তাহিয়া মেহ্জাবিন : ❝একবার যখন দেহ থেকে বার হয়ে যাবআবার কি ফিরে আসব না আমি পৃথিবীতে? আবার যেন ফিরে আসি কোনো এক শীতের রাতে একটা হিম কমলালেবুর করুণ মাংস নিয়ে কোনো এক মুমূর্ষুের বিছানার কিনারে।❞
মৃত্যুপথযাত্রীর চোখে উজ্জ্বল টইটম্বুর কমলা জীবনের বহমানতারই আহ্বান।হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে জীবনানন্দ যখন একটা কমলালেবু খেতে চাচ্ছেন,তখন তিনি নিজেও মুমূর্ষু। মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মৃত্যুর পরের কাঙ্ক্ষিত কমলারূপী নিজেকেই যেন খুঁজছিলেন তিনি।
জীবনানন্দ দাশ, নির্জনতার কবি, যার সারাটি জীবন কেটে গেছে নির্জনতার আড়ালেই এক ট্রাজেডি হয়ে। জীবনের বড় অংশটাই যেনো পরাজয়ের মতো মনে হয়েছে।জীবদ্দশায় খুব বেশি স্বীকৃতি পাননি।স্বীকৃতি না পাওয়ার কারণ কি ছিলো? হয়তো তার লেখার আঙ্গিক ছিলো সেই যুগের চেয়েও আরও কয়েকযুগ এগিয়ে, বোধয় তাই সেই সময়কার গুটিকয়েক মানুষ ছাড়া সবাই তার লেখার বিষয়বস্তু ধরতে পারেননি।সমালোচকেরা তাকে ‘অপ্রচলিত’, ‘অস্পষ্ট’ ইত্যাদি বলে ভুল বুঝেছেন। জীবনানন্দ তার জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে একবার নিজেই নোবেল ফরাসি লেখক আঁদ্রে জিদের জার্নাল থেকে একটা লাইন উদ্ধৃত করে বলেছিলেন, ‘I do not write for the coming generation but for the following one.’ তিনি যা লিখেছেন সমসাময়িক প্রজন্মের জন্য তো নয়ই দ্বিতীয় প্রজন্মের জন্যও নয়, লিখেছেন তৃতীয় প্রজন্মের জন্য।
‘আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে? কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে…’ যার কবিতা আজও আমাদের মনে অনুপ্রেরণা জোগায় সেই কুসুমকুমারী দাশ ছিলেন জীবননান্দের জননী। মায়ের হাত ধরেই লেখালেখির দুনিয়ায় অবতরণ করেছিলেন,মাঝে কিছু সময় বিপরীত নিলেও আর ফেরা হলো না লেখালেখির জগৎ ছেড়ে!কিন্তু জীবনের প্রায় পুরোটা সময়ই কেটে গিয়েছিল হতাশায়, পরাজয়ে, বেকার অবস্থায়। এমনকি সাংসারিক জীবনেও সুখী হতে পারেননি।
লিখেছেন বনলতা সেন, সেই নাটোরের বনলতা কি আসলেই কোনো নারী চরিত্র, নাকি তার কল্পনা মাত্র ছিল এ নিয়ে রয়েছে নানা আলোচনা-সমালোচনা। বাবা-মার মৃত্যুর পর তার মনে হয়েছিল বেঁচে থাকার বয়স কাছে এসেছে। ৭০ বছর হতে আরও ২০ বছর বাকি কিন্তু ৬০ বছর হওয়ার আগেই লিখে ফেললেন পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা। জীবনানন্দ হাজার হাজার পৃষ্ঠা লিখে গেছেন, প্রকাশ করেছেন সামান্য হাতে গোনা কয়েকটি আর বাকি সব তার একটি ট্রাম্পে রেখে গেছেন।যা তার মৃত্যুর পর ছাপানো হয়! এই নির্জনাতার কবি নির্জনে থেকেই লিখেছেন গোটা বিশেক উপন্যাস, শত গল্প আর অসংখ্য কবিতা।কি নেই তার লেখায় প্রেম, দ্রোহ, ভালোবাসা, দুঃখ, জীবনবোধ, প্রকৃতি, রাজনীতি, যুদ্ধ, বিপ্লব, স্বদেশপ্রেম সবই খুঁজে পাওয়া যায় তার লেখায়।
❝একজন কমলালেবু❞ বইটিতে জীবনানন্দ দাশের সামগ্রিক জীবনের চিত্র প্রতিফলিত হয়েছে। জীবনানন্দ দাশকে আবিষ্কারের লক্ষ্যে নেমেছেন শাহাদুজ্জামান।বইটির প্রথমে বইয়ের নামকরণ ‘একজন কমলালেবু’ রাখার কারণ না বুঝতে পারলেও বইয়ের শেষ দিকে অনায়াসে পাঠক বুঝে যাবেন।জীবনানন্দকে নিয়ে গভীরে জানতে, বুঝতে এই বইটি মাস্টারপিস! উপন্যাসের পাতায় জীবনানন্দকে এক রূপ দিয়েছেন শাহাদুজ্জামান।
উপন্যাসটির সূচনা হয় জীবনানন্দ দাশের ট্রাম্প দুর্ঘটনায় মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে। এরপর ধীরে ধীরে বইয়ের পাতায় খুঁজে পাওয়া যায় তার জীবনের নানা ট্রাজেডিময় অবস্থা। কিন্তু তাঁর মৃত্যু কি আসলেই কোনো দূর্ঘটনা না আত্মহত্যা বা হত্যাকান্ড? শূন্যে ভেসে আছে সেই অমীমাংসিত জিজ্ঞাসা!
বইয়ের লেখক : শাহাদুজ্জামান, প্রকাশনী : প্রথমা মুদ্রিত মূল্য : ৫২০ টাকা।
বুক রিভিউ লেখিকা : শিক্ষার্থী, রাজেন্দ্রপুর ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল ও কলেজ,গাজীপুর।





















