সময়- ১০ আগস্ট সিঙ্গাপুরের জাতীয় দিবস অর্থাৎ জাতিসত্তাকে তুলে ধরারদিন পালিত হয়। জাতীয় দিবস উপলক্ষে শনিবার ছুটি রবিবার এখানের সাপ্তাহিক ছুটির দিন, সব মিলিয়ে লম্বা দু’দিনের ছুটি।

প্ল্যান করলাম শনিবার দুপুরে ঘুরতে বের হবো সারারাত আড্ডা দিব রবিবার সকালে রুমে ফিরব৷
কথা অনুযায়ী পিপারেশন নিয়ে আসিক ও সজিব ভাইয়ের সাথে বেরিয়ে পড়লাম একসাথে দুপুরের খাবার খেলাম আড্ডা হলো অনেক গল্প হলো। পরবর্তী পরিকল্পনা সন্ধ্যায় মেরিনা যাবো সারারাত আড্ডা দিব। মেট্রোতে উঠলাম কিছু স্টোপেস যাওয়ার পর অপরিচিত একজন আমার নাম ধরে ডাকলেন এবং বসতে বললেন। তার পাশের সিটে বসলাম। কাজের সুবাদে তার সাথে পরিচয়। নাম মিস.ফিউ’লে সেও সিঙ্গাপুরে চাকরি করেন। বয়স ৩৫ কিংবা ৪০ সম্ভবত মালেশিয়ান কিংবা ভিন্ন কোন দেশের নাগরিক। তার হাসব্রেন্ডও এখানে থাকেন। তাকে আমি দিদি ডাকি।

সজীব ও আসিক আমার মুখের দিকে হা হয়ে তাকিয়ে আছে! তারাফিসফিস করে কি যেন বলছে। মিস.ফিউ’লে আমাকে বললেন ওরা কারা? বললাম, আমার ফ্রেন্ড। সে জানতে চাইলেন তারাও-কি বাংলাদেশী। উত্তর দিলাম, হ্যাঁ। আমার পাশে একজন ইন্ডিয়ান তামিল ছেলে বসে আছেন।মিস.ফিউ’লে জানতে চাইলেন সেও কি বাংলাদেশী? বললাম, না সে ইন্ডিয়ান। টুকটাক তার সাথে কথা হচ্ছে কি করছি কোথায় যাচ্ছি দিনকাল কেমন চলছে ইত্যাদি। হুট করে মিস.ফিউ’লে বলে উঠলেন, আচ্ছা তোমাদের বাংলাদেশের মানুষ কালো হয় কেন? তাকে বললাম, এটা সম্ভবত ভৌগলিক এবং জাতিগোষ্ঠীয় কারণ আমরা মুসলিম। মুসলিম জাতি কালো এবং সাদা সব ধরনের আছে। যেমন আমি কালো অন্যরা সাদা। তোমাদের জাতিগোষ্ঠী সম্ভবত সাদা এর জন্য তোমরা কালো নও। সে আমার দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারলেন এ কথা শুনে আমার মন একটু খারাপ হয়েছে। সে আমার মন ভালো করার জন্য তার হাত আমার হাতের কাছে এনে বললেন দেখো আমিও কালো। আমি হাসলাম দিদিও হাসলেন।

তাকে বললাম, বাংলাদেশের ভৌগলিক অবস্থান এমন যে এখানে সূর্যের আলো প্রখর থাকে এবং বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষের সংমিশ্রণও গায়ের রঙের তারতম্যের একটি কারণ।

তাকে আমি বললাম, তোমরা সুন্দর তা হলে খোলামেলা ভাবে চলাফেরা করো কেন? ভালো ভাবে পোশাক কেন পরো না?
সে একটু লজ্জা পেল এবং বুঝালো, তাদের দেশের কালচার এবং ধর্মে পোশাক নিয়ে কোন দায়বদ্ধতা নেই।

আমার কথায় দিদির মন একটু বিমর্ষ হলো। তাকে আমার প্যান্টের দিকে দেখালাম দেখো আমিও তোমাদের মতো ছেঁড়া-ফাটা প্যান্ট পরি এ কথা বলে দু’জনে হাসলাম।

কিছু স্টপস যাওয়ার পর মিস.ফিউ’লে নেমে গেলেন এবং আমাকে বলে গেলেন, (It doesn’t matter if you’re black or white or different religions. The most important thing is that we are human beings.)

আমরা মেরিনা পৌঁছলাম। বড় ভাই সাগর খাঁন ছোট ভাই রনি, বন্ধু হৃদয় আমাদের সাথে আড্ডায় যুক্ত হলো। রাত আনুমানিক এগারোটা। সবাই মিলে বুদ্ধি করল ক্যাসিনো খেলবে আমাকেও সাথে খেলতে হবে। ক্যাসিনোতে গেলাম। আসিক খেলা শুরু করার জন্য এক হাজার ডলারের ক্যাসিনো বিটকয়েন কিনলেন এবং এক এক করে সবাই হারিয়ে গেলেন। ঘন্টা খানেক পর সাগর ভাইয়ের সাথে “ওয়াইড রেঞ্জ অফ লুডো গেমিং পয়েন্ট” এর সামনে দেখা হলো সারা শরীর ঘামে ভেজা চোখ লাল হয়ে আছে এক হাতে সিগারেট এক হাতে ক্যাসিনোকয়েন। তাকে দেখে বোঝার বাকি রইল না সে লস’এ আছে! তার কাছে জানলাম সে পাঁচ-শতক ডলার নিয়ে খেলা শুরু করেছিল ছয়-হাজার ডলার পর্যন্ত পৌঁছেছিলেন কিন্তু হুট করে সব লস খেয়ে বসে আছেন পরবর্তীতে ছোট ভাই রনির থেকে এক হাজার ডলার নিয়ে খেলেছে তবুও এখন লস খেয়ে বসে আছেন। হাতে অল্প কিছু কয়েন আছে। তাকে বুদ্ধিদিলাম আপাতত খেলা বন্ধ রাখতে। ঘন্টা খানেক পর খেলা শুরু করতে। বর্তমান তার ” Bad luck ” চলছে সম্ভবত সময়ের সাথে Luck চেঞ্জ হবে।

সে হতভম্ব হয়ে সিগারেটের ধোঁয়া উড়াচ্ছে এবং আমার দিকে তাকিয়ে আছে। এদিকে আশিকেরও অবস্থা খারাপ সে যে এক হাজার ডলার নিয়ে নেমেছিল সব শেষ। অন্যদিকে হৃদয় খুব খুশি মাত্র পাঁচশত ডলার নিয়ে খেলা শুরু করেছিল এখন সে নয়হাজার ডলারের মালিক।

হৃদয়কে বললাম খেলা বন্ধ করতে তার দূরসময় আসছে। সে আমার দিকে মুসকিহেঁসে পাশকেটে চলে গেল।

খানিকক্ষণ পর আশিক এবং সাগর ভাইকে বললাম দুজনে পার্টনারে “Ludo gaming” করার জন্য তবে মেশিনে নয় সরাসরি। লস হলেও ফিফটি-ফিফটি লাভ হলেও ফিফটি-ফিফটি।

খেলাটা এমন মোট তিনটি লুডো ডাইস, ডাইস গুলোকে ছোড়া হবে তিনটি ডাইস মিলে যদি দশ এর নিচে হয় তবে “Small” Or if above ten (Big)।

তাদেরকে বললাম একজন Small এ ধরলে আরেকজন পার্টনার Big এ ধরতে হবে। একজন পার্টনার পঞ্চাশ ডলার ধরলে আরেকজন বিশ ডলার ধরতে হবে এতে লস হলেও পরিমাণ কমবে লাভ হলে আগের সব লসের ভাগ উঠে আসবে।

সম্ভবত রাত দুটো খবর এলো, ছোট ভাই রনি হৃদয়ের খেলা দেখে সেও হৃদয়ের সাথে খেলতে গিয়ে তিন হাজার ডলার শেষ করে ফেলেছে। হৃদয় সিগারেট হাতে ফ্লোরে বসে আছে তার শরীর প্রচন্ড রকমের ঘাম ঘেমে আছে, চোখ লাল হয়ে আছে। অন্যদিকে আসিক ও সাগর ভাই পার্টনারশিপে খেলে সাত হাজার ডলার উঠিয়ে ফেলেছে।

হৃদয় আমার দিকে ভয়ংকর দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। আমি ভয় পাই না তবে এখন ভয় পাচ্ছি।

পাশের টেবিলে এক ভদ্রলোক খেলতে বসেছে। বয়স আনুমানিক সত্তর কিংবা পঁচাত্তর হবে। হাতে একটি হাঁটার স্টিক লম্বা চুল, মুখ ভর্তি হাসি। ভদ্রলোকের একদাঁত সম্ভবত সোনায় বাঁধানো। এক হাতে সিগারেট আরেক হাতে পঞ্চাশ হাজার ডলার পরিমাণ ক্যাসিনো বিটকয়েন। সম্ভবত সে আজকের ” Winner “। সে গেমিং করছে এবং প্রতি গেমিং এ হেঁসে-হেঁসে বলছে, ” Game is the name of our life”। খানিকক্ষণ তার খেলা দেখলাম প্রতিবার গেমিংএ সে কয়েন লুটে নিচ্ছে। সম্ভবত সে জাদুকরী ধরনের মানুষ। অন্যথায় কখনও এটা সম্ভব নয়।

হুট করে কোথাথেকে এক মেয়ে আসল, বয়স আনুমানিক ছাব্বিশ। দেখতে অসাধারণ সুন্দরী। আমি তার দিকে গম্ভির ভাবে তাকিয়ে আছি। এসেই গেমিং কোর্টের আশেপাশে থাকা সবার সাথে হ্যান্ডশেক করে সবাইকে সিগারেট দিচ্ছে এবং পরিচয় দিচ্ছে “I’m Nin from Thailand “। আমি নীনের দিক থেকে চোখ ফেরাতে পারছি না। নীন সিগারেট খাচ্ছে পরনে সাদা একটি “Bodycon gown” ঠোঁটে হালকা লিপস্টিক, চোখে অল্প কাজল সম্ভবত সে খুব অল্প পরিমাণ সেজেছে। তবে তাকে অসাধারণ রূপবতী লাগছে। নীনের কপালে একটি টিপ থাকলে সম্ভবত তাকে আরও বেশি রূপবতী লাগত।

সে খেলা শুরু করল। প্রথমে “Each double” একটি কোর্টে একশত ডলার নামাল সবাই হেরে গেছে শুধু “Each triple” এ বসে থাকা ভদ্রলোক উইনার সে হেঁসে-হেঁসে বল্ল, ” Game is the name of our life”। বলেই আবার কয়েন নামালো এবার আমিও খেলা শুরু করলাম। আমি “One wins” 222 কোর্টে তিনশতক ডলার বসালাম। নীন “Small” এ বসালো পাঁচশতক। ক্যাসিনোকোর্টপরিচালক লুডো ডাইস ছুড়লেন ভাগ্যক্রমে ড্র উঠল “One wins” 222 নীন আমার দিকে তাকিয়ে হেসে একটি সিগারেট দিল। সিগারেট খাচ্ছি। পরবর্তীতে নীন “Big” ধরলে আমি “Small” ধরছি পার্টনারশিপে খেলা শুরু হলো। তবে আমাদের মাঝে ফিফটি-ফিফটি কোন চুক্তি নেই। ঘন্টা খানেক পর দেখা গেল আমার হাতে বিশ-হাজারের মতো কয়েনবিট জমা পরে গেছে। এদিকে নীনও জিতে আছে। ভদ্রলোক প্রচন্ড রকমের মন খারাপ নিয়ে আমাদের সাথে খেলছে। সে কয়েন নামাচ্ছে এবং বলছে ” Game is the name of our life” তবে তার মুখে আগের মতো হাসি নেই তার মুখ মলিন হয়ে আছে।তার শরীর থেকে প্রচন্ড রকমের ঘাম ঝড়ছে। মাঝে মাঝে নীন আমার দিকে তাকিয়ে মুসকি-মুসকি হাসছে। আমিও মুসকি হাসছি।

হুটকরে নীনের ফোনে কল এলো, নীনের মুখ বিমর্ষ হয়ে এলো সে এক সেকেন্ডও দেরি করল না উঠে দাড়িয়ে বল্ল, “Time can only use us, we can never use time.” বলেই সে মুসকি একটি হাসি দিয়ে চলে গেল।

নীনের চলে যাওয়াতে ভদ্রলোক ধীর গলায় বল্ল, ” Game is the name of our life”। আমি নীনের দিকে তাকিয়ে আছি। ভদ্রলোক “Each triple” 222 এ কয়েন নামালেন। আমিও “Big” এ কয়েন নামালাম। পরিচালক লুডো ডাইস ছুড়লেন এবার ভদ্রলোক উইনার সে হেসে হেসে বল্ল, ” Game is the name of our life”।

কফির সাথে সিগারেট খাচ্ছি। প্রচন্ড রকমের মন খারাপ। তবে এটা গেমিং এর জন্য নয়। সম্ভবত নীনের জন্য আমার প্রচন্ড মন খারাপ হলো। নীন চলে গেছে তারসাথে আর কখনও দেখা হবে না। আমার চোখ লাল হয়ে উঠতে শুরু করল। শরীর প্রচন্ড ঘামতে শুরু করেছে। সবাই গেমিং করতে ব্যস্ত। “Game is the name of our life” বলেই ভদ্রলোক উচ্চস্বরে হাসছে। সম্ভবত রাত শেষের দিকে চলে এসেছে। শরীর প্রচন্ড ঘামছে। একটার পর একটা সিগারেট খাচ্ছি।

সময়ের সাথে ভাগ্য পরিবর্তন হয়ে যায় এখন আমার ” Good luck or bad luck ” সেটা আমার জানা নেই। আচ্ছা সত্যি কি সময়ের সাথে মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন হয়?

লেখা: সাকিব আহমেদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *