তাপস মজুমদার
মহাসিন্ধুর ওপারের সঙ্গীতের অপূর্ব সুরমূর্ছনা আমরা শুনেছি কমল দাশগুপ্তের অপার কল্যাণে। এবার বুঝি অধীর আগ্রহে কান পেতে থাকতে হবে মহাশূন্যের মহাসঙ্গীত শোনার জন্য। তবে তার আগে মহাশূন্য বলতে ঠিক কী বোঝায় তা যৎকিঞ্চিৎ ব্যাখ্যা করা ভাল। তারও আগে অনুমান করা যেতে পারে যে, বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডকে বাইরে থেকে অবলোকন করলে একে ঠিক কেমন দেখায়? প্রকৃতপক্ষে মহাশূন্য সুবিশাল সুবৃহৎ একটি চাকতির মতো, অথবা সুপরিসর ক্রমাগত সম্প্রসারমান একটি ভারি ত্রিপলের মতো, রং নিকষ অন্ধকারাচ্ছন্ন হওয়াই অধিকতর সঙ্গত। সেখানে একাধিক সূর্য, তারা, গ্রহ, উপগ্রহ, গ্রহাণু, ধূমকেতু, নিহারীকা ব্ল্যাকহোল বিভিন্ন রকম গতিবেগে ক্রমাগত ভেসে বেড়াচ্ছে, ছুটছে দিগি¦দিক, কখনো কাছে টানছে, কখনো দূরে ঠেলছে, কখনো একে অপরের সঙ্গে লিপ্ত হচ্ছে সংঘাত-সংঘর্ষে, আবার কখনোবা একটি আরেকটির মধ্যে বিলীন হয়ে যাচ্ছে অবলীলাক্রমে। সেক্ষেত্রে ত্রিপল বা চাকতি যা-ই বলি না কেন, এটি কি একেবারেই ফাঁকা তথা শূন্য? প্রচলিত পদার্থবিজ্ঞান ও সৃষ্টিতত্ত্ব মানলে, একেবারে শূন্য বা ফাঁকা থাকা সম্ভব নয়। এর মর্মমূলে অবশ্যই থাকার কথা কোনো একটি মাধ্যমের- যে মাধ্যমে সৃষ্টি, স্থিতি (স্পেস), কাল (টাইম বা সময়) ও লয় একাকার হয়ে যায়। একে বলে গ্র্যাভিটেশনাল ওয়েভ বা মহাকর্ষীয় তরঙ্গ। স্রোতও বলা যেতে পারে।
বিজ্ঞানীদের অনুমান, প্রাইমর্ডিয়াল গ্র্যাভিটি ওয়েভ সৃষ্টি হয়েছিল বিগ ব্যাং থেকে এক হাজার ৪০০ কোটি বছর আগে। অবশ্য একেবারে নির্ভুল হিসাব কষে সুনির্দিষ্ট সন-তারিখ বের করা বুঝি অসম্ভব। যা হোক এক শ’ বছর আগে মহাবিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন এ সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন তার জেনারেল থিওরি অব রিলেটিভিটি বা আপেক্ষিকতাবাদে। এই তত্ত্বের গাণিতিক পূর্বাভাস মিলেছিল আগেই, চার বছরের মধ্যে। ১০০ বছর পর মিলেছে পাথুরে প্রমাণ। অর্থাৎ, গ্র্যাভিটেশনাল ওয়েভ বা মহাকর্ষ তরঙ্গের হদিস মিলেছে। এতদিন পর্যন্ত গবেষকরা মহাবিশ্বকে তড়িৎ চৌম্বক তরঙ্গ বা ইলেকট্রো ম্যাগনেটিক ওয়েভের ধারণা নিয়েই বিবেচনা করেছেন। এখন বিবেচনা করতে হবে মহাকর্ষীয় তরঙ্গের নিরিখে। মহাকর্ষীয় এই তরঙ্গকে শনাক্ত করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের লেজার ইন্টারফেরোমিটার গ্র্যাভিটেশনাল ওয়েভ অবজারভেটরির (লিগোর) এক দল বিজ্ঞানী, যার মধ্যে বাংলাদেশ-ভারতসহ বিশ্বের কমপক্ষে এক হাজার গবেষক জড়িত। বাংলাদেশি দুজন গবেষকের নাম ড. দীপঙ্কর তালুকদার এবং ড. সেলিম শাহরিয়ার। ভূগর্ভে স্থাপিত লিগোরের অতি সূক্ষ্ম যন্ত্রপাতির মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা ১৩০ কোটি আলোকবর্ষ দূরে দুটি কৃষ্ণগহ্বরের (ব্ল্যাকহোল) সংঘর্ষের ফলে সৃষ্ট মহাকর্ষীয় তরঙ্গ শনাক্ত করেন ২০২৫ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর। উল্লেখ্য, আলো সেকেন্ডে ১ লাখ ৮৬ হাজার মাইল গতিতে চলে এক বছরে যত দূর যায়, তাই এক আলোকবর্ষ দূরত্ব। দীর্ঘ কয়েক মাস গবেষণার পর বিজ্ঞানীদের যুগান্তকারী ঘোষণাটি আসে বৃহস্পতিবার ১১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬। এর ফলে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড, তথা মহাবিশ্বের সৃষ্টি ও বিবর্তন, কৃষ্ণগহ্বর, নিউট্রিনো তারকাসহ আরও নানা কিছু সম্পর্কে অনেক রহস্যের উন্মোচন সম্ভব হবে আগামীতে। এই আবিষ্কারের গুরুত্ব সম্পর্কে যুক্তরাজ্যের কার্ডিফ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর বিএস সত্যপ্রকাশ বলেন, ‘আমরা এখন মহাবিশ্বকে শুনতে পাব। আগের মতো তা কেবল তাকিয়ে দেখার মধ্যেই সীমিত থাকবে না।‘
এবার মহাবিশ্বকে শুনতে পাওয়ার ব্যাপারটা একটু বলি। যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার ২০০৮ সালে প্রকাশিত এক ‘ডিক্লাসিফাইড’ বা গোপনীয় নথিতে দেখা যায়, ১৯৬৯ সালে এ্যপোলো ১০-এর তিন নভোচারী চন্দ্র প্রদক্ষিণ করতে গিয়ে কিছু ‘অপার্থিব চিৎকার ও গোলামাল’ শুনে বিস্মিত হয়েছিলেন। তারা ছিলেন টমাস পি স্ট্যাফোর্ড, জন ডব্লিউ ইয়ং ও ইউজেন একারনান। তিন নভোচারীর হেডফোনে ধারণকৃত কথোপকথনে শোনা যায়, একজন আরেকজনকে বলছেন, ‘তুমি শুনেছ? শিসের মতো সুর? হুউউউ!’ প্রত্যুত্তরে অন্য নভোচারী বলেন, ‘এ তো, মহাশূন্যের সুর। এই সুর বড় অদ্ভুত।’ প্রাথমিকভাবে বিজ্ঞানীরা এই সুরকে চৌম্বক ক্ষেত্র বা বেতার তরঙ্গের সঙ্গে চাঁদের বায়ুমণ্ডলের প্রতিক্রিয়াজনিত বললেও, চাঁদে এর অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া যায় না। আর বায়ুমণ্ডল থাকার তো প্রশ্নই ওঠে না। তাহলে কি এই সুর মহাবিশ্বের মহাসঙ্গীত?
চাঁদের বুকে অবতরণকারী নাসার এ্যাপোলো-১৪ মিশনে অংশ নিয়েছিলেন মার্কিন নভোচারী এডগার মিচেল। তিনি সেখানে নয় ঘণ্টা হাঁটাহাঁটি করেন। প্রায় ৪৫ কেজি পাথর ও কাঁকর চন্দ্রপৃষ্ঠ থেকে সংগ্রহ করে প্রত্যাবর্তন করেন পৃথিবীতে। অভিযান শেষে মিচেল এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, তার মনে হয়েছে মহাবিশ্বের সবকিছুই পরস্পরের সঙ্গে সংযুক্ত একটি একক সত্তা। আত্মজীবনীতে তিনি লিখেছেন, ‘মহাকাশযানে হঠাৎ উপলব্ধি হয় আমার দেহের আণবিক কণা এবং ধাতব মহাকাশযানের অণুকণা বহু আগে অন্য কোনো নক্ষত্রে তৈরি হয়েছিল’। এডগার মিচেল মারা গেছেন ২০১৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি ফ্লোরিডার একটি হাসপাতালে ৮৫ বছর বয়সে। কবি অমিয় চক্রবর্তী সেই কবে আক্ষেপ করে লিখেছিলেন, ‘তোমার সৃষ্টি, আমার সৃষ্টি, তাঁর সৃষ্টির মাঝে/যত কিছু সুর, যা-কিছু বেসুরো বাজে/মেলাবেন, তিনি মেলাবেন’-(সংগতি)।
পাঠক, ব্ল্যাকহোলের মৃত্যু থেকে মহাকর্ষীয় তরঙ্গ, মহাশূন্যের মহাসঙ্গীত সর্বশেষ নভোচারী তথা মানুষের মৃত্যুচিন্তা- আপনি কী কিছু মেলাতে পারছেন?
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক, সাহিত্যিক





















