নগর জীবন আজ বৈপরীত্যে ভরা। চারদিকে মানুষের ভিড়, উঁচু ভবন, ব্যস্ত সড়ক আর কোলাহল—তবুও মানুষের মনে বাড়ছে নিঃসঙ্গতা। শহরে মানুষ বাড়ছে ঠিকই, কিন্তু মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক দিন দিন কমে যাচ্ছে। একই ভবনে বহু পরিবার বাস করলেও কেউ কাউকে চেনে না। একই লিফটে উঠেও চোখে চোখ মেলে না। ব্যস্ততা আর ব্যক্তিকেন্দ্রিক জীবনের ভেতরে হারিয়ে যাচ্ছে মানবিক সম্পর্ক।
এক সময় পাড়া-মহল্লা ছিল সামাজিক বন্ধনের জায়গা। প্রতিবেশী মানেই ছিল আপনজন। বিপদে-আপদে সবাই পাশে দাঁড়াতো। এখন সেই চিত্র বদলে গেছে। ফ্ল্যাট সংস্কৃতিতে মানুষ গুটিয়ে নিচ্ছে নিজ নিজ ঘরে। দরজা বন্ধ থাকে, কিন্তু মোবাইল ফোন সারাক্ষণ খোলা। ভার্চুয়াল যোগাযোগ বাড়লেও বাস্তব সম্পর্ক কমে যাচ্ছে।
ঢাকার কারওয়ান বাজারে একটি বহুতল ভবনের ষষ্ঠ তলায় থাকেন রফিকুল ইসলাম। বয়স ৬২ বছর। তিনি একজন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা। তিন বছর আগে স্ত্রী মারা গেছেন। দুই ছেলে কর্মসূত্রে বিদেশে থাকেন। একই ভবনে শতাধিক মানুষ থাকলেও রফিকুল ইসলাম কার্যত একাই বসবাস করেন। সকালে উঠে নিজেই চা বানান, নিজেই খাবার গরম করেন। অসুস্থ হলে খবর নেওয়ার মানুষ পাওয়া যায় না।
তিনি বলেন, “আগে মানুষ এসে খোঁজ নিতো। এখন ফোন দিলেও সবাই ব্যস্ত। মনে হয় আমি কারও প্রয়োজন নই।” তার কথায় ক্ষোভ নেই, আছে নিঃশব্দ কষ্ট। শহরের হাজারো প্রবীণ মানুষ আজ এই একাকীত্ব নিয়ে বেঁচে আছেন, যা চোখে পড়ে না, কিন্তু প্রতিদিন ভেতরে ভেতরে মানুষকে নিস্তব্ধ করে দেয়।
অন্যদিকে নগর জীবনের তরুণ প্রজন্মও একাকীত্ব থেকে মুক্ত নয়। আরিফুর রহমান, বয়স ২৮। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত অফিসের চাপ। সপ্তাহ শেষে ছুটির নিশ্চয়তা নেই। তার বন্ধুর সংখ্যা কম নয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তিনি সক্রিয়। তবুও দিনের শেষে ঘরে ফিরে তিনি নিজেকে ভীষণ একা মনে করেন।
আরিফুর রহমান বলেন, “সোশ্যাল মিডিয়ায় সবাই আছে, কিন্তু কথা বলার মতো কেউ নেই। হাসি দেই, কাজ করি, কিন্তু মনে হয় কেউ আমাকে সত্যি বোঝে না।” আধুনিক শহরে তরুণদের এই নিঃসঙ্গতা মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠছে।
নগর জীবনের এই একাকীত্ব আসলে নীরব এক সংকট। আমরা সময়ের অজুহাতে সম্পর্ক এড়িয়ে চলছি। নিজের মতো থাকাকেই স্বাধীনতা ভাবছি। অথচ মানুষ সামাজিক প্রাণী। পারস্পরিক যোগাযোগ আর সম্পর্ক ছাড়া মানুষ টিকে থাকতে পারে না।
এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ খুব জটিল নয়। দরকার মানসিকতা বদলানো। প্রতিবেশীর সঙ্গে কথা বলা, প্রবীণ মানুষের খোঁজ নেওয়া, সহকর্মীর কথা মন দিয়ে শোনা—এসব ছোট উদ্যোগই বড় পরিবর্তন আনতে পারে। আবাসিক এলাকায় সামাজিক কার্যক্রম বাড়ানো, কমিউনিটি সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনা এবং পরিবারে সময় দেওয়া এখন সবচেয়ে বেশি জরুরি।
শহর আধুনিক হতেই পারে, কিন্তু মানবিক না হলে সেই শহর অর্থহীন। মানুষ শুধু দালান-কোঠায় বাঁচে না, মানুষ বাঁচে মানবিক সংবেদনশীলতার ভেতরেই। তাই নগর জীবনে সেই সম্পর্ক ফিরিয়ে আনা এখন সময়ের দাবি।
রাকিব হোসেন মিলন





















