রাইহান উদ্দিন
ধর্ষণ একটি ভয়াবহ অপরাধ যা সমাজের শান্তি-শৃঙ্খলা বিনষ্ট করে। ইসলাম হলো শান্তির ধর্ম,ন্যায়ের ধর্ম। আইয়্যামে জাহেলিয়ার যুগে মৌলিক অধিকার থেকে নারী সমাজ ছিলো বঞ্চিত, অর্থনৈতিক শোষণ ও যৌন নিপীড়ন তো ছিলো স্বাভাবিক বিষয়। এমন একটি সময়ে নারী সমাজকে তার প্রাপ্য অধিকার, সম্মান ও মর্যাদা ফিরিয়ে দিয়েছে ইসলাম। ভবিষ্যতে যেন নারী সমাজকে আবারো জুলুম-নির্যাতন ও লাঞ্চনার শিকার না হতে হয় সেই পদক্ষেপ ও নিয়েছে ইসলাম। প্রতিটি অন্যায়ের জন্য রাখা হয়েছে নির্ধারিত পরিমাণ শাস্তির বিধান।
ইসলামের দৃষ্টিতে ধর্ষণ একটি গুরুতর অপরাধ। যার ফলে ধর্ষিতা নারীকে লাঞ্চনার শিকার হতে হয়। তাইতো ধর্ষণের বিরুদ্ধে ইসলাম অবস্থান নিয়েছে। ধর্ষণকে ইসলামে জঘন্য একটি অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করে এর জন্য কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। অনেক হাদিসে ধর্ষণের শাস্তির ব্যাপারে আলোচনা এসেছে। শাস্তি প্রয়োগের মাধ্যমে ইসলাম বিষয়টির স্পর্শকাতরতা স্পষ্ট করা হয়েছে। পাশাপাশি ধর্ষকের শাস্তি এবং ধর্ষিতার সুরক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে।
ধর্ষণের ক্ষেত্রে একপক্ষের মাধ্যমে ব্যভিচার সংঘটিত হয়। আর অন্যপক্ষ নির্যাতিত। তাই নির্যাতিতের কোনো শাস্তি নেই। কেবল অত্যাচারী ধর্ষকের শাস্তি হবে।
এক হাদিসে আছে,রাসুল (সা.)-এর যুগে এক নারীকে জোরপূর্বক ধর্ষণ করা হলে রাসুল (সা.) ওই নারীকে কোনোরূপ শাস্তি দেননি,তবে ধর্ষককে হদের শাস্তি দেন। (ইবনে মাজাহ, হাদিস: ২৫৯৮)
উল্লেখ্য,যেসব শাস্তির পরিমাণ ও পদ্ধতি কোরআন-হাদিসে সুনির্ধারিত রয়েছে, সেগুলোকে ‘হদ’ বলে।
অন্য হাদিসে আছে,‘গনিমতের পঞ্চমাংশে পাওয়া এক দাসির সঙ্গে সরকারি নিয়ন্ত্রণাাধীন এক দাস জোরপূর্বক ব্যভিচার (ধর্ষণ) করে। এতে তার কুমারীত্ব নষ্ট হয়ে যায়। উমর (রা.) ওই গোলামকে বেত্রাঘাত করেন এবং নির্বাসন দেন। কিন্তু দাসিটিকে (অপকর্মে) সে বাধ্য করেছিল বলে তাকে কোনো ধরনের বেত্রাঘাত করেননি।’ (বুখারি, হাদিস : ৬৯৪৯)
ধর্ষণ একটি ভয়ংকর অপরাধ। ইসলামের দৃষ্টিতে এটি কবিরা গুনাহ। কোনো ব্যক্তি যদি ধর্ষণের শিকার হন,তাহলে তার সর্বপ্রথম করণীয় হলো,যদি সম্ভব হয়,তা প্রতিরোধ করতে হবে, এমনকি আত্মরক্ষায় যদি ধর্ষণকারীকে হত্যা করতে হয়,তাও ইসলাম অনুমোদন দেয়।
সাইদ ইবনে জায়েদ (রা.) বলেন,আমি রাসুল (সা.)-কে বলতে শুনেছি,‘সম্পদ রক্ষা করতে গিয়ে যে ব্যক্তি নিহত হয়েছে,সে শহীদ। জীবন রক্ষা করতে গিয়ে যে নিহত হয়েছে,সেও শহীদ। দ্বীন রক্ষা করতে গিয়ে যে নিহত হয়েছে,সে শহীদ। আর সম্ভ্রম রক্ষা করতে গিয়ে যে নিহত হয়েছে,সেও শহীদ।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৪৭৭২, তিরমিজি, হাদিস : ১৪২১)
ইসলামি আইনবিদরা একমত হয়েছেন যে,ধর্ষণের শিকার ব্যক্তিকে ধর্ষণের কারণে অভিযুক্ত করা যাবে না। এ ক্ষেত্রে তার কোনো পাপ নেই। কেননা,ইচ্ছার বিরুদ্ধে তার ওপর বলপ্রয়োগ করা হয়েছে।
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে নবী (সা.) বলেছেন,‘নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার উম্মতের ভুলবশত করা অপরাধ,ভুলে যাওয়া কাজ ও বলপ্রয়োগকৃত বিষয় ক্ষমা করে দিয়েছেন।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ২০৪৫)
বাংলাদেশের আইনে ধর্ষণের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে,‘যদি কোনো পুরুষ বিবাহবন্ধন ব্যতীত ষোলো বৎসরের অধিক বয়সের কোনো নারীর সহিত তাহার সম্মতি ব্যতিরেকে বা ভীতি প্রদর্শন বা প্রতারণামূলকভাবে তাহার সম্মতি আদায় করিয়া,অথবা ষোলো বৎসরের কম বয়সের কোনো নারীর সহিত তাহার সম্মতিসহ বা সম্মতি ব্যতিরেকে যৌনসঙ্গম করেন,তাহা হইলে তিনি উক্ত নারীকে ধর্ষণ করিয়াছেন বলিয়া গণ্য হইবেন।’
এই সংজ্ঞার সঙ্গে ইসলামের তেমন কোনো বিরোধ নেই। তবে এতে কিছুটা অসামঞ্জস্য রয়েছে। ইসলাম সম্মতি-অসম্মতি উভয় ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের বিবাহবহির্ভূত দৈহিক সম্পর্ককে দণ্ডনীয় অপরাধ সাব্যস্ত করেছে। কিন্তু দেশীয় আইনে কেবল অসম্মতির ক্ষেত্রে অপরাধ বলা হয়েছে পার্থক্য এইটুকুই।
সম্মতি ছাড়া বিয়েবহির্ভূত সম্পর্ক ইসলাম ও দেশীয় আইন এবং সাধারণের কাছে অপরাধ হিসেবে গণ্য। বাংলাদেশের আইনে ধর্ষণের কারণে মৃত্যু না হলে তার মৃত্যুদণ্ড নেই। কেবল যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড রয়েছে। পক্ষান্তরে ইসলামে বিবাহিত কেউ ব্যভিচার করলে তাকে পাথর মেরে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার কথা রয়েছে।
আইনে ধর্ষণের কারণে মৃত্যু হলে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। আর ইসলামে ধর্ষণের কারণে মৃত্যু হলে,প্রথমে ধর্ষক ব্যভিচারের শাস্তি পাওয়ার পর হত্যার শাস্তি পাবে। যদি অস্ত্র দিয়ে হত্যা করা হয়,তাহলে ‘কিসাস’ বা মৃত্যুদণ্ড। আর যদি এমন কিছু দিয়ে হয়,সাধারণত যা দিয়ে হত্যা করা যায় না;তাহলে অর্থদণ্ড। যার পরিমাণ একশ উটের মূল্যের সমপরিমাণ অর্থ (প্রায় কোটি টাকা)।
সুতরাং সমাজ থেকে ধর্ষণকে দূরীভূত করতে হলে ইসলামের আইন যথাযথভাবে প্রয়োগ করা জরুরি। পাশাপাশি ধর্ষণ প্রতিরোধে আমাদের সকলের উচিত আরো সচেতন হওয়া এবং ইসলামী অনুশাসন যথাযথভাবে মেনে চলা।
লেখক :শিক্ষার্থী, তা’মিরুল মিল্লাত কামিল মাদ্রাসা, টঙ্গী।





















