ভালো কাজে উৎসাহ দিন

মো. জাহিদ হাসান : মানুষ স্বভাবতই একে অপরের দ্বারা প্রভাবিত হয়। উৎসাহ যেকোনো কাজের প্রতি মানুষের আগ্রহকে বাড়িয়ে তোলে; হোক সেটা ভালো কাজ, অথবা মন্দ কাজ। কোনো ব্যক্তি মন্দ কাজে উৎসাহিত হলে ব্যক্তি ও সমাজ উভয়ই ক্ষতির মুখে পড়ে। পক্ষান্তরে, ভালো কাজে উৎসাহ পেলে মানুষের জীবন কল্যাণকামী হয়ে ওঠে এবং সমাজ উন্নত হয়। কথায় আছে, ‘জন্ম হোক যথা-তথা, কর্ম হোক ভালো।’ জীবনের সার্থকতা নিহিত থাকে ভালো কাজের মধ্যে। ভালো কাজের চর্চা অটুট থাকে উৎসাহ-উদ্দীপনার মাধ্যমে। বিশেষ করে, শিশুদের উপর উৎসাহ-উদ্দীপনার প্রভাব গুরুতর।

উৎসাহ না পেলে একজন মেধাবী শিক্ষার্থী অল্পতেই ঝরে পড়ে, আবার একজন কম মেধাবী শিক্ষার্থী উৎসাহ পেলে নিরলসভাবে ব্যর্থতা ও পরিশ্রমকে সাফল্যের সিঁড়ি বানিয়ে ফেলতে পারে। আমাদের দেশের গ্রামের অনেক শিশুই দরিদ্রতার কারণে অল্পতেই পড়ালেখা ছেড়ে শিশুশ্রমে জড়িত হয়ে পড়ে। এর পেছনে মূলত দায়ী উৎসাহের অভাব। পরীক্ষায় আশানুরূপ ফল না পেয়ে শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার পেছনে দায়ী অভিভাবকদের উৎসাহ ব্যঞ্জনার অভাব। আমাদের সমাজে এখনো কন্যা শিশুদের বোঝা স্বরুপ ভাবা হয়। পরিবার থেকে কন্যা শিশুদের পড়ালেখার প্রতি নিরুৎসাহিত করা হয়। বাল্যবিবাহের ফলে কন্যাশিশুদের মেধার বিকাশ একটি গন্ডিতে আবদ্ধ হয়ে যায় এবং সাংসারিক চাপ মোকাবিলায় অচিরেই তারা হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। পড়ালেখা নিয়ে অনিশ্চয়তার অযুহাত দেখিয়ে বাল্যবিবাহের মাধ্যমে কন্যাশিশুদের আরো অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেওয়া হয়। উন্নত জীবন ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্র গঠনের জন্য কন্যাশিশুদের পড়ালেখার প্রতি উৎসাহিত করা অত্যন্ত জরুরি। কিশোর অপরাধ এবং মাদকাসক্তির পেছনে খারাপ বন্ধুদের উৎসাহ ব্যাপকভাবে দায়ী।

অধিকাংশ শিশু-কিশোর ধুমপান শুরু করে বন্ধুদের প্ররোচনায়। অধিকাংশ শিক্ষার্থীদের মধ্যে হতাশা ও আত্মহত্যার প্রবণতার কারণও এটি। ইভ-টিজিং, কিশোর অপরাধ ও অন্যান্য সামাজিক অপরাধের পেছনে এটাই মূল কারণ। পরীক্ষার খাতায় নকল করা থেকে শুরু করে অফিস-আদালতে ঘুষ-দূর্ণীতি প্রভৃতি অপরাধপ্রবণতা বৃদ্ধি পায় একে অন্যের দ্বারা নেতিবাচকভাবে উৎসাহ পেয়ে।

অথচ, তরুণদের স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজকে অনেকেই হেয় প্রতিপন্ন করে। এটা মোটেই কাম্য নয়। এর ফলে স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজের চর্চা ধিরে ধিরে উঠে যাচ্ছে। স্বেচ্ছাসেবী কাজ মানুষকে সৎ, ন্যায়পরায়ণ ও দেশপ্রেমিক হতে সাহায্য করে। অনেক শিক্ষার্থী আছে যারা পড়ালেখার পাশাপাশি সহশিক্ষা মূলক কার্যক্রমের সাথে জড়িত। যেমন– বিতর্ক, আবৃত্তি, বিএনসিসি, রোভার স্কাউট, পত্রিকার পাতায় লেখালেখি প্রভৃতি। এছাড়া, অনেকই পড়ালেখার পাশাপাশি টিউশন ও পার্ট-টাইম কাজ করে। এসকল শিক্ষার্থীদের প্রায়ই বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়দের কাছে হেনস্তার শিকার হতে হয়। অথচ, তাদের কাজগুলো সত্যিই প্রশংসনীয়। হিংসাত্মক মনোভাব থেকেও অনেকে সহপাঠী, কিংবা আত্বীয়-স্বজনের সফলতায় উৎসাহ দেওয়ার বদলে কটু কথা বলে ছোট করে থাকে। আমাদের দেশে বেকারত্ব সমস্যার অন্যতম একটি কারণও এটি।

দেশের মানুষ কাজের সঠিক মর্যাদা দিতে জানে না। অনেক নতুন উদ্যোক্তা সামাজিক অমর্যাদা ও পারিবারিক সমর্থনের অভাবে ঝড়ে পড়ে। পড়ালেখা শেষে সরকারি চাকরি না পেলে যেন কাউকে মানুষ হিসেবেই দেখা হয় না। অথচ, সফলতার অগাধ সম্ভাবনা থাকলেও শিক্ষার্থীর আগ্রহের বিষয়ে পরিবার উৎসাহ দিতে পারে না। শিক্ষার্থীদের মাথায় ছোটবেলা থেকেই সরকারি চাকরি ও টাকা উপার্জনকে পড়ালেখার উদ্দেশ্য হিসেবে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। ফলে, শিক্ষার আসল উদ্দেশ্য হারিয়ে ভালো ফলাফল ও অর্থ উপার্জনের লোভে বুঁদ হয়ে থাকে এদেশের শিক্ষার্থীরা। দূর্ণীতির শিকার হতে হতে ভালো মানুষও একসময় দূর্ণীতিবাজ হয়ে ওঠে। এভাবেই সংক্রমনের মতো অন্যায় ও দূর্ণীতি ছড়িয়ে পড়ছে আমাদের দেশের মানুষের মাঝে। কাজের স্বীকৃতি সকলেই চায়। তাই, ভালো কাজের স্বীকৃতি স্বরুপ উৎসাহ প্রদান করা অত্যন্ত জরুরি। সুষ্ঠু মানসিক বিকাশ, সামাজিক শৃঙ্খলা ও উন্নত দেশ গঠনের লক্ষ্যে সবার মধ্যে ভালো কাজে একে-অপরকে উৎসাহ প্রদানের চর্চা অটুট রাখতে হবে।

লেখক: শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *