পরাশক্তির রাজনীতিতে মহাকাশ: চাঁদ, মঙ্গল ও স্যাটেলাইটের নতুন প্রতিযোগিতা

রাখি আক্তার: একসময় মহাকাশ ছিল মানবজাতির কৌতূহলের এক অনন্ত ক্ষেত্র। রাত নামলেই খোলা আকাশে অজস্র তারা, উজ্জ্বল চাঁদ ইত্যাদির রহস্য উন্মোচনে বহু গবেষক অগণিত সময় ব্যয় করেছেন। প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ ও বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের মাধ্যমে বর্তমান বিশ্ব হতে শুরু করে মহাকাশ, সব কিছুই মানুষ নিয়ন্ত্রিত বলা যায়। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে এসে মহাকাশ পরিণত হয়েছে ক্ষমতা, সম্পদ ও আধিপত্যের এক নতুন মঞ্চে। যেখানে মহাকাশ দখল যেন এক নতুন প্রতিযোগিতার রূপ নিয়েছে। এ প্রতিযোগিতা শুধু দুটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বিভিন্ন দেশের মধ্যে, যেমন যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া, ভারতসহ একাধিক রাষ্ট্র এবং শক্তিশালী বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানও এই দৌড়ে নেমেছে।

ষাট ও সত্তর-এর দশকে রাজনৈতিক শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়ে Cold War বা স্নায়ুযুদ্ধ পরিচালিত হতো যা ছিল বৃহৎ দুটি পরাশক্তির মধ্যে। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে বিশ্ব স্যাটেলাইট নির্ভর এবং মহাকাশ অর্থনীতির দিকে ক্রমাগত উন্নত হচ্ছে, ফলে মহাকাশ দখল ও বিশ্বে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা ও বৃহৎ পরাশক্তির রাষ্ট্রসমূহ তাদের অর্থনীতির বিরাট এক অংশ ব্যয় করছে মহাকাশের বিভিন্ন গবেষণায়।

এখন প্রশ্ন আসতে পারে কেন বিশ্বের শক্তিধর রাষ্ট্রসমূহ এই ক্ষেত্রকে এত গুরুত্ব সহকারে দেখছে এবং বিনিয়োগ করছে? মূলত বিশ্ব অর্থনীতি, ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার এবং সমগ্র বিশ্বে নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করাই এর প্রধান লক্ষ। অন্যান্য দেশ হতে নিজ দেশের ক্ষমতা প্রকাশ ও স্যাটেলাইটের মাধ্যমে বিশ্ব নিয়ন্ত্রণ করাই এর মূল লক্ষ। মহাকাশ দখলে প্রথম হওয়া মানেই হলো বৈশ্বিক মঞ্চে প্রথম হওয়া এবং প্রযুক্তিগত এবং সামরিকভাবে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ দেওয়া। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়ার মতো দেশগুলো মহাকাশে নিজেদের প্রভাব বজায় রেখে চলেছে। এর মাধ্যমে কেবল প্রযুক্তির দিক দিয়ে তারা এগিয়ে যাচ্ছে না বরং ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধিতেও অবদান রেখে চলেছে।

বিজ্ঞানীদের মতে চাঁদ ও বিভিন্ন গ্রহাণুতে মূল্যবান ধাতু, হিলিয়াম-৩ এবং পানির মতো বিশাল খনিজ সম্পদের উৎস রয়েছে। ভবিষ্যতে এগুলো পারমাণবিক ফিউশন শক্তি হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে উক্ত সম্পদের ভাণ্ডার যে রাষ্ট্র নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনতে পারবে তারাই ভবিষ্যৎ জ্বালানির বাজারে নেতৃত্ব দিতে পারবে। এছাড়া মহাকাশ দখলের প্রতিযোগিতার অন্যতম এক কারণ মহাকাশ নির্ভর বিভিন্ন অর্থনীতির বিস্তার।

স্যাটেলাইট যোগাযোগ, জিপিএস, আবহাওয়া পূর্বাভাস, টেলিভিশন সম্প্রচার, ইন্টারনেট ইত্যাদি সবকিছুই এখন মহাকাশ নির্ভর। মহাকাশভিত্তিক শিল্পের বাজার দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে যা ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই পরাশক্তিধর রাষ্ট্রগুলো এটিকে ভবিষ্যতের লাভজনক অর্থনৈতিক ক্ষেত্র হিসেবে দেখছে। জাতীয় নিরাপত্তা ও নজরদারি বাড়াতে মহাকাশের বিভিন্ন স্যাটেলাইট উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে। আধুনিক যুদ্ধ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, সীমান্ত পর্যবেক্ষণ, ক্ষেপণাস্ত্র সতর্কীকরণ—সবকিছুতেই স্যাটেলাইট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। রাষ্ট্রের সামরিক ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় মহাকাশের ভূমিকা অপরিসীম।

নিখুঁতভাবে মিসাইল ছোড়া, শত্রুপক্ষের ওপর নজরদারি এবং নিরাপদ যোগাযোগ ব্যবস্থার জন্য মহাকাশে আধিপত্য থাকা জরুরি। মহাকাশ গবেষণার পথ সুগম হওয়ার ফলে একটি দেশের সামগ্রিক প্রযুক্তিগত সক্ষমতা অনেকাংশে বাড়ে, নতুন প্রযুক্তির বিকাশ ঘটে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উন্নয়ন ঘটে। এর ফলে একটি দেশের জাতীয় মর্যাদাই কেবল বৃদ্ধি পায় না বরং বিশ্বমঞ্চে তাকে উন্নত ও শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। এটি রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারেও সহায়ক হয়। যেমন, সাম্প্রতিক সময়ে নাসা চাঁদে স্থায়ী ঘাঁটি স্থাপনের পরিকল্পনা করছে যা মহাকাশ গবেষণার ক্ষেত্রকে আরও প্রসারিত করতে সক্ষম হবে। চীন কর্তৃক পরিচালিত China National Space Administration চাঁদের অন্ধকার অংশে বিভিন্ন মিশন পরিচালনা করে গবেষণা কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা করছে। এছাড়া বেসরকারি কোম্পানি যেমন SpaceX, Blue Origin মহাকাশে রকেট, স্টারশিপ প্রকল্প, মহাকাশ পর্যটন ও চাঁদে অবকাঠামো তৈরির পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন সম্ভব করেছে। মহাকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়া নজরদারি বৃদ্ধি, অ্যান্টি-স্যাটেলাইট অস্ত্র পরীক্ষিত হয়েছে। এসকল বিষয় বিশ্লেষণে দেখা যায় মহাকাশ এখন কেবল কল্পনা বা গবেষণার ক্ষেত্র নয় বরং বাস্তব ভূরাজনীতি ও সামরিক কৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

ভবিষ্যতে যদি একক কোনো রাষ্ট্র মহাকাশে প্রভাব বিস্তারে সফল হয় তবে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়তে পারে এমনকি নতুন ধরনের স্নায়ুযুদ্ধের জন্ম দিতে পারে এজন্য মহাকাশকে শান্তিপূর্ণ ও মানবকল্যাণে ব্যবহারের জন্য আন্তর্জাতিক আইন ও চুক্তি করা এবং বিভিন্ন সংস্থার এক্ষেত্রে নজরদারি বৃদ্ধি করা জরুরি। বিশ্বে এখন যুদ্ধ দুটি দেশের মাঝেই সীমাবদ্ধ নয় বরং বিশ্বের গণ্ডি পেরিয়ে মহাকাশ যুদ্ধেও বিভিন্ন লড়াই ছড়িয়ে পড়েছে। এই যুদ্ধে যে এগিয়ে থাকবে তার হাতেই থাকবে প্রযুক্তি, অর্থনীতি ও বিশ্বে কৌশলগত নেতৃত্বের চাবিকাঠি।

লেখিকা : শিক্ষার্থী, ইডেন মহিলা কলেজ, ঢাকা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *