বিপন্ন মানবতা: ধর্ষণের মহোৎসব ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি

উড়নচণ্ডী (সাইদী বোরহান) :

​সম্প্রতি বাংলাদেশে নারী ও শিশু ধর্ষণের ঘটনা যে হারে বেড়েছে, তাতে সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে। প্রায় প্রতিদিনই সংবাদপত্রের পাতায় এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো না কোনো বিভীষিকাময় ঘটনার খবর আসছে। ঘর থেকে শুরু করে কর্মক্ষেত্র, গণপরিবহন এমনকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান—কোথাও আজ নারীরা নিরাপদ বোধ করছে না।

​সাম্প্রতিক কিছু বিভীষিকাময় চিত্র:
​গত কয়েক মাস এবং বছরের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ধর্ষণের ধরণ ও নৃশংসতা পূর্বের চেয়ে অনেক বেশি ভয়াবহ হয়ে উঠেছে।
​শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তাহীনতা: ২০২৪ ও ২০২৫ সালের বিভিন্ন সময়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ বেশ কিছু নামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে, যা দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি করেছিল।


​গণপরিবহনে থাবা: রাতের বেলা বাস বা সিএনজিতে যাতায়াতের সময় নারী যাত্রীরা ধর্ষণের শিকার হচ্ছেন। টাঙ্গাইল ও গাজীপুরের মতো এলাকায় এ ধরনের একাধিক ঘটনা বিভিন্ন গণমাধ্যমে উঠে এসেছে।
​শিশু নির্যাতন: মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন (MJF) এবং আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্যমতে, করোনাকাল পরবর্তী সময়ে এবং গত এক বছরে শিশু ধর্ষণের হার উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে ৫ থেকে ১২ বছরের শিশুরা নিজ পরিচিতজনদের দ্বারা বেশি আক্রান্ত হচ্ছে।

​আইন ও শাস্তি: যা জানা জরুরি
​বাংলাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের বিচার হয় ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ (সংশোধিত ২০২০)’ এর অধীনে। ধর্ষণের শাস্তি হিসেবে বর্তমানে আইনে অত্যন্ত কঠোর বিধান রয়েছে:
​সাধারণ ধর্ষণ: এই আইনের ৯(১) ধারা অনুযায়ী, ধর্ষণের শাস্তি যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড এবং এর অতিরিক্ত অর্থদণ্ড।
​ধর্ষণের ফলে মৃত্যু: ধারা ৯(২) অনুযায়ী, যদি ধর্ষণের কারণে ভিকটিমের মৃত্যু ঘটে, তবে অপরাধীর শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড এবং কমপক্ষে এক লক্ষ টাকা অর্থদণ্ড।
​দলবদ্ধ ধর্ষণ: ধারা ৯(৩) অনুযায়ী, দলবদ্ধভাবে কেউ ধর্ষণের শিকার হলে প্রত্যেক অপরাধীর শাস্তি মৃত্যুদণ্ড অথবা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড।
​সংশোধনী ২০২০: ২০২০ সালে আন্দোলনের মুখে সরকার আইন সংশোধন করে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড অন্তর্ভুক্ত করেছে।
​অন্তরায় ও উত্তরণের পথ
​এত কঠোর আইন থাকা সত্ত্বেও কেন ধর্ষণ কমছে না? সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, এর প্রধান কারণ ‘বিচারহীনতার সংস্কৃতি’ এবং মামলার দীর্ঘসূত্রতা।
​তথ্য-প্রমাণ ও আইনি জটিলতা: অনেক ক্ষেত্রে প্রভাবশালী আসামিরা পার পেয়ে যায় এবং ভিকটিম সামাজিকভাবে হেনস্তার শিকার হয়।
​সাংস্কৃতিক অবক্ষয়: ইন্টারনেটে পর্নোগ্রাফির সহজলভ্যতা এবং নারীর প্রতি পণ্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গি এই অপরাধকে উস্কে দিচ্ছে।

সর্বশেষ, ​শুধু আইন বা ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলিয়ে ধর্ষণ নির্মূল করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধের জাগরণ। প্রতিটি পরিবারে পুত্রসন্তানকে নারীর প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার শিক্ষা দিতে হবে। একই সঙ্গে দ্রুততম সময়ে বিচার নিশ্চিত করে অপরাধীদের মনে আইনের ভয় তৈরি করতে হবে। রাষ্ট্র, সমাজ এবং ব্যক্তি—সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে বাংলাদেশকে একটি নিরাপদ আবাসস্থলে পরিণত করতে।

​তথ্যসূত্র ও রেফারেন্স:আইন ও সালিশ কেন্দ্র (ASK) – বার্ষিক মানবাধিকার প্রতিবেদন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *