারি? নাকি আমরা শুধু অনুভব করার দায় এড়িয়ে যাই?

আজ স্বাধীনতার ৫৫ বছর পর, আমরা এক ভিন্ন বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে। প্রযুক্তি, উন্নয়ন, নাগরিক জীবনের ব্যস্ততা, রাজনৈতিক টানপোড়ন ও অস্থিরতা, এক শ্রেণীর মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সম্পর্কে না জানা, দেশপ্রেমকে ধারণ না করা। সবকিছু আমাদের চারপাশকে বদলে দিয়েছে। কিন্তু এই পরিবর্তনের ভিড়ে, সেই ভয় আর স্বপ্নের সহাবস্থানকে আমরা কতটা মনে রাখি? একটি জাতির জন্ম কখনোই সহজ বা নিঃশব্দ নয়। সেখানে থাকে দ্বন্দ্ব, রক্ত, অশ্রু—আর একই সঙ্গে থাকে এক অদম্য আশার আলো।

আমরা হয়তো আজ নিরাপদ ঘরে বসে সেই সময়ের কথা বলি, লিখি, স্মরণ করি। কিন্তু সেই মানুষগুলো, যারা সেই রাত পার করেছিল, তাদের কাছে স্বাধীনতা কোনো বিমূর্ত ধারণা ছিল না—এটি ছিল প্রতিটি শ্বাসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক বাস্তব সংগ্রাম। তাদের ভয় ছিল বাস্তব, তাদের স্বপ্নও ততটাই বাস্তব।
এই জায়গাটাতেই আমাদের আত্মসমালোচনার দরকার আছে। আমরা কি সত্যিই আমাদের বোধের জানালাগুলো খুলেছি? নাকি আমরা শুধু আনুষ্ঠানিকতা পালন করছি? পতাকা উত্তোলন, স্লোগান, সামাজিক মাধ্যমে আবেগ—এসবের বাইরে গিয়ে আমরা কতটা অনুভব করি, কতটা বুঝতে চাই?

স্বাধীনতা কেবল একটি অর্জন নয়; এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। এটি প্রতিদিনের চর্চা, প্রতিদিনের দায়বদ্ধতা। যে চেতনা থেকে একটি জাতির জন্ম হয়েছিল, সেই চেতনা ধরে রাখা, লালন করা—এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।

হয়তো আমরা সেই সময়ের তীব্রতা পুরোপুরি অনুভব করতে পারব না। কিন্তু আমরা চেষ্টা করতে পারি—শুনতে, জানতে, প্রশ্ন করতে। কারণ প্রশ্নহীন স্মৃতি একসময় নিস্তেজ হয়ে যায়, আর নিস্তেজ স্মৃতি কখনোই একটি জাতিকে জীবন্ত রাখতে পারে না।
তাই, আজ প্রয়োজন শুধু স্মরণ নয়, উপলব্ধি। শুধু ইতিহাস জানা নয়, ইতিহাসকে নিজের ভেতরে ধারণ করা। কারণ একটি দেশের সত্যিকারের স্বাধীনতা তখনই পূর্ণতা পায়, যখন তার মানুষ সেই স্বাধীনতার মূল্য বুঝতে পারে—গভীরভাবে, নিরন্তরভাবে।

লেখক : শিক্ষক, কবি ও গল্পকার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *