অপেক্ষার ভেতর আমি

চৌধুরী রুহাশ

আমি অপেক্ষা করতে জানি।
এটা কোনো গুণ না, কোনো দুর্বলতাও না—এটা শুধু আমার স্বভাব। কতদিন স্টেশনের বেঞ্চে বসে থেকেছি, দরজার পাশে দাঁড়িয়ে থেকেছি, ফোনের স্ক্রিনে একই আলো বারবার দেখেছি—গুনে বলতে পারব না। আর যে অপেক্ষাগুলো কেউ দেখেনি, সেগুলো তো আরও বেশি। মনের ভেতরে চুপচাপ জমিয়ে রেখেছি, কাউকে বলিনি, শুধু নিজের সঙ্গে বয়ে বেড়িয়েছি।
প্রথম দিকে খুব অস্থির লাগত। “কখন আসবে? কেন আসছে না?”—এই সব প্রশ্ন মাথায় ঘুরত। ঘুম হতো না ঠিকমতো। কিন্তু একসময় সেই প্রশ্নগুলো কমে আসে। ভেতরে একটা নীরবতা নামে—যেটাকে শান্তি বলা যায় না, বলা যায় অভ্যাস। আমি তখন বুঝে যাই, সবকিছু চাইলেই পাওয়া যায় না। কিছু কিছু জিনিসের জন্য শুধু অপেক্ষা করে যেতে হয়—পাওয়ার নিশ্চয়তা ছাড়াই।
এটা মেনে নিতে সময় লেগেছে।
সময়ের সঙ্গে আমার একটা অদ্ভুত সম্পর্ক।
আমি থামি, কিন্তু সময় থামে না। আমি যেখানে দাঁড়িয়ে থাকি, সময় সেখানে এক মুহূর্তও অপেক্ষা করে না। সে চলে যায়—নির্লিপ্তভাবে, নিষ্ঠুরভাবে। আমার কষ্টের কোনো হিসাব তার কাছে নেই।
আর এখানেই সবচেয়ে বড় ফাঁদটা লুকিয়ে। যখন অবশেষে যা চেয়েছিলাম তা আসে, আমি তখন আর সেই আমি থাকি না। সময় আমাকে বদলে দিয়েছে—ভেতর থেকে, চুপচাপ, আমাকে না জানিয়ে। পাওয়াটা তখন অনেকটা ফাঁকা লাগে।
এই অনুভূতিটা ব্যাখ্যা করা কঠিন। যেন অনেকক্ষণ বৃষ্টির জন্য অপেক্ষা করলাম, বৃষ্টি এল—কিন্তু ততক্ষণে আমি ভেতরে ভেতরে শুকিয়ে গেছি।
তবুও আমি অপেক্ষা করি।
কারণ ছেড়ে দিতে পারি না। অপেক্ষার ভেতরে একটা নরম আলো থাকে, যেটাকে আশা বলে। “আজ না হোক, কাল ঠিক হবে”—এই একটা বাক্যের ওপর ভর করেই একেকটা দিন পার করি। যদিও জানি, সময় সেই কালকেও আজ বানিয়ে দেবে, আর আজকেকে গতকাল।
তবুও।
অপেক্ষা আমার কাছে একধরনের বিশ্বাস—যে বিশ্বাসের কোনো প্রমাণ নেই, তবুও যেটা ছাড়া চলে না। না করলে হয়তো কিছুই থাকবে না আঁকড়ে ধরার মতো। এই ভয়টাই হয়তো আমাকে বাঁচিয়ে রাখে।
সময় চলে যায়। আমি থাকি।
আবার অপেক্ষা শুরু করি।
হয়তো এটাই আমার বেঁচে থাকার ধরন—চলমান সময়ের মাঝেও একটু থেমে, নিজের মতো করে, কিছু একটা আশা বুকে ধরে রাখা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *