প্রতিভার লড়াই

সোনিয়া আবেদীন

লা ইল্লাহা ইল্লালা,
ভাবী কান্দে নিরালা।
কি গো ভাবী কান্দোস কে?
নুইরা আমায় মারছে কে।

সারা আফা আমারে আর চেতাই ও না , আমি মুরগী হ‌ইতে রাজি আছি। চঞ্চল মেয়ে সারা মেহের , সারাদিন ওর পাড়ার বন্ধুদের সাথে মাঠে ঘাটে ঘুরে বেড়াতে ওর কাজ। গ্ৰামে ওর একটা দল আছে আর দলের লিডার সে। নুরের কথায় সারা সহ দলের সবাই হেসে গড়াগড়ি খাচ্ছে , সারা এই দুষ্টু মেয়েটাকে জব্দ করতে পেরে খুশি।

বাড়িতে থাকলে টিভি দেখে আর আয়নার সামনে নাচতে থাকে ওর প্রধান কাজ । সাবিনা বেগম একজন গৃহিনী তার কাজ সংসার আর বাচ্চাদের দেখাশুনা করা। তবে তার একটা বদঅভ্যাস ছিল, অন্য বাচ্চাদের প্রতিভার সাথে নিজের বাচ্চাদের প্রতিভা যাচাই করা।

তিন সন্তানের জননী সাবিনা ভুলেই গেছে সব বাচ্চাদের প্রতিভা এক রকম না। বড় দুজন লেখাপড়ায় ভালো থাকলে কি হবে সারা ছিল সব চেয়ে দূর্বল । সারার কয়েটা ভালো গুন ছিল ছবি আঁকা , ওর প্রতিটা পেইটিং দেখলে মনে হত জীবন্ত। গানের গলা ছিল খুব সুন্দর , নাচের প্রতিভা ও কম ছিল না। মাহমুদ হাসান ছোটো মেয়েকে খুব ভালোবাসত ,তাইতো মেয়ের পছন্দের সব রং এনে দিত।

বাচ্চাদের লেখাপড়ার জন্য সাবিনা বাচ্চাদের নিয়ে শহর মুখি হয় , এতে সারা মানষিক ভাবে আরো ভেঙ্গে পড়ে।ওর গ্ৰাম ভালো লাগে, শহরের বন্দি জীবন ওর ছোটো মনটাকে ভেঙ্গে দিয়েছে।

সময়ের সাথে সাথে তিন ভাইবোন বড় হতে থাকে, আর দিন দিন সাবিনা বেগম রুক্ষ হতে থাকে। দুজনের কপালে মার না জুটলে কি হবে সারার কপালে যেনো সেটা প্রতিদিনের রুটিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

নবম শ্রেণীতে সারা এক বিয়ষে ফেল করে , স্কুল থেকে ডেকে ওর রেজাল্ট কার্ড দেওয়া হয় ।বাড়িতে এসে সারার কোনো কথা জিঘাংসা না করে লাঠি দিয়ে পিটাতে থাকে।

রাতে যখন মাহামুদ বাসায় আসে বড় ছেলে সায়েম ,ও মেয়ে সিফা বাবাকে বলে। মাহামুদ দৌড়ে মেয়ের কাছে যায় , গিয়ে দেখে জ্বরে মেয়ের ঘা পুড়ে যাচ্ছে। ফর্সা শরীরে সাবিনার প্রহার যেনো সেই সময়ের অত্যাচারে বর্ণনা দিচ্ছে।

মাহমুদ: সাবিনা তুমি কি মানুষ? কেউ তার সন্তানকে এই ভাবে মারতে পারে । আমি তোমাকে বলেছিলাম ওকে এতো প্রেসার দিও না , ওকে ওর মতো ছেড়ে দাও তাহলে দেখবে ও ঠিকি নিজেকে সব কিছুর সাথে মানিয়ে নিবে।

তুমি বেশি কথা বলো মাহমুদ , তোমার কারনে এই মেয়ের এই অবস্থা। কৈ ওরা এতো ভালো করে কিভাবে , সব হয়েছে এই পেইটিং ,নাচ গানের কারনে। আজ থেকে ঐ মেয়ের এই সব বন্ধ , ওর কারনে আমি কারো সামনে মুখ দেখাতে পারিনা। লেখাপড়ায় এতো খারাপ ভাবা যায় , তুমি ওর হয়ে উকালতি করবে না ।

মাহমুদ সাবিনার সাথে কোনো কথা বলে না , মেয়ের কাছে চলে যায় । সেই প্রহারের পড়ে সারা সাতদিন জ্বরে ভুগে ,কিন্তু এই সাতদিন সাবিনা ওর কাছে যায়নি।

তারপর যেনো সারার জীবন চক্র পাল্টে গেলো , সারাদিন এই প্রাইভেট ঐ কোচিং করতে করতে ওর চঞ্চল ভরা শৈশবটা থেমে গেল। ওর চোখের সামনে ওর রং তুলি গুলো ফেলে দেওয়া হল , ও অনেক আকুতি করে বলেছিল।

আম্মু এই গুলো ফেলো না, আমি এখন থেকে ঠিক মতো পড়বো। কিন্তু মেয়ের এতো এতো আকুতি সাবিনার পাথর মনকে গলাতে পারেনি।

এক সময় সারা যেনো রোবটে পরিনত হল , মনের ভিতরের কোনো কিছু যেনো ওকে আর ছুঁতে পারে না । পরিবারের সবচেয়ে দূর্বল সদস্য বলে সাবিনা ওকে বাহিরের কোনো অনুষ্ঠানে নিয়ে যায় না।এটা নিয়ে মাহমুদ সাবিনার সাথে অনেক ঝ*গড়া করে কিন্তু লাভ হয় না , মাহমুদ মেয়ের পাশে থাকে , মেয়ের মনকে বোঝার চেষ্টা করে ।

একদিন গভীর রাতে মাহমুদের ঘুম ভেঙ্গে গেল, তখন উঠে ছোটো মেয়ের ঘরে যায়। গিয়ে দেখে মেয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে , চোখে পানি। মাহমুদ মেয়ের কাছে যায় , কিরে মা ঘুমাসনি।

না বাবা ঘুম আসছে না , পড়ছিলাম তো , কাল থেকে পরীক্ষা। এইবার টেষ্টে যদি দ্বিতীয় স্থান না করি তাহলে আমার যে টিকে থাকা মুসকিল হয়ে যাবে।

মাসমুদ: এতো প্রেসার নিতে হবে না তুই ঘুমা , এইবার তোর মায়ের সাথে আমার ফাইট হবে।ওকে কিছু বলিনা বলি ও তোর সাথে যা ইচ্ছা তাই করতে পারেনা।

আব্বু আমি কি তোমাকে একটু জড়িয়ে ধরতে পারি , আমার না আজকাল কেমন খালি খালি লাগে। আব্বু আমি চেষ্টা করেও আম্মুর মনের মতো হতে পারিছিনা , মাহমুদ মেয়ের মলিন মুখটা দেখে অনেক মায়া হয় , কিছুক্ষন মেয়েকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে দেন।

সাবিনা: মাহমুদ রুমে আসে , কোথায় গিয়েছিলে, তোমার আদরের দুলালির কাছে। মেয়েটাকে এতোটা মাথায় উঠিও না পরে নাক কাটবে। লেখাপড়া বাদে সে সব বিষয়ে পারর্দশী , আমরা বাবা মা কি চাই ওদের কাছে শুধু একটু ভালো রেজাল্ট তাই তো। অথচ আমরা ওদের ভালো ভাবে চলার জন্য কতো কিছু করছি , বিনিময়ে ওরা এইটা পারবে না।

মাহমুদ : তোমাকে বোঝানোই বেকার সাবিনা , সব বাচ্চাদের মেধা এক না। সারার পেইটিং দেখছ কতো সুন্দর , ও ভালো গাইতে পারে , নাচতে পারে।

সেটাই তো বললাম ও এই সব ফালতু বিষয়ে পাক্কা কিন্তু লেখাপড়ার বিষয়ে,,, থাক সে কথা ,তুমি ওর আর আমার মাঝে এসো না। ও রেজাল্ট খারাপ করে কেমন করে আমি এইবার দেখবো।

পরের দিন থেকে পরীক্ষা শুরু হয় , পরিক্ষা দিয়ে এসে সারা চিন্তায় থাকে। কাল রেজাল্ট দিবে, আর কালকেই ওর বাঁচা মরার বিষয়ে নিধারন করবে।
রাতের অন্ধকারে দুর আকাশের দিকে বলে , হে খোদা আমি আর পারছিনা , আমাকে তুমি মুক্তি দাও।

আমি গাইতে চাই, নাচতে চাই , নিজের মনের কথা তুলিতে প্রকাশ করতে চাই। কিন্তু মা আমাকে এইসব কিছু করতে দেয়না , আমি এই বন্দী জীবন চাই না। আমি গ্ৰামের মেঠো পথে বন্ধুদের সাথে ঘুরতে চাই , পুকুরে গোসল করতে চাই , শীতে কুয়াসা ভরা সকালে খেঁজুরের রস খেতে চাই। আমি মুক্ত পাখি হয়ে ঘুরতে চাই , আমি একটু মুক্ত আকাশে শ্বাস নিতে চাই।

আমার দ্বারা আর হচ্ছে না , আমি তার মনের মতো হতে পারছি না।আমি এই জীবনের প্রতি,,,,,হুহুহু। আমাকে এই সব ঝামেলা থেকে মু*ক্তি দিন , আজ স্কুল থেকে আসার সময় রং তুলি নিয়ে আসে । আজ কেন যানি মনটা ওর ভালো লাগছে , সারারাত জেগে একটা পেইটিং বানায়। কালো কাপর দিয়ে ডেকে ঘুমাতে যায় , আজ মুখে হাসি নিয়ে ঘুমায়। যেনো কালকের সকাল ওকে জীবনের খুব বড় কিছু নিয়ে আসবে ।

সকালে সাবিনা ওকে ডেকে যায় কিন্তু সারা উঠে না , আধা ঘন্টা পরে ও যখন টেবিলে আসে না তখন রুমে এসে লাইট অন করে। দেখে সারা এখনো শুয়ে আছে আর রাতে যে পেইটিং করেছে সেগুলো ঐভাবে রাখা। মুহুর্তে সাবিনা রেগে যায় , রাতে না পড়ে পেইটিং করে এখনো ঘুমিয়ে আছে।

সারাকে বিছানা থেকে টেনে তুলে বসায় , মুহুর্তে সাবিনা চমকে উঠে। সারা শরীর এতো ঠান্ডা কেন, ও আবারো বিছানায় পড়ে গেল কেন । এমন করে পড়ে আছিস কেনো, বলে আবারো মেয়ের শরীরে হাত দেয় , তারপরে নাকের কাছে হাত দিতে গিয়ে দেখে , নাকের পাশে র*ক্ত গড়িয়ে পরেছে।

সাবিনার চিৎকার সবাই সারার রুমে আসে ,যখন সারার নাকে র*ক্ত দেখে সবাই ভয় পেয়ে যায়। মেয়ে নড়াচড়া করে না , তারপরেও হাসপাতালে নিয়ে যায়। ডাক্তার দেখে বলে সে অনেক আগেই স্টোক করে মারা গেছে , তারা ভেবে পায়না এতোটুকু বয়সে এতো কিসের প্রেসার ছিল।

ডাক্তার বলে মেয়েটার এতো প্রেসার ছিলো কিসের , এতো অল্প বয়সে স্টোক করে কেউ । অন্য কোনো কিছু নিয়ে কি সমস্যা ছিল , ধরেন বয়ঃসন্ধি কাল এই বয়সে কারো সাথে,,,,,

মাহমুদ মেয়ের হাতটা ধরে বলে , না ডাক্তার আমার মা তো অতিরিক্ত প্রেসারে মরে গেছে। সারা দিন এই পড়া সেই প্রাইভেট , জীবন থেকে ওর সমস্ত খুশিই চলে গিয়েছিল। ওর তো বেঁচে থাকার কারনটা ঐ মহিলা কেড়ে নিয়েছে।

মেয়ের নিথর দেহটা নিয়ে বাসায় আসে , সাবিনা ভাবতেই পারছে না তার মেয়ে তার কারনে মরে গেল । মেয়ের ধরতে আসলে মাহমুদ চিৎকার করে বলে , ছুবে না তুমি তোমার কারনে আমার ফুলের মতো মেয়েটা আজ নেই । তুমি মেয়েটাকে এতো এতো চাপ দিয়েছো , মেয়েটা তোমার চাপ নিতে পারেনি। তুমি ওর কাছে থেকে ওর শৈশবটা কেড়ে নিয়ে প্রতিভার লড়াইতে নামিয়ে দিয়েছো।

সাবিনা স্বামীর এই কটু কথা সহ্য করতে পারেনা , দৌড়ে সারার রুমে চলে যায়। চোখের সামনে দেখতে পায় মেয়ের সেই পেইটিংটা , চমৎকার একটা পেইটিং। ছবিটা মেয়েটার একা বসে থাকতে দেখা গেল, কাছে গিয়ে দেখে মেয়েটার চেহারা সারার সাথে মিলে। সেখানে ছোটো একটা বার্তা লেখা , “মুক্তির স্বাদ ” ।

সাবিনা বুঝতে পারে সে মেয়েকে মানষিক ভাবে এতো চাপ দিয়েছে যার কারনে মেয়েটা তার অকালে চলে যায়। কিছুদিন পরে একটা ডাইরি পায়, সেখানে নিজের ইচ্ছা গুলোর কথা লেখা ছিল। এমনকি মায়ের এই প্রতিভার লড়াইয়ে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারেনা বলে ও এই দুনিয়া থেকে মুক্তি চেয়েছে। কিছু দিন পরে মেয়ের রেজাল্ট হাতে পায় এইবার তার মেয়ে প্রথম হয়েছে।

১.সন্তানের স্বভাব ও আগ্রহ বুঝতে হবে ।
২. তুলনা একেবারে বন্ধ করতে হবে।
৩. বাস্তবসম্মত প্রত্যাশা রাখতে হবে।
৪. শেখার আনন্দ তৈরি করতে হবে ।
৫. বিশ্রাম ও খেলাধুলার সময় দিতে হবে।
৬. ভুল করার সুযোগ দিন তবেই সে সঠিকের মাপকাটি করতে শিখবে।
৭. সন্তানের সাথে খোলামেলা কথা বলতে হবে তবেই সে তার ভিতরের ভয়টা দুর করে আপনার সাথে বন্ধু রুপে কথা বলবে।
৮. নিজের অপূর্ণ স্বপ্ন চাপিয়ে দেওয়া যাবে না।
৯. প্রশংসা করুন, কিন্তু শর্তহীনভাবে শুধু ভালো রেজাল্টে নয় চেষ্টা করলে, পরিশ্রম করলে সেটাও প্রশংসা করুন।
১০. মানসিক স্বাস্থ্যের দিকে খেয়াল রাখতে হবে , যাতে ও ভাবে আমার পাশে আমার বাবা মা আছে।

সন্তানকে প্রতিযোগিতার যন্ত্র না বানিয়ে, একজন আত্মবিশ্বাসী ও সুখী মানুষ হিসেবে গড়ে তোলাই আমাদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। কিন্তু আমরা সেটা না করে সন্তানদের মেধা রেজাল্ট কার্ডের উপরে ছেড়ে দেই। বাচ্চাদের শৈশব নষ্ট করবেন না , বাচ্চারা নিজেইরা নিজেদের আলোতে জ্বলে উঠবে। তাকে যদি নিজের ইচ্ছার আলোতে আলোকিত করতে যান তাহলে সেই আলো বেশিক্ষন পৃথিবীকে আলোকিত করতে পারেনা।

( সমাপ্ত )

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *