ফিরে এসো

উম্মে হাবিবা

শামসুল চৌধুরী সাহেবের ড্রয়িং রুমে আজ এক অনন্য মিলনমেলা বসেছে। উপলক্ষ—ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। গ্রামের পৈতৃক ভিটায় ভোট দেওয়ার জন্য ঢাকা থেকে তাঁর সন্তানদের পুরো পরিবার হাজির হয়েছে। অনেক দিন পর বাড়ির প্রতিটি কোণ ছোটদের কিচিরমিচিরে মুখরিত।
কিন্তু ডাইনিং টেবিলে রাতের খাবারের সময় দৃশ্যটা পাল্টে গেল। যা দেখে শামসুল চৌধুরীর মনের ভেতর এক গভীর হাহাকার জন্ম নিল।

​রৌজান আজ খেতে বসেছে, তার মা পরম মমতায় লোকমা তুলে তার মুখে তুলে দিচ্ছেন। কিন্তু রৌজানের সেদিকে বিন্দুমাত্র খেয়াল নেই, তার চোখ আটকে আছে হাতের স্মার্টফোনের উজ্জ্বল রঙিন পর্দায়। শুধু রৌজান নয়—আরোহী, রোহিনী, আদিল আর রোজনী—সবার একই দশা। প্রত্যেকের সামনে ভাতের থালায় থাকলেও বাম হাতটি ব্যস্ত ফেসবুক, টিকটক আর ইউটিউবের স্ক্রিন স্ক্রল করতে। কেউ খাচ্ছে, কেউ রিলস্ দেখে যান্ত্রিকভাবে হাসছে, কিন্তু কেউ কারও চোখের দিকে তাকাচ্ছে না।
এই যেন এক পঙক্তিতে বসেও যোজন যোজন দূরের বাসিন্দা।
​এই দৃশ্য দেখে শামসুল চৌধুরী এক মুহূর্তের জন্য পাথরের মতো স্থির হয়ে গেলেন।

যে নাতি-নাতনিদের দেখার জন্য তিনি সারা বছর পথ চেয়ে থাকতেন, তারা পাশে বসেও যেন কত দূরে হারিয়ে গেছে!
তিনি ভাবলেন, বিজ্ঞান আমাদের হাতের মুঠোয় পৃথিবী দিলেও কলিজার টানগুলো কত সস্তা আর যান্ত্রিক করে দিয়েছে।
তিনি একজন খাঁটি মুসলিম হিসেবে কুরআনের আয়াতে অগাধ বিশ্বাস রাখেন। তাঁর মনে পড়ে গেল সূরা আল-মুমিনুনের ৩ নম্বর আয়াতের কথাঃ- “ওয়াল্লাজিনা হুম আনিল লাগউই মু’রিজুন”।
যার অর্থ হলো—’আর যারা অনর্থক কথা ও কাজ থেকে বিমুখ থাকে।’

​শামসুল চৌধুরী ধীর পায়ে টেবিলের সামনে এসে দাঁড়ালেন। কিছুক্ষণ অপলক চেয়ে থেকে নিজের ধবধবে সাদা পাকা দাড়িতে হাত বুলিয়ে চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে আনলেন।

তারপর গম্ভীর অথচ এক দরদী মুরব্বির গলায় বললেন:-
​”কী রে দাদুরা! তোদের এই যে খাওয়ার টেবিলে বসেও ওই যন্ত্র নামক মোবাইলটার ভেতরে মুখ গুঁজে থাকা, এটা দেখতে কি খুব ভালো লাগছে? শোনো দাদুরা, আমাদের ইসলাম ধর্মে খাবার খাওয়া আর কুরআন পড়া—দুটোই কিন্তু সমান আদবের কাজ। কুরআন পড়ার সময় যেমন আমরা অন্য দিকে তাকাই না, মনে ভক্তি রাখি, তেমনি খাবারের সময়ও একাগ্রতা থাকা চাই। খাবার হলো আল্লাহর দেওয়া ‘রিজিক’, আর এই রিজিকের দিকে তাকিয়ে সম্মান করে খুশি মনে খাওয়াটাও একটা বড় ইবাদত।
তোরা তো শিক্ষিত পোলাপান, তোদের কি আর নতুন করে বোঝাতে হবে? এই যে খাবারটা খাচ্ছিস, এটার একটা শোকরগোজারি আছে না? পাশে আপনজনরা বসে আছে, তাদের সাথে দুটো কথা বলা, একটু কুশল বিনিময় করা—এটাই তো আসল বরকত। তোরা কি পারবি না এই যন্ত্র নামক মোবাইলটা একটু সাইডে রেখে এই বুড়ো দাদুর সাথে শান্তিমতো দুটো লোকমা ভাত খেতে? এভাবে চললে তো তোদের কলিজার ভেতর মায়া-মহব্বত সব শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাবে রে দাদুরা!”

​তাঁর কথায় যেন বিদ্যুতের মতো কাজ হলো। তরুণরা হঠাৎ সম্বিৎ ফিরে পেয়ে কিছুটা লজ্জিত হলো। আরোহী আমতা আমতা করে বলল, “দাদু, জাস্ট একটা ইম্পর্ট্যান্ট মেসেজ চেক করছি তো!”

​শামসুল চৌধুরী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মৃদু হাসলেন। বললেন, “হুম, মেসেজ! ওইটুকু স্ক্রিনের ভেতরেই তোদের সব দুনিয়া আটকে গেছে। শোন, আজ আমি তোদের সাথে কিছু গল্প করব। তোরা খাবার শেষ করে মোবাইল ফোনটা ঘরে রেখে ছাদে আসিস। তোদের জন্য আজ এক বিশেষ উপহার অপেক্ষা করছে।”
এরপর তিনি রৌজানের মাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “বৌমা, তুমি আমাদের জন্য কয়েক কাপ চা করে ছাদে পাঠিয়ে দিও। আজ মন খুলে এদের সাথে আমার আমলের কিছু কথা বলব।”

শামসুল চৌধুরী সাহেবের ড্রয়িং রুমের গুমোট ভাবটা যেন এই এক কথাতেই কেটে গেল। তিনি খাবার খেয়ে ধীরপদে অন্দরমহলের দিকে পা বাড়ালেন। কিছুক্ষণ পর, লাঠিতে ভর দিয়ে তিনি সিঁড়ি বেয়ে ছাদে উঠতে লাগলেন। তাঁর পেছনে পেছনে রৌজান, আদিল, আরোহী আর রোজনী—একদম বাধ্য ছাত্রের মতো সারিবদ্ধভাবে এগোতে থাকল। আজ কারো হাতে সেই চিরচেনা মোবাইলের আলোর ঝিলিক নেই, বরং সবার চোখেমুখে এক অদ্ভুত কৌতূহল।

​ছাদের ওপর স্নিগ্ধ জ্যোৎস্না ছড়িয়ে পড়েছে। চারদিকে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর হালকা শীতের আমেজ। উত্তরের হিমেল হাওয়া এসে দাদুর সাদা দাড়িগুলোকে আলতো করে ছুঁয়ে যাচ্ছে। মাঝখানে রাখা বড় ইজি চেয়ারে দাদু আয়েশ করে বসলেন, আর মাদুরে নাতি-নাতনিরা তাঁকে ঘিরে গোল হয়ে বসল। আকাশের রুপালি চাঁদটা যেন আজ শুধু তাদের এই আড্ডায় সাক্ষী থাকতেই অতটা উজ্জ্বল হয়ে ধরা দিয়েছে।

ছাদের ওপর স্নিগ্ধ জ্যোৎস্না ছড়িয়ে পড়েছে। চারদিকে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর হালকা শীতের আমেজ।শামসুল চৌধুরী ইজি চেয়ারে শুয়ে আকাশের নক্ষত্র দেখছিলেন। তাঁর চারপাশে নাতি-নাতনিরা গোল হয়ে বসল। আরোহী উৎসুক হয়ে নিরবতা ভেঙে বলল, “দাদু, এবার বলো কী সেই উপহার? কী এমন কথা বলবে আমাদের?”
​শামসুল চৌধুরী গলা পরিষ্কার করে সেই পুরনো দিনের মাঝির মতো গল্প শোনানোর ঢঙে শুরু করলেন:
​”আয় দাদুরা, একটু গা ঘেঁষে বোস। তোরা তো এখনকার ডিজিটাল যুগের পোলাপান, আঙুলের এক ইশারায় সব হাজির। কিন্তু আমাদের সময়টা ছিল বড় মায়াবী। ঘড়ির কাঁটা যেন এখনকার মতো এত জোরে দৌড়াত না,সময় যেন অলস মন্থর গতিতে গ্রামের মেঠো পথ দিয়ে হেঁটে চলত। ভোরে পাখির ডাকে যখন ঘুম ভাঙত, তখন মনে হতো জগৎটা শান্তিতে ভরা। সকালে পান্তা ভাত আর পোড়া লঙ্কার স্বাদ নিয়ে কৃষকেরা লাঙল কাঁধে মাঠে যেত। আধুনিক যন্ত্রের কর্কশ শব্দ তখনো বাতাসের স্নিগ্ধতাকে নষ্ট করতে পারেনি।

​দাদুভাই রৌজান, আজ দেখলাম তোর মা তোকে খাইয়ে দিচ্ছে আর তুই ফোনের দিকে তাকিয়ে আছিস।
আমাদের সময় ছোট বাচ্চারা খাবার না খাইলে মা-চাচিরা চাঁদের বুড়ির গল্প শোনাতেন, গাছের ডালে বসা পাখি দেখাতেন।
আর এখন? এখন তো দেখি ছোট বাচ্চাদের হাতে মোবাইল না দিলে তারা এক লোকমা ভাতও মুখে তোলে না।
নব্বই দশকে কি এটা ছিল? তখন আমাদের বিনোদন ছিল দুপুরে মেঠো পথে আইসক্রিম ওয়ালার ঘণ্টার শব্দ।
আমরা বাচ্চারা তখন হুলুস্থুল বাধিয়ে দিতাম। পকেটে টাকা না থাকলেও চিন্তা ছিল না। বাড়ির মা-কাকীরা জমিয়ে রাখা চাল, ধান বা পুরনো লোহালক্কড় বের করে আনতাম এইগুলো দিয়ে আচার,কটকটি,বাটার বন দিত।
এক পোয়া চাল দিয়ে কাঠি আইসক্রিম বা লাল রঙের সেই বরফ-জল কেনার মধ্যে যে কী তৃপ্তি ছিল, তা এখনকার হাজার টাকার ডেজার্টেও পাবি না। মেলায় যখন কাঁচের চুড়িওয়ালা আসত, তখনও বিনিময়ের মাধ্যম ছিল শস্যদানা। ধান বা আলু দিয়ে সেই শখের জিনিসগুলো কেনা ছিল এক মস্ত বড় যুদ্ধ জয়ের মতো।”

​আদিল অবাক হয়ে বলল, “দাদু, তোমরা কি মোবাইল ছাড়া বোর হতে না? সময় কাটত কীভাবে?”
​দাদু হেসে বললেন, “আরে না রে পাগলা! বোর হওয়ার সময় কই? আমাদের সময় খেলার জিনিসের অভাব ছিল না। বিকেল হলে মাঠের দখল নিত একদল কিশোর। ফুটবল বা ক্রিকেটের সরঞ্জাম সবার ছিল না, তাই আমরা জাম্বুরা দিয়ে ফুটবল খেলতাম। বাতাবি লেবুর সেই শক্ত খোসায় লাথি মারতে মারতে সন্ধ্যা নেমে আসত। গোল্লাছুট খেলতে গিয়ে গায়ের জামা কাদা মাখামাখি হওয়া ছিল রোজকার ব্যাপার। কিন্তু আমরা যখন খোলা মাঠে ‘হাডুডু’ খেলতে নামতাম, তখন সারা গ্রামের মানুষের চিৎকারে আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত হতো। দম আটকে রেখে প্রতিপক্ষের সীমানায় ঢুকে ‘কাবাডি কাবাডি’ ডাক দেওয়ার যে রোমাঞ্চ, তা কি তোদের এই ভিডিও গেমে আছে? এক একজনকে জাপ্টে ধরার সেই শক্ত লড়াই আর মাটির সোঁদা গন্ধ আমাদের শরীর ও মনকে ইস্পাতের মতো শক্ত করে তুলত। সেই হাডুডু খেলার পাশাপাশি চলত ডাংগুলি খেলার সেই নিখুঁত লক্ষ্য আর মার্বেল নিয়ে চলত মস্ত লড়াই।”
ডাংগুলি খেলার সেই নিখুঁত লক্ষ্য আর মার্বেল নিয়ে চলত মস্ত লড়াই।
বর্ষাকালে যখন নালাগুলো জলে ভরে যেত, তখন কলার ভেলা বানিয়ে শাপলা ফুল তুলতে যাওয়া ছিল আমাদের পরম রোমাঞ্চ।
শামসুল চৌধুরী সাহেবের বলা কথাগুলো কাজিনদের মনের গহীনে এক অদ্ভুত আলোড়ন সৃষ্টি করল। আদিল আর রৌজান একে অপরের দিকে তাকাল, হয়তো তারা নিজেদের যান্ত্রিক জীবনটার কথা ভেবে কিছুটা লজ্জিতবোধ করছিল। শামসুল চৌধুরী কিছুক্ষণ নীরব থেকে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, যেন তিনি স্মৃতির পাতায় নব্বই দশকের সেই সোনালী দিনগুলোর ধুলোমাখা ছবিগুলো নতুন করে দেখছেন।
​তিনি ধীরস্থিরভাবে মাদুরটায় আরাম করে বসলেন। তাঁর কণ্ঠস্বরে এক গভীর জীবনবোধ খেলা করছিল। তিনি পুনরায় বলতে শুরু করলেন:
​”আর এখন তোরা এসি রুমে বসে শুধু আঙুল নাচাস আর ভার্চুয়াল গেম খেলিস। এতে শরীরও ঠিক থাকে না, মনও তাজা হয় না। তোদের এই চার দেয়ালের বন্দী শৈশব আমাদের সেই খোলা আকাশের নিচে কাটানো দিনগুলোর এক কনা স্বাদও দিতে পারবে না রে দাদুরা। জীবনের আসল প্রাণ তো প্রকৃতির মাঝে, যন্ত্রের ভেতরে নয়।”

​শামসুল চৌধুরী এবার আরোহী ও রোজনীর দিকে তাকিয়ে কণ্ঠস্বর কিছুটা গম্ভীর করলেন:
​”দাদুরা, একটা কথা তোদের বলি, নব্বইয়ের দশকে আমাদের চলাফেরায় একটা হায়া-শরম ছিল। এখন তো দেখি মডার্ন হওয়ার নামে পোশাক-আশাক আর চালচলনে শালীনতা দিন দিন উঠে যাচ্ছে। অথচ কুরআন আমাদের কী বলেছে শোন—আল্লাহ তায়ালা সূরা আন-নূরের ৩০ ও ৩১ নম্বর আয়াতে স্পষ্ট বলেছেন, মু’মিন পুরুষদের বলো তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে নিচু রাখে এবং লজ্জাস্থানের হেফাজত করে। আর মুমিন নারীদের বলো তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে এবং তাদের সৌন্দর্যের সেই অংশ যা সাধারণত প্রকাশ থাকে তা ছাড়া বাকিটা যেন ঢেকে রাখে। পর্দার এই বিধান মেনে চলাই হলো আসল আভিজাত্য।

​শোন দাদুরা, নব্বই দশকের সেই সময়টাতে মানুষের মনে এক অদ্ভুত পবিত্রতা ছিল। তখন পাড়ার বড় ভাই বা মুরব্বিদের দেখলে ছোটরা সম্মানে মাথা নিচু করত, আর মেয়েরা মাথায় কাপড় টেনে দিয়ে ধীর পায়ে পাশ কাটিয়ে যেত। কারো দিকে কুনজরে তাকানো তো দূরে থাক, অকারণে কারো চোখের দিকে চোখ মেলাটাকেও বড় লজ্জার বিষয় মনে করা হতো। তখনকার নব্বই দশকের নারীরা যখন ঘরের বাইরে বের হতেন, তাঁদের চলাফেরায় এক প্রকার শান্ত ও মার্জিত ভাব ফুটে উঠত। তাঁরা বুঝতেন যে, নিজের সম্মান বজায় রাখার মধ্যেই প্রকৃত স্বাধীনতা নিহিত।
​সেই সময়ে কেবল পোশাক নয়, কথা বলার ধরনেও ছিল শালীনতা। উচ্চস্বরে হাসাহাসি কিংবা রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে আড্ডা দেওয়াটা সমাজ খুব একটা ভালো চোখে দেখত না। পাড়ার প্রত্যেকটি মেয়ে ছিল সেই পাড়ার ইজ্জত। কেউ বিপদে পড়লে হাজারজন এগিয়ে আসত, কিন্তু কারো মনে কোনো কুটিলতা থাকত না। আজ এই ইন্টারনেটের যুগে তোরা যখন নিজেদের সব কিছু সবার সামনে মেলে ধরিস, তখন মনে হয়—তোরা আভিজাত্য পাচ্ছিস ঠিকই, কিন্তু সেই স্নিগ্ধ হায়া আর অন্তরের পর্দাটা বুঝি হারিয়ে ফেলছিস। নব্বইয়ের সেই দিনগুলো আমাদের শিখিয়েছিল যে, সব কিছু প্রকাশ করার মধ্যে আনন্দ নেই, কিছু জিনিস আড়ালে আর লজ্জার আবরণে রাখাই হলো আসল সৌন্দর্য।”

আমাদের তখনকার দিনে সমাজ যেমন সরল ছিল, তেমনই কিছু অলৌকিক ভয়ও ছিল আমাদের মনে। লোকে বলত নিশিরাতে বাঁশঝাড়ের ওপর দিয়ে কোনো ছায়া চলে যায়। আমবাগানে ডাল ভাঙার মটমট শব্দ হলে আমরা নিশ্চিত জানতাম ওটা কোনো জিনের কাজ। সন্ধ্যার পর বাড়ির বাইরে যাওয়া ছিল এক প্রকার বারণ, পাশে কোনো ‘বোবা ভূত’ এসে ধরে। গর্ভবতী মায়েরা সন্ধ্যার পর চুল খোলা রাখতেন না। পথে চলতে চলতে হঠাৎ বিজলি চমকালে আমরা মনে করতাম আল্লাহ আমাদের ওপর বিরাগভাজন হয়েছেন। বিড়ালের ডাক বা পেঁচার ডাককে তখন অমঙ্গল মনে করা হতো। তুকতাক আর কবিরাজি চিকিৎসার ওপর মানুষের অগাধ বিশ্বাস ছিল। যদিও এখনকার বিজ্ঞানে এসবের কোনো ভিত্তি নেই, কিন্তু সেই ভয় আর রহস্যের কুয়াশায় ঢাকা রাতগুলো ছিল বড় শিহরণ জাগানিয়া।”

অথচ এখনকার তোদের এই আধুনিক যুগে এসে সব বদলে গেছে রে দাদুরা। তোরা এখন বিজ্ঞানের দোহাই দিয়ে সবকিছু বিচার করিস, ভয় তোদের মন থেকে উবে গেছে। এখন তোদের রাতের অন্ধকারকে ভয় লাগে না, কারণ তোদের হাতে হাতে সব সময় জ্বলজ্বল করে মোবাইলের ফ্ল্যাশলাইট। তোরা এখন অশরীরী ছায়া খুঁজিস না, তোরা খুঁজিস ফোনের সিগন্যাল আর ওয়াইফাই রাউটার। তোদের কাছে এখন আমবাগানে ডাল ভাঙার শব্দের চেয়েও বড় আতঙ্ক হলো ফোনের চার্জ শেষ হয়ে যাওয়া।
​শোন দাদুরা, আমাদের সেই ভয়গুলোর পেছনেও একটা শাসন ছিল, একটা আদব ছিল। বড়দের কথা মেনে চলার একটা তাগিদ ছিল। কিন্তু আজ তোরা আধুনিকতার নামে এতটাই বেপরোয়া হয়ে গেছিস যে, খোদ স্রষ্টার হুকুমকেও তোরা পুরোনো আমলের কুসংস্কার বলে উড়িয়ে দিস। তোরা এখন ভার্চুয়াল দুনিয়ার নীল আলোয় নিজেদের চোখের ঘুম আর মনের শান্তি বিসর্জন দিয়েছিস। তোরা এখন আর জ্বিন-ভূতের ভয় পাস না ঠিকই, কিন্তু একাকিত্ব আর মানসিক অস্থিরতার যে কালো ছায়া তোদের গ্রাস করছে, তা আমাদের সেই ছোটবেলার নিশিরাতের ছায়ার চেয়েও অনেক বেশি ভয়ঙ্কর।”

শামসুল চৌধুরী কথাগুলো শেষ করে একটু উদাসীনভাবে আকাশের দিকে তাকালেন। তাঁর চোখমুখের সেই গাম্ভীর্য দেখে ছাদের পরিবেশটা মুহূর্তের জন্য কেমন নিস্তব্ধ হয়ে গেল। নাতি-নাতনিরা যেন উপলব্ধি করতে পারল দাদুর শৈশব আর তাদের আজকের যান্ত্রিক সময়ের ব্যবধানটা কত বিশাল। সেই নীরবতা ভেঙে রোজনী মুচকি হেসে দাদুর খুব কাছে সরে এল।
​সে দাদুর পাঞ্জাবির হাতা ধরে আদুরে গলায় বলল, “দাদু, দাদির সাথে তোমার বিয়ে তো প্রেমের ছিল শুনেছি। সেই সময় প্রেম করতে কীভাবে মোবাইল ছাড়া?”
​শামসুল চৌধুরী এবার হো হো করে হেসে উঠলেন। তাঁর হাসিতে যেন স্মৃতির এক ঝুলি খুলে গেল। তিনি সোজা হয়ে বসে বলতে শুরু করলেন, “আরে দাদুভাই, তোরা তো ভাবিস মোবাইল না থাকলে বুঝি দুনিয়াটাই অচল। কিন্তু আমাদের সেই সময়কার ভালোবাসা ছিল আজকের মতো সস্তা আর হুটহাট নয়। মোবাইলের মেসেজ আসার শব্দের চেয়েও পিয়নের সাইকেলের ঘণ্টার শব্দে আমাদের হৃদপিণ্ড বেশি কাঁপত রে!”

তিনি আরও বললেন, “শোন দাদুমণি, নব্বইয়ের প্রেম ছিল খুব পবিত্র আর গভীর। এখনকার মতো মিনিটে মিনিটে মেসেজ বা ভিডিও কল করার সুযোগ ছিল না। প্রেমিকের সাথে দেখা করার জন্য প্রেমিকাকে অনেক ছলচাতুরী করতে হতো। কখনো কলসি নিয়ে জল আনতে যাওয়ার ছলে নদীর ঘাটে, কখনো বা বান্ধবীর বাড়ি যাওয়ার নাম করে বাগানে অল্প সময়ের জন্য চোখাচোখি হতো। হাতে হাত ধরা তো পরের কথা, একটু পাশাপাশি হাঁটা ছিল মস্ত সাহসের কাজ। অধিকাংশ সময় শুধু দূর থেকে চাতক পাখির মতো চেয়ে থাকা আর চিঠিতে মনের কথা প্রকাশ করাই ছিল সেই সময়ের রোমান্স।
আমাদের যোগাযোগের প্রধান ভরসা ছিল ডাকবিভাগ। পিয়ন যখন নীল রঙের খাম হাতে আসত, মনে হতো আসমান থেকে কোনো নেয়ামত এসেছে। তোদের দাদিকে আমি যখন প্রথম চিঠি লিখেছিলাম, সেই চিঠিতে শুধু ভাষা ছিল না, ছিল কলিজার টান। আমি কবিদের উদ্ধৃতি দিয়ে লিখেছিলাম—
​’হৃদয়বল্লভা,
তোমার কাছ থেকে গত দুই মাস কোনো খবর না পেয়ে আমি আধমরা হয়ে আছি। প্রতি সন্ধ্যায় যখন ডাকপিয়ন পাড়া দিয়ে চলে যায় আর আমার হাতে কোনো নীল খাম পড়ে না, তখন মনে হয় জীবনটা অর্থহীন। কবির সেই লাইন আজ বারবার মনে পড়ছে—
‘হৃদয়ের এই শূন্য মরুভূমে তুমি ছিলে একবিন্দু বারি,
আজ কেন তুমি ধরা দেবে না, কেন আজ দূরে তুমি থাকবে ভারী?’

শামসুল চৌধুরী চিঠির কথা বলতে বলতে যেন কিশোর বয়সে ফিরে গেলেন। তাঁর চোখের কোণে এক চিলতে চিকচিক করা হাসি ফুটে উঠল। তিনি আবার বলতে শুরু করলেন, “শোন দাদুরা, ওই একটা চিঠির উত্তরের জন্য যে কী চাতক পাখির মতো অপেক্ষা করতে হতো, তা তোরা এই যুগের ছেলেমেয়েরা বুঝবি না। এখন তো মেসেজ পাঠালে দুই সেকেন্ডে দেখা যায় অন্যপাশে মানুষটা সেটা পড়েছে কি না। আর আমাদের সময় পিয়ন দাদাকে দেখলে বুকটা ধক করে উঠত।”
​তিনি আরও গভীরে গিয়ে বলতে লাগলেন, “তোদের দাদি যখন শেষমেশ উত্তর পাঠাল, সেই চিঠিখানা ছিল এক অমূল্য সম্পদ। তোরা কি জানিস, আগের দিনের চিঠির পাতায় শুধু লেখা থাকত না, থাকত এক অদ্ভুত সুবাস? তোদের দাদি চিঠির খামের ভেতর একটা শুকনো বকুল ফুল আর একটুখানি সুগন্ধি মাখিয়ে দিয়েছিল। সেই খামটা হাতে পাওয়া মানে ছিল সাক্ষাৎ বেহেশত পাওয়ার মতো আনন্দ।”
​এরপর শামসুল চৌধুরী তাঁর স্মৃতির পাতা থেকে তখনকার দিনের একটি চিঠির অবিকল বয়ান দিলেন:
​”চিরঞ্জীবাসু,
​পরম করুণাময় আল্লাহর অশেষ রহমতে আশা করি কুশলে আছো। তোমার প্রেরিত পত্রখানি গত পরশু হাতে পাইয়াছি। পত্র পাঠ করিয়া আমার হৃদয়ের কী দশা হইয়াছিল, তাহা এই সামান্য কাগজে লিখিয়া প্রকাশ করার সাধ্য আমার নাই। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর তোমার হস্তাক্ষর দেখিয়া নয়ন সার্থক হইলো।
​তুমি লিখিয়াছ— কেন আমি দূরে সরিয়া রহিয়াছি? বিশ্বাস করো, সমাজ আর পরিবারের কড়া শাসনের প্রাচীর ডিঙাইয়া উত্তর দেওয়া আমার পক্ষে কতটা কঠিন ছিল। প্রতিবার ডাকপিয়নের সাইকেলের শব্দ শুনিলে মনে হইত আমার হৃৎস্পন্দন থামিয়া যাইবে। পাশে আব্বা কিংবা বড় ভাইয়া টের পাইয়া যান, সেই ভয়ে সিঁটকে থাকিতাম।
​তুমি ব্যাকুল হইয়ো না। কবির সেই কথাটি মনে রাখিও—
‘সহে যে জন, রহে সে জন’।
আমাদের এই ধৈর্য আর অপেক্ষা নিশ্চয়ই বৃথা যাইবে না। ইনশাআল্লাহ, সামনের হাটের দিন বিকেলে যদি সম্ভব হয়, ছোট কাকার সাথে ঘাটে আসিব। দূর হইতে এক পলক দেখিলে আমার মরুভূমি সদৃশ হৃদয়ে শ্রাবণের ধারা নামিবে।
​ইতি—
তোমার পথ চাওয়া সেই অভাগী।”

​চিঠির কথা শেষ করে শামসুল চৌধুরী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তিনি নাতি-নাতনিদের দিকে তাকিয়ে বললেন, “দেখলি তো দাদুরা? সেই চিঠির প্রতিটা শব্দে কী মায়া আর অপেক্ষা ছিল! তোরা এখন ফোনের বাটনে ‘আই লাভ ইউ’ লিখে পাঠিয়ে দিস, কিন্তু আমরা একটা চিঠির অপেক্ষায় পুরো একটা মাস পার করে দিতাম। সেই ধৈর্যের কারণেই আমাদের মহব্বত আজও মরচে পড়েনি।”

​তোদের দাদিকে আমি এক বিকেলে নদীর পাড়ে বসে কথা বলার প্রস্তাব দিয়েছিলাম। এক পুরনো বটগাছের নিচে আমরা বসেছিলাম, কিন্তু মাঝখানে ছিল অন্তত তিন ফুটের ফারাক। সেই দূরত্বে যে মর্যাদা আর সম্মান ছিল, এখনকার এই মোবাইলের সস্তা ভালোবাসায় তা পাবি না। আমি তাঁর দিকে তাকিয়ে বলতাম—
‘তোমার ঐ চাউনি যেন ভোরের শিশিরভেজা ঘাস,
‘তোমার ঐ হাসি যেন শরতের মেঘমুক্ত আকাশ।’
​শেষে দুই পরিবারের সম্মতিতে আমাদের আকদ হয়। কুরআনে আল্লাহ বলেছেন—’ওয়া আনকিহুল আইয়ামা মিনকুম’, অর্থাৎ তোমাদের মধ্যে যারা বিবাহহীন তাদের বিয়ে দাও।

তখন চায়ের কাপ নিয়ে রৌজানের মা যখন ছাদের দরজায় দাঁড়ালেন, দেখলেন রৌজান, আদিল আর আরোহী মন্ত্রমুগ্ধের মতো দাদুর কথা শুনছে। রৌজানের মা চায়ের কাপ রেখে চলে আসেন।

শামসুল চৌধুরী তার কথা বলতে লাগলেনঃ-
আমরা আল্লাহর হুকুম মেনেই সংসার শুরু করেছিলাম, তাই তো আজ এত বছর পরেও মহব্বত টিকে আছে।”

​শামসুল চৌধুরী চায়ে একটা চুমুক দিয়ে বললেন, “এখনকার দুনিয়াটা এই চ্যাপ্টা মোবাইল ফোনের স্ক্রিনে আটকে গেছে রে। তোরা পাশের মানুষটার চোখের দিকে তাকাস না, তাকাস মোবাইলের কাঁচের দিকে। নব্বইয়ের দশকে সূর্যাস্তের পর যখন অন্ধকার ঘন হয়ে আসত, তখন গ্রামে রাজত্ব শুরু হতো হারিকেন আর কুপি বাতির। হারিকেনের কাঁচ ঘষে পরিষ্কার করা ছিল আমাদের রোজকার ডিউটি। কেরোসিন তেলের সেই কড়া গন্ধ আর হালকা হলদে আলোয় বসে যখন জোরে জোরে নামতা পড়তাম, তখন নিস্তব্ধ পাড়া সেই শব্দে গমগম করত। শিক্ষকেরা বাড়িতে এসে যখন পড়াতেন, তাঁদের বেতের শব্দে আমাদের কলিজা কাঁপত। গুরুভক্তি তখন শুধু মুখে ছিল না, ছিল অন্তরের শ্রদ্ধা।

​সপ্তাহে সেই একটা দিন ছিল আমাদের জন্য ঈদের মতো—শুক্রবার। বিকেলে টিভিতে যখন সিনেমা শুরু হতো, সারা পাড়া যেন আমাদের ড্রয়িং রুমে উপচে পড়ত। ‘আলিফ লায়লা’র সিন্দাবাদ বা জাদুর কুপি দেখার সময় মনে হতো বাস্তবেই বোধহয় এসব ঘটছে। আর নবান্নের সময় যখন নতুন ধান উঠত, সারা গ্রাম পিঠা-পুলির গন্ধে ম ম করত। ঢেঁকিতে ধান ভানার সেই ছন্দময় শব্দ এখন তোরা পাবি শুধু ইউটিউবে। তিল আর গুড় দিয়ে নাড়ু তৈরি করা আর শীতের সকালে রোদে বসে টাটকা খেজুরের রস খাওয়ার যে আনন্দ, তা কি তোদের এই প্যাকেটজাত খাবারে আছে?”

​শামসুল চৌধুরী নাতি-নাতনিদের মাথায় হাত রেখে শেষে বললেন:-
​”দাদুরা আমার, মোবাইল ব্যবহার করো কিন্তু মানুষের হক নষ্ট করে নয়। আল্লাহ আমাদের যে মহামূল্যবান জীবন দিয়েছেন তা শুধু স্ক্রিনের পেছনে আঙুল ঘষে নষ্ট করার জন্য নয়। নব্বইয়ের দশক আমাদের শিখিয়েছে অভাবের মাঝেও কীভাবে বুক চিরে হাসতে হয়। মানুষ মানুষকে তখন অন্ধের মতো বিশ্বাস করত, একে অপরের বিপদে জান-মাল নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ত। তোরা এই আধুনিক যুগে থেকেও সেই পুরনো মায়াটা হৃদয়ে ধরে রাখিস। বড়দের সম্মান দিস, আর ছোটদের মায়া করিস—এটাই হলো আসল শিক্ষা।”
​তিনি একটু থেমে আকাশের দিকে তাকিয়ে ধীরস্থির কণ্ঠে বললেন, “শোন দাদুরা, একজন ভালো মানুষ হওয়া আর আল্লাহর প্রিয় বান্দা হওয়া খুব বেশি কঠিন কাজ নয়। শুধু নিয়তটা পরিষ্কার রাখা চাই। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনের সূরা আল-আসর-এ বলেছেন:
​’ইল্লাল্লাজিনা আমানু ওয়া আমিলুস সালিহাতি ওয়া তাওয়াসাউ বিল হাক্কি ওয়া তাওয়াসাউ বিস সাবর।’
(অর্থ: কিন্তু তারা ব্যতীত, যারা ঈমান এনেছে ও সৎকর্ম করেছে এবং পরস্পরকে সত্যের উপদেশ দিয়েছে ও ধৈর্যের উপদেশ দিয়েছে।)
​তাই তোদের কাছে আমার এই শেষ অনুরোধ—সামনের এই সপ্তাহটা তোরা একটু অন্যভাবে কাটিয়ে দেখ। এই ডিজিটাল নেশা থেকে বেরিয়ে এসে নিজেকে চেনার চেষ্টা কর। তোরা এই সপ্তাহে অন্তত মোবাইল ফোনটা খুব কম ব্যবহার করবি, প্রয়োজন ছাড়া ওটার দিকে তাকাবিও না। তার বদলে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজটা জামাতের সাথে আদায়ের চেষ্টা করবি। প্রতিদিন ফজরের পর অন্তত এক পারা করে কুরআন তিলাওয়াত করবি, দেখবি মনের ভেতর কেমন প্রশান্তি নেমে আসে। আর যদি সম্ভব হয়, এই সপ্তাহে কয়েকটা নফল রোজা রাখিস; এতে শরীরের সাথে সাথে মনেরও পবিত্রতা আসে।
​দাদুরা, জীবনটা খুব ছোট। স্ক্রিনের ভেতরে নীল আলোয় জীবন নষ্ট না করে সৎ কাজ আর ইবাদতে মন দে। মনে রাখিস, কিয়ামতের ময়দানে প্রতিটি সেকেন্ডের হিসাব দিতে হবে। তোরা যদি আজ থেকে নামাজের পাটি আর কুরআনের সাথে বন্ধুত্ব করিস, তবেই তোরা দুনিয়া ও আখিরাত—উভয় জায়গাতেই সফল হতে পারবি। এটাই একজন প্রকৃত ভালো মানুষ হওয়ার পথ।”

শামসুল চৌধুরীর সেই মায়াভরা শাসন আর আধ্যাত্মিক নসিহত শোনার পর ছাদের ওপর এক গভীর নিস্তব্ধতা নেমে এলো। কিছুক্ষণ আগে যারা মোবাইলের টুংটাং শব্দে অভ্যস্ত ছিল, তারা এখন ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর দাদুর নিঃশ্বাসের শব্দ শুনতে পাচ্ছিল। দাদুর বলা নব্বই দশকের সেই সরলতা আর আল্লাহর হুকুমের কথাগুলো তাদের অন্তরের মূলে গিয়ে আঘাত করল।

​রৌজান, যে কি না মোবাইল ছাড়া এক মুহূর্ত থাকতে পারত না, সে সবার আগে দাদুর পায়ের কাছে হাঁটু গেঁড়ে বসল। দাদুর বলিষ্ঠ হাত দুটো নিজের হাতে নিয়ে নিচু স্বরে বলল, “দাদু, আমাদের মাফ করে দিও। আমরা তো ভুলেই গিয়েছিলাম যে পাশের মানুষটার চোখের দিকে তাকিয়ে হাসার নামই আসল জীবন। তুমি আজ আমাদের চোখ খুলে দিলে। আমি কথা দিচ্ছি দাদু, আজ থেকে খাবারের টেবিলে আর কখনও মোবাইল আমার হাতে দেখবে না। আর ওই পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আর কুরআন তিলাওয়াতের যে রুটিন তুমি দিলে, ইনশাআল্লাহ কাল ফজর থেকেই আমি সেটা শুরু করব।”

​আরোহী, যে সবসময় আধুনিক ফ্যাশন আর সোশ্যাল মিডিয়া নিয়ে মেতে থাকত, তার চোখেও তখন জল চিকচিক করছে। সে ওড়না দিয়ে চোখ মুছে বলল, “দাদু, আমরা ভাবতাম পর্দা মানে পিছিয়ে যাওয়া, আর আধুনিকতা মানেই সব কিছু খোলামেলা করা। কিন্তু তোমার মুখে কুরআন আর নব্বই দশকের সেই শ্লীলতার কথা শুনে বুঝলাম—আসল সম্মান তো নিজেকে আড়ালে রাখার মধ্যেই। আমি আজ থেকে নিজেকে বদলানোর চেষ্টা করব। এই একটা সপ্তাহ আমি ফোনটাকে শুধু একটা যন্ত্র হিসেবেই ব্যবহার করব, নেশা হিসেবে নয়।”

​আদিল পাশ থেকে দাদুর কাঁধে হাত রেখে দৃঢ় কণ্ঠে বলল, “দাদু, তোমার সেই হাডুডু খেলার আর চাউল দিয়ে আইসক্রিম খাওয়ার গল্প শুনে মনে হচ্ছে আমরা অনেক কিছু মিস করছি। আমরা তো মাঠের ধুলোবালি চিনিই না। আমরা কাল থেকেই এই গ্রামের বন্ধুদের সাথে মাঠে নামব। আর তুমি ভেবো না দাদু, আমরা শুধু এই এক সপ্তাহ নয়, তোমার শেখানো এই আমলগুলো সারাজীবন বয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করব। তুমি আমাদের জন্য দোয়া করো যেন আমরা তোমার মতো একজন খাঁটি ঈমানদার মানুষ হতে পারি।”

​সবশেষে ছোট রোজনী দাদুর কোলে মাথা রেখে বলল, “দাদু, দাদির সেই চিঠির গল্পটা আমার খুব ভালো লেগেছে। এখন বুঝলাম কেন তোমরা এখনো একে অপরকে এত ভালোবাসো। মোবাইলের মেসেজে তো সেই বকুল ফুলের গন্ধ পাওয়া যায় না! আমি তোমার কথাগুলো ডায়েরিতে লিখে রাখব দাদু।”

​নাতি-নাতনিদের এই পরিবর্তন আর সুন্দর কথা শুনে শামসুল চৌধুরীর বুকটা গর্বে ভরে উঠল। তিনি তাদের সবাইকে জড়িয়ে ধরে ধরা গলায় বললেন, “আল্লাহ তোদের কবুল করুক দাদুরা। মনে রাখিস, দুনিয়ার এই চকমকে আলো একদিন নিভে যাবে, কিন্তু আমলনামার আলো তোদের কবর পর্যন্ত উজ্জ্বল রাখবে।”
​আজ রাতের এই আড্ডা কেবল গল্প ছিল না, এটা ছিল এক প্রজন্মের সাথে আরেক প্রজন্মের হৃদয়ের বন্ধন তৈরি করার এক পবিত্র মুহূর্ত।

তিনি বুঝলেন, শেকড়ের টানে আজও নতুন প্রজন্ম শিহরিত হয়, কেবল সেই হৃদয়ের গল্প বলার মতো একজন মানুষ প্রয়োজন।

খাবার আল্লাহর নেয়ামত,তাই আহারের সময় যান্ত্রিকতা ভুলে একাগ্রতা ও শুকরিয়া বজায় রাখা।

পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত এবং সূরা আল-আসর-এর শিক্ষা (ঈমান ও নেক আমল) জীবনে ধারণ করা।

আধুনিকতার নামে বেহায়াপনা নয়, বরং দৃষ্টির সংযম ও পর্দার বিধান মানাই প্রকৃত আভিজাত্য।

প্রযুক্তির নেশা কমিয়ে পরিবারের মানুষকে সময় দেওয়া এবং পারস্পরিক মায়া-মহব্বত অটুট রাখা।

যন্ত্রের দাস না হয়ে শরীর ও মনের সুস্থতায় প্রকৃতির সান্নিধ্য ও সৎ কাজে সময় ব্যয় করা।

লেখিকাত মতামত : প্রযুক্তির পরিমিত ব্যবহার এবং ধর্মীয় অনুশাসনই একজন মানুষকে আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *