আফরিদা ইসলাম : ১৬ মে, বাংলাদেশের পরিবেশগত আন্দোলনের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় দিন। আজ থেকে ঠিক পাঁচ দশক আগে, ১৯৭৬ সালের এই দিনে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী-এর ডাকে লাখো মানুষ রাজশাহী থেকে ফারাক্কা অভিমুখে ঐতিহাসিক ফারাক্কা লংমার্চ-এ অংশ নিয়েছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল একটাই আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে গঙ্গা নদীর ওপর নির্মিত ফারাক্কা বাঁধের মাধ্যমে বাংলাদেশের উজানের পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করা এবং আমাদের নদীগুলোকে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করা।
আজ এত বছর পর এসেও ফারাক্কা দিবসের প্রাসঙ্গিকতা একটুও কমেনি, বরং নদীর বর্তমান দুর্দশা দেখে মনে হয় নদী বাঁচানোর ডাক আজ আগের চেয়েও অনেক বেশি জরুরি। নদীমাতৃক বাংলাদেশে নদী কেবল রূপসী বাংলার সৌন্দর্য নয়, নদী এদেশের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ও জীবনরেখা। কিন্তু ফারাক্কা বাঁধের কারণে শুষ্ক মৌসুমে আমাদের প্রধান নদী পদ্মাসহ এর শাখা-নদীগুলো পানি সংকটে ধুঁকতে থাকে।
নদী মারা গেলে একটি দেশের সভ্যতা ও সংস্কৃতি মারা যায়। নদী রক্ষা করা এখন আর কেবল পরিবেশবাদীদের শখের আন্দোলন নয়, এটি আমাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বহুমাত্রিক কূটনীতির মাধ্যমে অভিন্ন ৫৪টি নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ের চেষ্টা যেমন চালিয়ে যেতে হবে, তেমনি দেশের ভেতরের নদীগুলোকে রক্ষায় কঠোর হতে হবে। নদী দখলদারদের রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিচয় যাই হোক না কেন, তাদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে এবং বর্জ্য শোধনাগার (ETP) বাধ্যতামূলক করে নদী দূষণ বন্ধ করতে হবে।
প্রমত্তা পদ্মা আজ বহু জায়গায় ধু-ধু বালুচর। পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে লবণাক্ততা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে আমাদের কৃষিকাজ, সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য এবং সুপেয় পানির উৎসের ওপর। নদী শুকিয়ে যাওয়ার পেছনে আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি বা উজানের দেশের একতরফা পানি প্রত্যাহারের ভূমিকা যেমন সত্য, তেমনি আমাদের অভ্যন্তরীণ খামখেয়ালিপনাও কম দায়ী নয়।
আমরা একদিকে উজানের পানির ন্যায্য হিস্যা পাচ্ছি না, অন্যদিকে দেশের ভেতরের নদীগুলোকে নিজেদের হাতেই হত্যা করছি। প্রভাবশালী ভূমিদস্যুরা নদী ও খাল দখল করে আবাসন বা কলকারখানা গড়ে তুলছে, শিল্পাঞ্চলের নদীগুলো আজ বর্জ্যের ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে, বুড়িগঙ্গার কালো ও দুর্গন্ধযুক্ত পানি দেখে চেনার উপায় নেই যে এটি একসময় একটি জীবন্ত নদী ছিল। যেখানে সেখানে অপরিকল্পিত স্লুইস গেট, বাঁধ এবং সেতু নির্মাণের ফলে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ রুদ্ধ হচ্ছে। অথচ নদী কোনো জড় বস্তু নয়, আইনগতভাবেই নদী এখন একটি ‘জীবন্ত সত্তা’।
১৬’মে আমাদের কেবল অতীতের একটি আন্দোলনের কথা স্মরণ করিয়ে দেয় না, এটি আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুরক্ষার জন্য এক মহা সতর্কবার্তা। মওলানা ভাসানীর সেই ঐতিহাসিক লংমার্চের চেতনাকে বুকে ধারণ করে আজ দেশের প্রতিটি নাগরিককে নদী রক্ষায় সোচ্চার হতে হবে। রাষ্ট্র, সমাজ এবং সাধারণ মানুষ সবাইকে এক হয়ে শপথ নিতে হবে: “নদী বাঁচাবো, দেশ বাঁচাবো।” নদীগুলো আবার প্রাণ ফিরে পাক, কলকল ধ্বনিতে মুখরিত হোক ৫৬ হাজার বর্গমাইলের এই প্রিয় বাংলাদেশ।জায়গায় জায়গায় আমাদের নদনদীর গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা জাগিয়ে তুলতে হবে।এবং নদী নষ্ট হওয়ার পরবর্তী ভয়াবহতা সম্পর্কে সবাইকে জানাতে হবে।
লেখিকা : শিক্ষার্থী, ইডেন মহিলা কলেজ, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ,ঢাকা।





















