ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ভাবনায় মা

প্রত্যেকের জীবনেই একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্কের নাম হলো মা। লালন-পালন থেকে শুরু করে জীবনের নানা ধাপে স্নেহ-মমতা, ত্যাগ ও অনুপ্রেরণার মাধ্যমে মা আমাদের নিরলসভাবে আগলে রাখেন। ১০ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক মা দিবস। মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের চর্চার জন্য দিবসটি তাৎপর্যপূর্ণ। মা দিবস উপলক্ষ্যে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীদের স্মৃতি ও তাৎপর্যপূর্ণ ভাবনার কথা তুলে ধরেছেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মো. জাহিদ হাসান।

মমতার নীলিমায় জননী তিলোত্তমা

আসিফয়া কানিজ ফাতেমা: মায়ের সংজ্ঞা কোনো অভিধানে সীমাবদ্ধ নয়, বরং মায়ের অস্তিত্ব মিশে আছে সন্তানের প্রতিটি নিঃশ্বাসে। আমার জীবনে মা মানেই এক বিস্তৃত আকাশ, যেখানে রোদ-বৃষ্টির সবটুকু ঝাপটা তিনি নিজের গায়ে মেখে আমাকে আগলে রাখেন পরম মমতায়। তাঁর সেই স্নিগ্ধ শাসন আর নিঃস্বার্থ ভালোবাসাই আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ পাথেয়।

স্মৃতির আয়নায় আজও উজ্জ্বল হয়ে আছে সেই দিনগুলো, যখন বাইরের ঝুম বৃষ্টিতে সবাই উৎসবে মেতে উঠতো, আর মা পরম মমতায় চুলায় পিঠা ভাজতেন শুধু আমার মুখে হাসি ফোটাতে। মনে পড়ে সেই রাতগুলোর কথা, যখন জ্বরে গা পুড়ে যেত, আর মা সারারাত চোখে এক ফোঁটা ঘুম না নিয়ে আমার কপালে জলপট্টি দিতেন; তাঁর সেই শীতল হাতের স্পর্শে মনে হতো অর্ধেক অসুখ ওখানেই সেরে গেছে। আজও যখন আমি কোনো নতুন সৃজনে মগ্ন হই, চোখের সামনে ভাসে মায়ের সেই সেলাই মেশিনের ছন্দ, কিংবা রং-তুলির আঁচড়ে সাধারণ জিনিসকে অসাধারণ করে তোলার জাদুকরী নিপুণতা। মা শিখিয়েছেন– ধৈর্য এবং শ্রম দিয়ে কীভাবে শূন্য হাতেও স্বপ্ন বোনা যায়। খবরের পাতার এই ধবল জমিনে মায়ের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করাটা সমুদ্রকে গ্লাসে ভরার চেষ্টার মতোই দুঃসাধ্য। তবুও এই বিশেষ দিনে পৃথিবীর সকল মায়ের চরণে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা। মায়ের হাসিমাখা মুখখানিই হোক পৃথিবীর সব সন্তানের দিনান্তের পরম প্রশান্তি।

শিক্ষার্থী, হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট বিভাগ,ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।

সৃষ্টিকর্তার শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি–মা

সোহানুর রহমান শাওন : সৃষ্টিকর্তার এক মোহময় সৃষ্টি—মা। এই একটি শব্দে মিশে থাকে ভালোবাসার অসীম অনুভূতি, আর পরম নির্ভরতা। আমাদের অস্তিত্বের প্রথম স্পন্দন যেমন মায়ের হৃদয়ে, তেমনি আমাদের প্রথম ভালোবাসতে শেখান মা। সৃষ্টি কতটা মিষ্টি ও সুন্দর হতে পারে, তা অনুভব করা যায় মাকে দেখেই। মাকে নিয়ে লিখতে গেলে হয়তো কম পড়ে যাবে শব্দভান্ডারে! যে মা আমাদের ভাষা শিখিয়েছেন, তাকে কি কয়েকটি শব্দে ব্যাখা করা যায়? প্রয়োজনে কখনো তিনি হয়ে উঠেছেন একজন চিকিৎসক, কখনোবা একজন শিক্ষক, আবার কখনো একজন যোদ্ধা। তিনি আমার জীবনে মমতাময়ী এক আশ্রয়, যেখানে ভালোবাসা মেলে নিঃস্বার্থ ও অকৃত্রিমতায়। তাঁর এই বহুমাত্রিকতাই তাকে দিয়েছে এক অনন্য উচ্চতা, ‘মা’ নামটিকে করেছে মহিমান্বিত। পৃথিবীতে যার মা আছেন, সে কখনো প্রকৃত অর্থে নিঃস্ব হতে পারে না। কারণ, মা আমাদের পথচলার অন্যতম অনুপ্রেরণা। একটি নির্দিষ্ট দিন বা তারিখের গণ্ডিতে মায়ের প্রতি ভালোবাসা সীমাবদ্ধ করা সম্ভব নয়; বরং প্রতিটি দিনই মায়ের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা প্রদর্শন করা উচিত। পৃথিবীর সবটুকু সুখ মায়েদের জন্য হোক। মা দিবসে পৃথিবীর সকল মায়ের প্রতি রইল বিনম্র শ্রদ্ধা।

শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ,ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।

মায়ের মমতা : জীবনের নিঃস্বার্থ আশ্রয়

সাইফুদ্দীন সিদ্দীক : ‘মা’ শব্দটি ছোট, কিন্তু এর গভীরতা অসীম। এই একটি শব্দের ভেতরেই লুকিয়ে আছে পৃথিবীর সবচেয়ে বিশুদ্ধ ভালোবাসা, নিঃস্বার্থ মমতা ও অকৃত্রিম স্নেহ। মা মানবজীবনের সবচেয়ে আপন ও নিরাপদ আশ্রয়। জন্মের পর থেকেই মানুষ মায়ের স্নেহ-ছায়ায় বেড়ে ওঠে, তাঁর ভালোবাসায় গড়ে ওঠে জীবনের ভিত্তি। মা শুধু জন্মদাত্রী নন, তিনি সন্তানের প্রথম শিক্ষক। তাঁর কাছ থেকেই মানুষ শেখে জীবনের প্রথম পাঠ— ভালো-মন্দের পার্থক্য, নৈতিকতা, মানবিকতা ও দায়িত্ববোধ। জীবনের কঠিন মুহূর্ত গুলোতে মায়ের ভালোবাসা আমাদের সাহস জোগায়, আর তাঁর দোয়া আমাদের পথকে সহজ করে দেয়। মা দিবস একটি বিশেষ উপলক্ষ্য, যা আমাদের মায়ের প্রতি দায়িত্ব ও ভালোবাসার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। তবে প্রকৃত অর্থে প্রতিটি দিনই শ্রদ্ধার সাথে মাকে মনে করা উচিত। কারণ, মা প্রতিদিনই সন্তানের জন্য ত্যাগ স্বীকার করেন, নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলেন। ইসলামে মায়ের মর্যাদা অত্যন্ত উচ্চ। এক হাদিসে বলা হয়েছে, উত্তম আচরণের সবচেয়ে বেশি অধিকার মায়ের। পবিত্র কুরআনেও মায়ের কষ্টের কথা উল্লেখ আছে, গর্ভধারণ ও সন্তান জন্মদানের সময় তাঁর ত্যাগ অতুলনীয়। মায়ের দোয়া সন্তানের জীবনে রহমতের দরজা খুলে দেয়, আর তাঁর সন্তুষ্টি আল্লাহর সন্তুষ্টির কারণ হয়। তাই মায়ের অবাধ্যতা গুরুতর গুনাহ, আর তাঁর সেবা-যত্ন ইবাদতের মর্যাদা রাখে। মা শুধু একটি সম্পর্ক নয়; তিনি আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ। তাঁর প্রতি ভালোবাসা, সম্মান ও যত্ন প্রদর্শন করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।

শিক্ষার্থী, দা’ওয়াহ এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ,ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।

মা এক নীরব মহাকাব্য

পাঁপড়ি রানী মোদক : মা কখনো নিজের গল্প বলেন না—তবু তাঁর জীবনটাই যেন এক নীরব মহাকাব্য। আমার জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ে তিনি আছেন, কখনো দৃশ্যমান, কখনোবা অদৃশ্য শক্তি হয়ে। ছোটবেলায় বুঝতাম না কেন তিনি নিজের ইচ্ছেগুলো এত সহজে ছেড়ে দেন; আজ বুঝি, সেটাই ছিল ভালোবাসার সবচেয়ে গভীর ভাষা। আমার প্রথম হোঁচট খাওয়া, প্রথম জয়—সবকিছুর পেছনে মায়ের ছায়া লেগে আছে। একবার পরীক্ষায় খারাপ করার পর ভেবেছিলাম সব শেষ, কিন্তু মা শুধু বলেছিলেন, “হাল ছেড়ো না।” সেই একটি বাক্যই আমাকে আবার শুরু করার সাহস দিয়েছিল। মা আসলে কোনো বিশেষ দিনে সীমাবদ্ধ নন। তিনি প্রতিদিনের ক্লান্ত দুপুর, নির্ভরতার সন্ধ্যা, আর নিশ্চিন্ত ঘুমের রাত। তার হাতের ছোঁয়ায় পৃথিবীটা একটু সহজ, একটু উষ্ণ হয়ে ওঠে। মা দিবসে আলাদা করে কিছু বলার থাকে না—কারণ তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা শব্দে শেষ করা যায় না। শুধু মনে হয়, আমার জীবনের প্রতিটি ভালো কাজই হোক তার প্রতি এক একটি নীরব ধন্যবাদ।

শিক্ষার্থী, আল ফিকহ এন্ড ল বিভাগ,ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।

মা এক নিঃস্বার্থ ভালোবাসার প্রতিচ্ছবি

মাহমুদা ইসলাম স্বর্ণালী : মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের বেহেশত। মা পৃথিবীর সবচেয়ে আপন মানুষ, যার ভালোবাসা নিঃস্বার্থ ও অফুরন্ত। যার মা আছে, তাঁর মতো ধনী এ পৃথিবীতে আর কেউ নেই। শৈশব থেকে আজ পর্যন্ত আমার জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে মায়ের স্নেহময় স্পর্শ জড়িয়ে আছে। আমার সব বিপদ-আপদ, দুঃসময়, আর কষ্টের মুহূর্তে মাকেই পাশে পেয়েছি। জীবনের কোনো কষ্ট সহ্য করতে না পারলে আজও মাকে জড়িয়ে ধরে নির্ভয়ে কাঁদতে পারি—কারণ মায়ের চেয়ে নিরাপদ আশ্রয় আর কোথাও পাইনি। মায়ের কাছে যখনই যে আবদার করেছি, মা সাধ্যমতো সবই পূরণ করার চেষ্টা করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে নতুন শহরে এসে সবচেয়ে বেশি যেটা মনে পড়ে, তা হলো মায়ের হাতের রান্না। অসুস্থ হলে প্রতিটি মুহূর্তে মায়ের স্নেহময় স্পর্শ আরও বেশি অনুভব করি। যখন কারোর মাকে হারানোর কথা শুনি, তখন নিজের মায়ের মুখটা চোখের সামনে ভেসে ওঠে। মনে হয়, আমার মায়ের কিছু হলে আমি কীভাবে নিজেকে সামলাবো। আমি বোধ হয় একটু বেশিই ভাগ্যবতী, কারণ নিজের মায়ের পাশাপাশি আমি এমন একজন শাশুড়ি মা পেয়েছি, যিনি কোনো দিক থেকেই আমার মায়ের চেয়ে কম নন। তিনি আমার জন্য রান্না করেন, আদর করেন এবং নিজের মেয়ের মতোই স্নেহে আগলে রাখেন। এদিক থেকে সত্যিই আমি অনেকের চেয়ে একটু বেশিই সৌভাগ্যবতী। এই মা দিবসে শুধু আমার নিজের মায়ের জন্য নয়, পৃথিবীর সকল মায়ের জন্য প্রার্থনা—সৃষ্টিকর্তা যেন প্রতিটি মাকে সুস্থ, সুখী ও ভালো রাখেন।

শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।

মা আমার পৃথিবী

রেখা খাতুন : ‘মা’ এক অক্ষরের একটা শব্দ মাত্র, অথচ এর পরিধি ব্যাপক। মা হারা সন্তান জানে প্রতিকূলতার মাঝে লড়াই করে পৃথিবীতে টিকে থাকা কতটা কঠিন। নিজেকে ভেঙেচুরে যার কাছে উপস্থাপন করা যায় তিনি হলেন মা। যে মানুষটা ছাড়া পৃথিবীতে আসা অসম্ভব, পৃথিবীর স্বাদ নেওয়া কল্পনাও করা যায় না, যে মানুষটা হাড়ভাঙা যন্ত্রণা সহ্য করে আমাদেরকে পৃথিবীর আলো দেখার সুযোগ করে দিয়েছেন, নিরবে-নিভৃতে কতশত আঘাত সহ্য করেছেন আমাদেরকে মানুষ করার জন্য, যার অস্তিত্ব ছাড়া আমরা নিজেদের কোনো অস্তিত্বই খুঁজে পাবো না, সে মানুষটিকে কখনো ভালোবাসি বলা হয়ে ওঠেনি। মা দিবস উপলক্ষ্যে মন খুলে বলতে চাই, ‘ভালোবাসি মা’। পৃথিবীর বহু শব্দকে ভাঙলে হয়তো অর্থ পাওয়া যাবে, কিন্তু ‘মা’ শব্দটি ভাঙলে নির্দিষ্ট অর্থ পাওয়া দুষ্কর । যার মা আছে তাঁর পুরো একটা পৃথিবী আছে। মা ছাড়া পৃথিবীতে টিকে থাকা অসম্ভব নয়, তবে খুবই কষ্টদায়ক। শত কষ্ট, আঘাত, ব্যাথা-বেদনা মায়ের চেহারা দেখলেই মলিন হয়ে যায়। আরিজিৎ সিং এর একটা গান রয়েছে,
‘তুমি নরম ফুলের গান
তুমি গরম ভাতের ভাপ
তুমি অভিমানের চুপ
তুমি কান্না জমা মুখ’।
মাকে নিয়ে লেখা গানটি খুবই অর্থবহ। পৃথিবীর সকল মা বেঁচে থাকুক অনেক বছর ধরে।

শিক্ষার্থী, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ,ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *