ডলারের রাজনীতি ও বৈশ্বিক দাবার বোর্ড: আধিপত্যের মোড় কি ঘুরছে?

ফারজানা আক্তার : বিশ্ব অর্থনীতি ও ভূ-রাজনীতির বিশাল দাবার বোর্ডে ‘ডলার’ কেবল একটি মুদ্রা নয়, এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একচ্ছত্র আধিপত্যের প্রধান কৌশলগত হাতিয়ার। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী ব্রেটন উডস চুক্তির মাধ্যমে ডলার যখন বিশ্ব অর্থনীতির সিংহাসনে বসে, তখন তার ভিত্তি ছিল অগাধ বিশ্বাস আর স্বর্ণের মজুত। সময়ের পরিক্রমায় স্বর্ণের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন হলেও ডলারের প্রতাপ কমেনি বরং বেড়েছে। তবে সাম্প্রতিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা, বিশেষ করে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের নতুন সমীকরণ ডলারের সেই অপ্রতিরোধ্য ইমেজে ফাটল ধরাতে শুরু করেছে। চিরাচরিতভাবে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের বাণিজ্য ডলারে সম্পন্ন হয়ে থাকে, যা পেট্রোডলার নামে পরিচিত।

বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের দেশ তেল কিনতে চাইলে তাকে ডলারের দ্বারস্থ হতে হয়। এই অমোঘ নির্ভরতাই ওয়াশিংটনকে এক অনন্য ক্ষমতা দিয়েছে, যার মাধ্যমে তারা একক সিদ্ধান্তে যেকোনো দেশের ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে পারে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রায় ৮০ শতাংশ এবং বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের প্রায় ৬০ শতাংশই এখনো ডলারের দখলে।

এই বিশাল আর্থিক আধিপত্যই যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বমঞ্চে এক আর্থিক পরাশক্তি হিসেবে টিকিয়ে রেখেছে। ডলারের এই একচ্ছত্র আধিপত্য বর্তমানে হুমকির মুখে পড়ার প্রধান কারণ হলো অস্ত্রায়ন। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর রাশিয়ার প্রায় ৩১০ বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ জব্দ করা এবং দেশটিকে আন্তর্জাতিক লেনদেন ব্যবস্থা সুইফট থেকে বিচ্ছিন্ন করা ছিল বিশ্ব রাজনীতির দাবার বোর্ডে এক চরম পদক্ষেপ। এই ঘটনাই বিশ্বের উদীয়মান শক্তিগুলোকে একটি কঠিন সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে যে, তাদের সম্পদ ততক্ষণই নিরাপদ যতক্ষণ তারা ওয়াশিংটনের মিত্র হিসেবে থাকবে। যখনই কোনো দেশ মার্কিন স্বার্থের পরিপন্থী অবস্থান নেয়, তখনই ডলারকে শাস্তিমূলক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এই নিরাপত্তাহীনতা থেকেই জন্ম নিয়েছে ডি-ডলারাইজেশন বা ডলার বিমুখতার নতুন প্রবণতা। বর্তমানে চীন, রাশিয়া, ভারত এবং ব্রাজিলের মতো দেশগুলো নিজেদের মুদ্রায় বাণিজ্য করার সাহসী পদক্ষেপ নিচ্ছে। যা ব্রিকস জোট নামে পরিচিত।

ব্রিকস জোটের পরিধি বাড়ছে এবং তারা এমন এক বিকল্প আর্থিক ব্যবস্থার কথা বলছে যা একক কোনো দেশের গডফাদার সুলভ আধিপত্য মেনে নেবে না। বিশেষ করে পেট্রোডলারের দুর্গে ফাটল ধরাটা সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ। ইরান বর্তমানে চীনের কাছে তার তেলের প্রায় ৮০ শতাংশ বিক্রি করছে এবং এর একটি বড় অংশ ইউয়ানে লেনদেন হচ্ছে। যদি ইরান হরমুজ প্রণালী দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের শর্ত হিসেবে ইউয়ান বা বিকল্প মুদ্রার দাবি তোলে, তবে তা হবে ডলারের জন্য এক বিশাল ধাক্কা। এমনকি সৌদি আরবও এখন চীনের কাছে তেল বিক্রির বিনিময়ে ইউয়ান গ্রহণের কথা গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করছে। দাবার বোর্ডে চালগুলো এখন দ্রুত বদলাচ্ছে।

ডলারের এই বৈশ্বিক লড়াই কেবল বড় শক্তিগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের মতো স্বল্পোন্নত দেশগুলোর ওপর। আমেরিকার অভ্যন্তরীণ মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে যখন ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার বাড়ায়, তখন এই দেশে ডলারের তীব্র সংকট তৈরি হয়। টাকার মান কমতে থাকে, আমদানিকৃত খাদ্য ও জ্বালানির দাম আকাশচুম্বী হয় এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান সংকুচিত হয়। অর্থাৎ ওয়াশিংটনের নেওয়া একটি ছোট নীতিগত সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের রাজধানী তথা ঢাকার বাজারকেও উত্তপ্ত করে তোলে। যার মাশুল গুনতে হয় বাংলাদেশের সর্বস্তরের জনগণকে এই অতিনির্ভরশীলতা কেবল অর্থনৈতিক ঝুঁকি নয় বরং এটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নেও প্রাসঙ্গিক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তবে ডলার খুব দ্রুতই তার সিংহাসন হারাবে না, কারণ এর বিকল্প হিসেবে এখনো কোনো শক্তিশালী, স্বচ্ছ এবং সর্বজনগ্রাহ্য বৈশ্বিক আর্থিক কাঠামো বা সুইফটের যোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বী গড়ে ওঠেনি। মার্কিন ডলারের পেছনে যে বিশাল সামরিক শক্তি, আইনি স্বচ্ছতা এবং দীর্ঘদিনের গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে, তা ইউয়ান বা রুবলের নেই। চীন বা রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক নীতি এখনো বিশ্ববাজারের কাছে ডলারের মতো স্বচ্ছ নয়। তবে বিশ্ব যে একটি মাল্টি-পোলার বা বহুমুখী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার দিকে যাত্রা শুরু করেছে, তা এখন অনস্বীকার্য। বাংলাদেশের জন্য এই সন্ধিক্ষণটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ২০২৬ সালে এলডিসি থেকে উত্তরণের পথে থাকা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য সামনের দিনগুলো চ্যালেঞ্জিং হতে পারে। এই ঝুঁকি মোকাবিলায় বাণিজ্যের বহুমুখীকরণ করা এখন সময়ের দাবি। কেবল ডলারের ওপর নির্ভর না করে অন্যান্য প্রধান মুদ্রায় বাণিজ্যের সম্ভাবনা যাচাই করা এবং জ্বালানি আমদানিতে বিকল্প পথ ও পেমেন্ট ব্যবস্থা নিয়ে কাজ করা জরুরি। সেই সাথে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে আরও বৈচিত্র্যময় করা এবং রপ্তানি আয়ের শতভাগ সময়মতো দেশে ফিরিয়ে আনতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর তদারকি নিশ্চিত করতে হবে।

সামগ্রিকভাবে, ২০২৬ সালে ডলারের রাজনীতিতে বাংলাদেশের জয়ী হতে হলে আর্থিক খাতের সংস্কার, পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা অপরিহার্য।ভূ-রাজনীতির এই মহাযুদ্ধে বাংলাদেশ হয়তো রাজা বা মন্ত্রী নয় কিন্তু একটি দায়িত্বশীল রাষ্ট্র হিসেবে নিজেদের অর্থনৈতিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে চালগুলো হতে হবে সময়োপযোগী ও বিচক্ষণ। ডলার হয়তো রাতারাতি বিলীন হবে না কিন্তু আধিপত্যের মোড় পরিবর্তনের যে সুর বেজেছে তা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।নীতি-নির্ধারকদের দূরদর্শী সিদ্ধান্তই নিশ্চিত করবে যে পরিবর্তনের এই ঢেউয়ে বাংলাদেশ তলিয়ে যাব নাকি নতুন এক স্থিতিশীল অর্থনীতির পথে সফলভাবে পা বাড়াবে। পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশকে এখন থেকেই সাহসী ও যুগোপযোগী অর্থনৈতিক কূটনীতির পথে হাঁটতে হবে। কৌশলগত পরিবর্তন ও যথার্থ বাস্তবায়নের মাধ্যমেই বাংলাদেশ উন্নতি এবং প্রগতির পথে এগিয়ে যাবে।

লেখিকা : শিক্ষার্থী, ইডেন মহিলা কলেজ।

ইমেইল: farjana9827akter@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *