শরীফুল ইসলাম : মিষ্টি জাতীয় খাদ্য হিসেবে হাওয়াই মিঠাই পরিচিত। এটি মুখে দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে সহজেই মিলে যায় বলে এর নাম রাখা হয়েছে ‘হাওয়াই মিঠাই’। কাঠির মাথায় যেন এক টুকরো গোলাপি কিংবা সাদা রঙের মেঘ। কোথাও বেড়াতে গেলে প্রায় সব ছোটরা এমন কী বড়রাও এই কাঠির মাথায় এক টুকরো মেঘ খাওয়ার জন্য ব্যস্ত হয়ে ওঠে। অনেকে মজা করে হাওয়াই মিঠাইকে বুড়ির মাথার পাকা চুলও বলেন। বাংলাতে যেমন অনেকগুলো নাম এই খাবারটির, তেমনি ইংরেজিতেও এর অনেক নাম, যেমন: কটন ক্যান্ডি, ফেয়ারি ফ্লস, ক্যান্ডি ফ্লস কিংবা স্পুন সুগার।
চৌদ্দশতকে ইটালিতে চিনি দিয়ে তৈরি এই মজার খাবারটি প্রচলন শুরু হয়। সেই সময় ঘরোয়া ভাবেই সামান্য চিনির ঘন রস বিশেষ পদ্ধতিতে সুতোর মতো তৈরি করে বানানো হত হাওয়াই মিঠাই। আঠারো শতক পর্যন্ত এইভাবে তৈরি হয়েছে।
১৮৯৭সালে মার্কিন উইলিয়ম মরিসন ও জন সি. ওয়ারটন হাওয়াই মিঠাই তৈরির জন্য প্রথম মেশিন আবিষ্কার করেন। এই মেশিনের সাহায্যে চিনির যে সুতো তৈরি হতে লাগল সেগুলো আরো সূক্ষ্ম আর বাতাস লাগার সঙ্গে সঙ্গেই শক্ত হয়ে যাওয়ার ফলে তাড়াতাড়ি খাবারটা তৈরি হয়ে যেতে লাগল। তবে মেশিনে তৈরি হাওয়াই মিঠাই তখন তেমন জনপ্রিয়তা পায়নি। ব্যাপকভাবে এর প্রসার বৃদ্ধি পায় ১৯০৪ সালে। সে বছর মরিসন এবং ওয়ারটন তাদের মেশিনে তৈরি হাওয়াই মিঠাই নিয়ে হাজির হলেন সেন্ট লুইসের বিশ্ব মেলায়। অবাক হওয়ার বিষয়, মেলার প্রথম দিনই ২৫ সেন্ট করে ৬৮ হাজার ৬৫৫ বাক্স হাওয়াই মিঠাই বিক্রি হয়েছিল, যা ছিল সে সময়ের হিসাবে অনেক বড় একটা অন্ত! ক্রমেই বিশ্বজুড়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায় খাবারটি। চাহিদা ও জনপ্রিয়তার জন্য একাধিক কোম্পানি এগিয়ে এলো এই মজাদার খাবারটি উৎপাদন ও বিপণনে। টটসি রোল অফ কানাডা লি. বিশ্বের সর্বাধিক হাওয়াই মিঠাই উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান।
হাওয়ার মিঠাই দেখতে অনেকটা তুলার মতো বলে ১৯২০ সালে মার্কিনরা এই মিঠায়ের নাম দিয়েছে ‘কটন ক্যান্ডি’। তারা এই হাওয়াই মিঠায়ের এতই ভক্ত যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ৭ ডিসেম্বর দিনটি ‘জাতীয় কটন ক্যান্ডি ডে’ হিসেবে পালন করা হয়।
ইউরোপ-আমেরিকা জয় করে আমাদের এখানে হাওয়াই মিঠাই তৈরি শুরু হয় এমন কথা বলা যায় না। কারণ চিনি দিয়ে তৈরি শোনপাপড়ি বহুকাল আগেই এখানে তৈরি হত। উন্নত বিশ্বের মতো আমাদের দেশে
অবশ্য আজও সেভাবে হাওয়াই মিঠাই উৎপাদন এবং সুন্দর প্যাকেজিং করে বিপণন হয় না। মেলা, বেড়ানোর জায়গা কিংবা রাস্তার ফেরিওয়ালারাই বিক্রি করে হাওয়াই মিঠাই।
শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে সব বয়সী মানুষের কাছে লাল হাওয়াই মিঠাই এক পরিচিত নাম। উজ্জ্বল রং ও মিষ্টি স্বাদের কারণে এটি সহজেই আকর্ষণ সৃষ্টি করে। কিন্তু এই আকর্ষণের আড়ালেই লুকিয়ে আছে নীরব এক স্বাস্থ্যঝুঁকি, যা আমরা প্রায়ই অবহেলা করে থাকি।
বাজারে প্রচলিত অধিকাংশ লাল হাওয়াই মিঠাইয়ে ব্যবহার করা হয় অতিরিক্ত চিনি ও কৃত্রিম রং। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব কৃত্রিম রং অনেক ক্ষেত্রে মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর। দীর্ঘদিন নিয়মিত গ্রহণ করলে লিভার ও পাকস্থলীর ওপর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। শিশুদের ক্ষেত্রে এই ক্ষতির মাত্রা আরো ভয়াবহ অ্যালার্জি, হজমের সমস্যা, ক্যান্সার, এমনকি আচরণগত জটিলতাও দেখা দিতে পারে।
আরেকটি বড় উদ্বেগের বিষয় স্বাস্থ্যবিধির অভাব।
মিঠাই অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে তৈরি এসব খোলা অবস্থায় বিক্রি করা হয়। এতে জীবাণু সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যায়, যা ডায়রিয়া ও ফুড পয়জনিংয়ের কারণ হতে পারে। অথচ ভোক্তা হিসেবে আমরা দাম ও স্বাদের দিকে নজর দিলেও গুণগত মান ও নিরাপত্তা নিয়ে খুব কমই ভাবি।
প্রশ্ন হলো- এই দায়িত্ব কার? একদিকে যেমন উৎপাদন ও বিক্রির ক্ষেত্রে যথাযথ তদারকির অভাব রয়েছে, অন্যদিকে ভোক্তাদের মধ্যেও সচেতনতার ঘাটতি স্পষ্ট। খাদ্যে ক্ষতিকর রং ও উপাদান ব্যবহার রোধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কঠোর নজরদারি জরুরি। একই সঙ্গে অভিভাবকদেরও সচেতন হতে হবে, যেন শিশুদের হাতে নির্বিচারে এসব রঙিন মিঠাই তুলে না দেয়া হয়।
২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে হাওয়াই মিঠাই ভারতে নিষিদ্ধ হয়েছে। বলা হচ্ছে, এতে ক্যানসারের ঝুঁকি রয়েছে। হাওয়াই মিঠাই নমুনা পরীক্ষা করে ক্যানসারের ঝুঁকি তৈরি করে এমন রাসায়নিক পাওয়া যায়।
ইতোমধ্যে ভারতের তামিলনাড়ু প্রদেশে হাওয়া মিঠাই বিক্রি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। একই সঙ্গে অন্যান্য অঞ্চলেও এটির নমুনা পরীক্ষা শুরু হয়েছে।
দেশটির সংবাদ মাধ্যম বলছে, হাওয়াই মিঠাই যারা বিক্রি করছে, তারাই এটি তৈরি করছে। যাদের এ খাবারটি তৈরির কোনো অনুমোদিত কারাখানা নেই। মূলত, খাবারটিকে আরো গোলাপি রঙের করে তুলতে এক ধরণের কেমিক্যালযুক্ত রোডামিন-বি ব্যবহার করা করা হয়। এই রঙটি সাধারণত কাপড়, প্রসাধনী এবং কালির রং হিসেবে ব্যবহৃত হয়। খাবারে এ রং ব্যবহারের ফলে স্বাস্থ্য ঝুঁকি বাড়ার সম্ভাবনা থাকে। এটি ক্যানসার থেকে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-পতঙ্গকে আক্রমণ করে।
রোডামিন-বি কোনো খাবারের প্যাকেজিং, রপ্তানি, বিক্রি করা, বা রোডামিন-বি যুক্ত খাবার বিয়ে অথবা অন্যান্য অনুষ্ঠানে সরবরাহ করা ফুড সেফটি অ্যান্ড স্ট্যান্ডার্ডস অ্যাক্ট, ২০০৬ এর আওতায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। স্কুলের সামনে, পার্ক ও ঘোরাঘুরির জায়গাগুলোতে হাওয়াই মিঠাই বিক্রি করতে দেখা যায়। শিশুদের কাছে আকর্ষণীয় গোলাপি রঙের এই মিষ্টিজাতীয় খাবারে ক্যানসারের উপাদান থাকছে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে।
ভারতে নিষিদ্ধ হলেও বাংলাদেশে এখনো কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। প্রতিনিয়ত দেশের বিভিন্ন জায়গায় হাওয়াই মিঠাই বিক্রি হচ্ছে হর-হামেশা। গ্রামাঞ্চলে হাওয়াই মিঠাই কিছুটা কম বিক্রি হলেও শহরাঞ্চলে এর প্রাদুর্ভাব অঞ্চলের অত্যন্ত বেশি। বিশেষত রাজধানীর রেলওয়ে, বাসস্ট্যান্ড, সদরঘাট, বিমানবন্দর, নিউমার্কেট, আগারগাঁও ও গুলিস্থানসহ দেশের বিভিন্ন পার্কে বিক্রি করতে দেখা যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, হাওয়াই মিঠাই বন্ধ না হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ভয়াবহ বিপদের সম্মুখীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। লাল হাওয়াই মিঠাই হয়তো সাময়িক আনন্দ দেয়, কিন্তু তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব হতে পারে মারাত্মক। তাই সময় এসেছে স্বাদের চেয়ে স্বাস্থ্যকে অগ্রাধিকার দেয়ার। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা শুধু রাষ্ট্রের নয়, আমাদের সবার সম্মিলিত দায়িত্ব। প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি, হাওয়াই মিঠাই বন্ধে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া উচিত।
লেখক : শিক্ষার্থী, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা কলেজ।





















