শেখ সুলতানা মীম : গ্রামীণ অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্যে সার্কোলার ইকোনমি একটি বিশ্বব্যাপী সম্ভবনাময় গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। যার জনপ্রিয়তা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে, বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো কৃষিনির্ভর দেশে যেখানে অর্থনীতির শিকর এখনো গভীরভাবে গ্রামের সাথে সম্পর্কযুক্ত। সভ্যতার সূচনালগ্ন থেকেই অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে পরিচিত গ্রামীণ সমাজের অর্থনীতি।
সমাজের মানুষের জীবনযাত্রা, উৎপাদন ও সামাজিক ভিত্তি গড়ে তুলেছে গ্রামীণ অর্থনীতি। আদিযুগ থেকে বর্তমান আধুনিক যুগের সভ্যতা এখনো গ্রামীণ অর্থনীতির উপর নির্ভরশীল। অর্থনীতির বীজ বপন হয়েছিল গ্রামের মানুষের হাত ধরে আর সেখান থেকেই আজকের এই আধুনিক জনপদ গড়ে ওঠেছে। প্রাচীনকালে মানুষ যখন গোহায় বসবাস করতো তখন শিকার ছাড়া তাদের আর কোনো খাদ্য সরবরাহ করার উপায় ছিল না। কিন্তু গ্রামীণ অর্থনীতি নব উদিত সূর্যের মতো আবির্ভাব হয়ে তাদেরকে আলোর পথ দেখিয়েছে, উন্নত জাতি হিসেবে ঘরে উঠতে সাহায্য করেছে। সেই ধারা অব্যাহত রাখার মাধ্যমেই আজকের নগর সভ্যতা গড়ে ওঠেছে।
বর্তমানে আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে প্রায় সকল ক্ষেত্রে। শিল্প, সংস্কৃতি, অর্থনীতিসহ প্রায় সকল স্তরেই আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার করা হচ্ছে। কিন্তু এতসব আধুনিকতার আয়োজন থাকলেও বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতি গতি যেন প্রায় অচল। এই অবস্থার পেছনে অনেকগুলো কারণ বিদ্যমান। তাদের মধ্যে সর্বপ্রথম ও প্রধান কারণ হলো গ্রামীণ অর্থনীতির কারিগরদের অজ্ঞতা ও অদক্ষতা এবং লুকায়িত কর্মসংস্থান।
বাংলাদেশের বেশিরভাগ গ্রামের মানুষই নিরক্ষর, দরিদ্র এবং অদক্ষ। তাদের মধ্যে যারা কিছুটা শিক্ষিত হয় তারা আবার চলে আসে শহর এলাকায় বিভিন্ন চাকরির খোঁজে। যার ফলে গ্রামীণ অর্থনীতির কারিগর হিসেবে সেই নিরক্ষর ব্যাক্তিরাই রয়ে যায়। তাদের আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার সম্পর্কে ধারণা খুবই কম যার ফলে কৃষি কাজে এবং ক্ষুদ্র শিল্পে তারা আধুনিক প্রযুক্তির সঠিক ব্যাবহার করতে পারছেন না। যার প্রভাব পড়ছে সরাসরি উৎপাদন সক্ষমতার উপরে। আধুনিক যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে না পারলে উৎপাদন ক্রমশ হ্রাস পায় এবং দেশের অর্থনীতির চাকা থমকে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়।
গ্রামের কৃষকরা অনেক সময় জমিতে অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যাবহার করেন কিংবা একই জমিতে বারবার একই ফসল উৎপাদন করেন যার ফলে উৎপাদন খরচ বাড়লেও উৎপান বাড়ে না এবং কৃষকরা তাদের ন্যাযমূল্য থেকে বঞ্চিত হন। সম্পদের সঠিক ব্যাবহার সম্পর্কে ধারণা কম থাকায় ধীরে ধীরে গ্রামীণ অর্থনীতি স্থবির হয়ে যাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে সার্কুলার ইকোনমি একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি হিসেবে সামনে এসেছে, যা গ্রামীণ অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করার সম্ভাবনা তৈরি করছে।
সার্কুলার ইকোনমি মূলত এমন একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা যেখানে উৎপাদন, ভোগ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা একটি বন্ধ চক্রের মধ্যে আবর্তিত হয়, ফলে সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত হয় এবং অপচয় কমে আসে। প্রচলিত লিনিয়ার ইকোনমি যেখানে ‘নেও–তৈরি–ফেলে দাও’ নীতিতে পরিচালিত হয়, সেখানে সার্কুলার ইকোনমি ‘নেও–তৈরি–ব্যবহার–পুনঃব্যবহার’ ধারায় বিশ্বাসী।
এই ধারণা গ্রামীণ অর্থনীতিতে প্রয়োগ করলে কৃষিজ বর্জ্য, গৃহস্থালির অবশিষ্টাংশ, পশুপালনের উপজাত এবং ক্ষুদ্র শিল্পের বর্জ্যকে নতুন সম্পদে রূপান্তর করা সম্ভব। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় ধানের তুষ, খড় কিংবা গোবর থেকে জৈব সার বা বায়োগ্যাস উৎপাদন করা যেতে পারে, যা একদিকে কৃষি উৎপাদন বাড়াবে, অন্যদিকে জ্বালানি সংকট কমাবে। একইভাবে পাটের আঁশ, নারকেলের খোসা কিংবা অন্যান্য প্রাকৃতিক উপকরণ ব্যবহার করে পরিবেশবান্ধব পণ্য তৈরি করা সম্ভব, যা দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা তৈরি করতে পারে।
সার্কুলার ইকোনমির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে। গ্রামে যদি পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ ও ক্ষুদ্র শিল্প গড়ে ওঠে, তাহলে স্থানীয় মানুষ নিজেদের এলাকাতেই কাজের সুযোগ পাবে, শহরমুখী প্রবণতা কমবে এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক ভারসাম্য বজায় থাকবে। এছাড়া এটি পরিবেশ সংরক্ষণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, কারণ বর্জ্য কমে যাওয়ার ফলে মাটি, পানি ও বায়ু দূষণ হ্রাস পায়। বাংলাদেশ বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা একটি দেশ, তাই পরিবেশবান্ধব অর্থনৈতিক মডেল গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি। তবে সার্কুলার ইকোনমি বাস্তবায়নের পথে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। এ বিষয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতার অভাব রয়েছে। অনেকেই এখনো বর্জ্যকে সম্পদ হিসেবে ভাবতে শেখেনি। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণের অভাব রয়েছে, যা গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে এই ব্যবস্থার সাথে সম্পৃক্ত হতে বাধাগ্রস্ত করে এবং সেই সাথে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগের ঘাটতি রয়েছে। এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলার জন্য প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট নীতিমালা, পর্যাপ্ত বিনিয়োগ এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা।
সরকার যদি গ্রামীণ পর্যায়ে প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করে, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করে এবং সার্কুলার অর্থনীতিভিত্তিক শিল্প স্থাপনে উৎসাহ দেয়, তাহলে এই খাত দ্রুত বিকশিত হতে পারবে। পাশাপাশি শিক্ষাব্যবস্থায় পরিবেশ ও টেকসই অর্থনীতির ধারণা অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন, যাতে নতুন প্রজন্ম এই চিন্তাধারায় অভ্যস্ত হয়ে ওঠে। গণমাধ্যম ও সামাজিক উদ্যোগের মাধ্যমেও সচেতনতা বৃদ্ধি করা যেতে পারে। তাছাড়াও সাম্প্রতিক সময়ে সরকার কর্তৃক গৃহীত কৃষক কার্ড, খাল খনন, গ্রামীণ সমাজে কর্মসংস্থান সৃষ্টিসহ বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রামীণ অর্থনীতির ভিত্তিকে নতুনভাবে গড়ে তুলবে। সেই সাথে শিক্ষিত তরুণদের গ্রামীণ স্টার্টআপে উৎসাহিত করা এবং সুযোগ সৃষ্টি করে দেওয়ার মাধ্যমেও গ্রামীণ অর্থনীতি সচল হবে।
সর্বোপরি, গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে হলে শুধু প্রযুক্তি বা অর্থায়নই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন একটি দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। মানুষকে বুঝতে হবে যে সম্পদ সীমিত, তাই এর সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করাই টেকসই উন্নয়নের পথ। সার্কুলার ইকোনমি সেই পথেরই একটি কার্যকর নির্দেশনা দেয়। যদি সঠিকভাবে পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে এটি বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতে একটি গেমচেঞ্জার হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে। গ্রাম আবারও হয়ে উঠতে পারে উৎপাদনের কেন্দ্র, কর্মসংস্থানের উৎস এবং টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি, যা পুরো দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে।
লেখিকা : শিক্ষার্থী,ইডেন মহিলা কলেজ (ইংরেজি বিভাগ), ঢাকা।





















