পাঠ্যাভ্যাসের মৃত্যু ও একটি নির্বাক প্রজন্মের উত্থান

শেখ সুলতানা মীম : বই আমাদের পরম বন্ধু—এই কথাটি আমরা ছোটবেলা থেকেই শুনে আসছি। প্রাচীনকাল থেকে জ্ঞানী, দার্শনিক, কবি ও সাহিত্যিকরা বারবার এই সত্য উচ্চারণ করেছেন। মানুষের জ্ঞান অর্জনের ইতিহাসে বইয়ের গুরুত্ব অপরিসীম। বই পড়েই মানুষ মহৎ হয়েছে, জ্ঞানীরা জ্ঞানের গভীরে পৌঁছেছে, আর কবি-লেখকেরা তাদের চিন্তা ও সৃজনশীলতাকে শাণিত করেছেন। একটি বিষয়ে সবাই একমত—জ্ঞান অর্জনের প্রধান উপায় হলো বই পড়া; যত বেশি পড়া যায়, তত বেশি জানা যায়। ইংরেজ দার্শনিক Francis Bacon তার বিখ্যাত প্রবন্ধ Of Studies-এ পড়াশোনার গুরুত্ব ও প্রভাব নিয়ে গভীর আলোচনা করেছেন এবং বলেছেন যে পড়াশোনা মানুষের চিন্তাশক্তিকে উন্নত করে, বিচারবোধকে পরিণত করে ও ব্যক্তিত্বকে সমৃদ্ধ করে। এই দৃষ্টিভঙ্গি আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক, কারণ বই মানুষকে শুধু তথ্য দেয় না, বরং তাকে চিন্তা করতে শেখায়, প্রশ্ন করতে শেখায় এবং সত্য অনুসন্ধানের মানসিকতা তৈরি করে। বই পড়ার মাধ্যমে মানুষ কেবল জ্ঞান অর্জন করে না; বরং নিজের চিন্তাশক্তিকে শাণিত করে, অন্তর্নিহিত সৃজনশীলতাকে জাগিয়ে তোলে এবং আত্মবিশ্বাসকে দৃঢ় করে। একটি ভালো বই মানুষের মানসিক জগৎকে প্রসারিত করে, তাকে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি দেয় এবং তার ভেতরের মানবিক গুণাবলিকে বিকশিত করে। পাশাপাশি বই মানুষের মধ্যে মূল্যবোধ, সততা এবং নৈতিকতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এবং একজন মানুষকে সঠিক পথে পরিচালিত করে জীবনের লক্ষ্য নির্ধারণে সহায়তা করে। প্রচলিত প্রবাদ—“পড়াশোনা করে যে, গাড়ি-ঘোড়ায় চড়ে সে”—এই সত্যকেই প্রতিফলিত করে, যা কেবল অর্থনৈতিক সাফল্যের নয় বরং জ্ঞানের মাধ্যমে উন্নত ও সম্মানজনক জীবনের ইঙ্গিত দেয়। শিক্ষার্থীদের জন্য পাঠ্যাভ্যাস গড়ে তোলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, আত্মউন্নয়নমূলক বই, দার্শনিক চিন্তাধারা এবং সামাজিক-রাজনৈতিক বিষয়ভিত্তিক বই তাদের চিন্তাশক্তিকে প্রসারিত করে এবং একটি বিস্তৃত দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করে। এর ফলে তারা শুধু নিজের দেশের নয়, বরং বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সংস্কৃতি, রাজনীতি ও অর্থনীতি সম্পর্কে ধারণা লাভ করতে পারে এবং একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। কিন্তু বর্তমান সময়ে প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে পাঠ্যাভ্যাস ধীরে ধীরে বিলুপ্তির পথে এগিয়ে যাচ্ছে। মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং অনলাইনভিত্তিক বিনোদন মানুষের জীবনে এমনভাবে প্রবেশ করেছে যে বই পড়ার প্রতি আগ্রহ ক্রমশ কমে যাচ্ছে। একসময় মানুষ অবসর সময় বই পড়ে কাটাত, কিন্তু এখন সেই স্থান দখল করে নিয়েছে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টিকটক, ইউটিউব ও হোয়াটসঅ্যাপের মতো প্ল্যাটফর্ম। প্রযুক্তি একদিকে যেমন জ্ঞান অর্জনের নতুন সুযোগ সৃষ্টি করেছে, অন্যদিকে মানুষের মনোযোগ ও ধৈর্য কমিয়ে দিয়েছে। বর্তমানে মোবাইলের মাধ্যমে খুব সহজেই বইয়ের পিডিএফ পাওয়া যায়, ফলে বই মানুষের হাতের মুঠোয় চলে এসেছে, কিন্তু বাস্তবে মানুষ বই পড়ার প্রতি আগ্রহ হারাচ্ছে, কারণ একই ডিভাইসে নানা বিনোদনমূলক উপাদান থাকায় তারা সহজেই বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। বিশেষ করে ছোট ছোট ভিডিও বা রিলস দেখার অভ্যাস মানুষের মস্তিষ্ককে এমনভাবে প্রভাবিত করছে যে তারা দীর্ঘ সময় ধরে কোনো একটি বিষয়ে মনোযোগ ধরে রাখতে পারছে না এবং ফলে বই পড়ার মতো ধৈর্যনির্ভর কাজে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসক্তির কারণে মানুষ বাস্তব জীবন থেকে দূরে সরে যাচ্ছে এবং ভার্চুয়াল জগতে নিমজ্জিত হচ্ছে, যার ফলে তাদের চিন্তাশক্তি, বিশ্লেষণ ক্ষমতা এবং সৃজনশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম এই সমস্যার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী, কারণ তারা ধীরে ধীরে গভীর জ্ঞানের চর্চা থেকে সরে গিয়ে অগভীর ও তাৎক্ষণিক বিনোদনের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। এর ফলে তারা তথ্য জানলেও তা বিশ্লেষণ করতে পারছে না এবং গভীরভাবে চিন্তা করার ক্ষমতা হারাচ্ছে। বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা যদি সম্পূর্ণভাবে অনলাইননির্ভর হয়ে যায়, তবে এর ক্ষতির দিকই বেশি হতে পারে, কারণ শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার চেয়ে অন্যান্য ওয়েবসাইট ও অ্যাপে বেশি সময় ব্যয় করবে এবং তাদের শিক্ষাজীবন ব্যাহত হবে। এই প্রযুক্তিনির্ভর জীবনযাত্রার কারণে মানুষ ক্রমশ ঘরকুনো, অলস ও একাকী হয়ে পড়ছে এবং তাদের সামাজিক যোগাযোগ ও বাস্তব অভিজ্ঞতা কমে যাচ্ছে, যার ফলে মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এর ফলস্বরূপ একটি নির্বাক, চিন্তাহীন ও অনুভূতিহীন প্রজন্ম গড়ে ওঠার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে, যারা হয়তো অনেক কিছু দেখবে ও জানবে, কিন্তু গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারবে না। দেশ ও সমাজের উন্নয়নমূলক কাজে অংশগ্রহণ করতে পারবে না, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারবে না এবং জোরালো ভাবে তাদের মতামত ব্যাক্ত করতে পারবে না। ফলে ধীরে ধীরে দেশ তার ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ধ্বংস হতে দেখবে কিন্তু কিছুই করার থাকবপ না। তাই এখনি সময় এই সমস্যার দ্রুত সমাধানের উপায় খুঁজে বের করা। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সমাজকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে, শিশুদের ছোটবেলা থেকেই বই পড়ার প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি করতে হবে এবং তাদের হাতে মোবাইলের পরিবর্তে বই তুলে দিতে হবে। পাশাপাশি প্রযুক্তির সঠিক ও সীমিত ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে, যাতে তারা বিনোদন ও শিক্ষার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে পারে। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্টানে পাঠাগার স্থাপন করতে হবে এবং বিভিন্ন প্রতিযোগিতার আয়োজন করতে হবে যেন শিক্ষার্থীরা বই পড়তে আগ্রহী হয়। পাশাপাশি প্রতিযোগিতায় পুরস্কার বিভিন্ন বই নির্ধারণ করা যেতে পারে যাতে সকলে অংশগ্রহণ করে এবং নিজেদেরকে বই পড়ার জন্য উৎসাহিত করে। সর্বোপরি বলা যায়, বই মানুষের জীবনের আলোকবর্তিকা, এবং প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক না কেন বইয়ের বিকল্প কখনোই হতে পারে না; তাই পাঠ্যাভ্যাসকে পুনরুজ্জীবিত করা এখন সময়ের দাবি, নইলে আমরা এমন একটি প্রজন্মের মুখোমুখি হব, যারা কথা বলতে পারবে কিন্তু ভাবতে পারবে না, তথ্য জানবে কিন্তু প্রকৃত জ্ঞান অর্জন করতে পারবে না। তাই সকলকে পাঠ্যভাস গড়ে তোলার জন্য আগ্রহী করতে হবে যাতে রাষ্ট্র একটি শিক্ষিত সমাজ এবং যোগ্য, সৎ, মানবিক নাগরিকদের মাধ্যমে তার উপযুক্ত নেতৃত্বকারীদের খুঁজে পায় যারা দেশকে উন্নতির শিখরে পৌঁছাতে সাহায্য করবে।

লেখিকা : শিক্ষার্থী, ইডেন মহিলা কলেজ (ইংরেজি বিভাগ), ঢাকা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *