তাহিয়া মেহ্জাবিন : নাবিক সিন্দাবাদের ঘাড়ের ওপর এক দৈত্য চেপে বসেছিল। বাঙলা তেরোশ’ পঞ্চাশ সালের ঘাড়েও তেমনি চেপে বসেছিল দুর্ভিক্ষ। হাত-পা শেকলে বাঁধা পরাধীন সে বুভুক্ষু তেরো’শ পঞ্চাশের মৃত্যু হয়েছে। মৃত্যু হয়েছে তার পরের আরো চারটি উত্তরাধিকারীর। কিন্তু দুর্ভিক্ষ আর ঘাড় থেকে নামেনি। ঘাড় বদল করেই চলেছে একভাবে। হাত-পায়ের বন্ধনমুক্ত স্বাধীন তেরোশ’ পঞ্চান্নে এসেও সে আকাল-দৈত্য তার নির্মম খেলা খেলছে। তাকে আর ঘাড় থেকে নামান যায় না।দুর্ভিক্ষের তাড়নায় কত মানুষ যে না খেতে পেয়ে মারা যায় তার কোনো হিসাব নেই।
তেমনি জয়গুন ও শফির মা সকলের মতো অতীতের কান্না চেপে, চোখের জল মুছে তারা আসে তাদের ফেলে যাওয়া গ্রামে কিন্তু মানুষের চেহারা নিয়ে নয়। তাদের শিরদাঁড়া বেঁকে গেছে। পেট গিয়ে মিশেছে পিঠের সাথে। ধনুকের মতো বাঁকা দেহ। তবুও তারা ভাঙা মেরুদণ্ড নিয়ে সমাজ ও সভ্যতার মেরুদণ্ড সোজা করে ধরার চেষ্টা করে।
সূর্য দীঘল বাড়ি। যাকে নিয়ে গ্রামের মানুষের মধ্যে নানা ধরনের কিচ্ছা প্রচলিত আছে। এই বাড়িতে নাকি ভূত- পেত্নীর আসর। তাই দুপুরেও মানুষ এ বাড়ির পাশ দিয়ে হেঁটে যেতে ভয় পায়। বাড়ীটার বড় আকর্ষণ একটা তালগাছ। কালের সাক্ষী হয়ে শত ঝড়-ঝাপটা উপেক্ষা করে দাঁড়িয়ে আছে মাথা উঁচু করে। তবে সূর্যদীঘল বাড়িতে কেউ বাস করে না, গ্রামের সকলের ধারণা যেই এই বাড়িতে থাকে তারই বছর না ঘুরতেই বিপদ আষ্টেপৃষ্টে ধরে। কিন্তু জয়গুন আর শফির মার তো যাওয়ার কোনো জায়গা নেই। তাই তারা সূর্যদীঘল বাড়িতেই আশ্রয় নিলো। বাড়িতে এক ফকির এসে বাড়িতে তাবিজ দিয়ে যায়, তারপর থেকে তারা নিশ্চিন্তে বাড়িতে থাকতে শুরু করে। কিন্তু পেটের দায়! পেটের দায়ে এদিক ওদিক ঘুরে বেড়ায়, কত বিপদের সম্মুখীন হয়। এসব টানাপোড়েনেও তারা কীভাবে টিকে থাকে?
একদিন শুনতে পায় দেশ নাকি স্বাধীন হয়েছে। দেশে চালের দাম কমবে! কেউ না খেতে পেয়ে মারা যাবে না। কিন্তু তা কি আদও হলো! দিনকে দিন চালের দাম বেড়েই গেলো। বছর ঘুরে এলো আবার দুর্ভিক্ষ। এ পৌনঃপুনিক দুর্ভিক্ষ কি শুধু ভাতের? কাপড়েও।শত কপাল কুটলেও সরকার নিয়ন্ত্রিত মূল্যের দ্বিগুণ দিয়েও একখানা কাপড় পাওয়া যায় না।
মায়মুনের বিয়ের সময়, ছ’মাস আগে তওবা করে জয়গুন সেই ঘরে ঢুকেছে, আজ পর্যন্ত সেই তওবার অমর্যাদা করেনি।কিন্তু এমনি করে কি দিন চলবে?এমনি করেই কি পেটের জ্বালা জুড়াবে? একদিন তার সব তওবা উপেক্ষা করে পর্দা ঠেলে আবার বাইরে বেরিয়ে পরে পেটের জ্বালা দূর করার জন্য। পর্দা ঠেলে উপার্জনের জন্য বাহির হওয়ায় তাদের বাড়ি ছাড়া করা হয়।
খোদার এত বড় দুনিয়াই কি তাদের কি একটু ঠাই হবে না!…
বই-এর লেখক : আবু ইসহাক।
উল্লেখ্য, উপন্যাসটি ১৯৪৩ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ এবং ১৯৪৭ সালের দেশভাগের প্রেক্ষাপটে গ্রামীণ বাংলার সমাজব্যবস্থা ও নারীর সংগ্রাম নিয়ে রচিত। এ উপন্যাস ভিত্তিক ‘সূর্য দীঘল বাড়ী’ চলচ্চিত্রটি নির্মিত হয়েছে।
বুক রিভিউ লেখিকা : শিক্ষার্থী, রাজেন্দ্রপুর ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল ও কলেজ,গাজীপুর।




















