ভাইরালের ভাইরাস

পংকজ প্রিয়ম : সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কয়েকদিন ধরে দেখলাম—না, ঠিক “দেখলাম না”…বাকরুদ্ধ হয়ে রইলাম! কিছুতেই মনোযোগ দিতে পারছিলাম না। তবুও বৃথা বাক্যব্যয়…

একটা জীবন্ত কুকুর। ভয়ে কাঁপছে। চোখে অসহায়তার জল। তাকে পুকুরের পানিতে বেঁধে রাখা হয়েছে—ঠিক এমনভাবে, যেন তার বাঁচার কোনো সুযোগই না থাকে। সামনে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে কুমির। আর চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলো? কেউ হাসছে, কেউ চিৎকার করে উল্লাস করছে, আর বেশিরভাগই মোবাইল তুলে ভিডিও করছে—একটা “ভাইরাল” মুহূর্ত ধরার জন্য। এই দৃশ্যটা মনে করিয়ে দেয় এতে শুধু কুকুরটার মৃত্যু নয়, এটা আমাদের মানবিকতার মৃত্যু। অথচ এই কুকুরটাও মায়া ভরা চোখে অপেক্ষায় ছিল, কেউ তাকে বাঁচাতে এগিয়ে আসবে। সত্য হলো এই-কেউই আসেনি।

আমরা কোথায় এসে দাঁড়িয়েছি? একটা প্রাণীকে মৃত্যুর মুখে ফেলে দিয়ে, আমরা সেটার “কনটেন্ট” বানাচ্ছি! অন্যের যন্ত্রণা দেখে যারা আনন্দ পায়, তারা অসুস্থ—এটা শুধু বইয়ের কথা না, বাস্তব সত্য। কিন্তু আরও ভয়ংকর হচ্ছে, যারা চুপ করে দেখে, যারা শেয়ার করে, যারা হাসে—তারা এই নিষ্ঠুরতাকে স্বাভাবিক করে তুলছে।

আজকে একটা কুকুর। কাল হয়তো একটা মানুষ। তারপর একদিন—আমাদের ভেতরের শেষ ভালোবাসাটুকুও মরে যাবে। আমরা কি এখন এমন এক সমাজে বাস করছি, যেখানে সহানুভূতির চেয়ে “ভিউ” বেশি গুরুত্বপূর্ণ? যেখানে সাহায্যের হাত বাড়ানোর আগে আমরা ক্যামেরা অন করি?

একটা সময় ছিল—মানুষ বিপদে পড়লে, অপরিচিত হলেও আশেপাশের মানুষ ছুটে যেত। এখন? আমরা দাঁড়িয়ে থাকি। দেখি। রেকর্ড করি। আপলোড করি। তারপর কমেন্টে লিখি—“কী ভয়ংকর!”
আসলে ভয়ংকরটা ভিডিও না, ভয়ংকরটা আমরা।

“ভাইরাল” এখন একটা ভাইরাস—যা ধীরে ধীরে আমাদের অনুভূতিকে পঙ্গু করে দিচ্ছে। আমরা যত বেশি দেখি, তত কম অনুভব করি। একসময় হয়তো কোনো কষ্টই আর আমাদের ছুঁতে পারবে না।

কিন্তু এখনও সময় আছে। আমরা চাইলে বদলাতে পারি, বদলে যেতে পারি—একটা শেয়ার কম করে, একটা প্রতিবাদ বেশি করে। একটা ভিডিও না তুলে, একটা জীবন বাঁচানোর চেষ্টা করে।

প্রাণীর ওপর নির্যাতন কোনো বিনোদন নয়—এটা সরাসরি অপরাধ। এই ধরনের ভিডিও দেখলে শেয়ার করবেন না, রিপোর্ট করুন।আশেপাশে এমন কিছু ঘটলে চুপ থাকবেন না—প্রতিবাদ করুন। আপনার সন্তান, আপনার বন্ধু, আপনার চারপাশের মানুষকে শেখান—সহানুভূতি হারানো মানে মানুষ হওয়া হারানো।

মনে রাখবেন—
মানবিকতা একদিনে হারিয়ে যায় না, এটা হারায় একটু একটু করে…যখন আমরা চুপ থাকি, যখন আমরা দেখি, যখন আমরা কিছুই করি না। আজ যদি আমরা না থামি, তাহলে কাল এই নিষ্ঠুরতাই হবে স্বাভাবিক। নিষ্ঠুরতাই হবে বিকারগ্রস্ত বিনোদন।

তাই অমার্জিত, সস্তা জনপ্রিয়তার জন্য ছাপরি মার্কা ভাইরাল হওয়ার আগে, মানুষ হওয়া জরুরি।

লেখক :কবি ও গল্পকার,সহকারী শিক্ষক,
রমজান আলী আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়, মানিকগঞ্জ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *