শিশিরবিন্দুর পাঠশালা

উম্মে হাবিবা

মাঘের সেই হাড়কাঁপানো সকালের কথা মনে পড়লে আজও শরীরের রোমকূপ খাড়া হয়ে ওঠে। দেবিদ্বারের দিগন্তজোড়া সর্ষে খেতের আইলে যখন আমি একা দাঁড়িয়ে ছিলাম, চারপাশটা যেন কোনো এক নিপুণ শিল্পীর আঁকা সাদা ক্যানভাস। কুয়াশার সেই ঘন চাদর এতটাই দুর্ভেদ্য ছিল যে, মনে হচ্ছিল আকাশ আর মাটি একাকার হয়ে মিশে গেছে। উত্তুরে হাওয়া যখন শাঁ শাঁ করে বইছিল,
মনে হচ্ছিল যেন অদৃশ্য কোনো তলোয়ার চামড়া ভেদ করে হাড়ের ভেতর সেঁধিয়ে যাচ্ছে। আমি আমার চাদরটি শরীরের সাথে আরও শক্ত করে জড়িয়ে নিলাম, হাত দুটো বগলের নিচে গুটিয়ে নিয়েও শীতের সেই তীব্র দংশন থেকে নিস্তার পাচ্ছিলাম না। প্রকৃতির এই রুদ্র শীতলতা আমাকে মনে করিয়ে দিচ্ছিল মহান আল্লাহর সেই অসীম কুদরতের কথা।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন: “নিশ্চয়ই আসমান ও জমিন সৃষ্টিতে এবং রাত ও দিনের পরিবর্তনে জ্ঞানবানদের জন্য নিদর্শন রয়েছে।” (সূরা আল-ইমরান: ১৯০)।

​এই আয়াতের বাস্তব প্রতিফলন দেখছিলাম সেই বিস্তৃত হলুদ সর্ষে খেতে। কুয়াশার স্তব্ধতা চিরে যখন ভোরের প্রথম ম্লান আলো সর্ষে ফুলের ডগায় দুলতে থাকা এক ফোঁটা শিশিরবিন্দুর ওপর পড়ল, তখন তা এক মায়াবী জাদুকরী শক্তিতে সাত রঙে ঝিকমিকিয়ে উঠল। সেই বিন্দুটি কেবল পানি ছিল না, সেটি ছিল প্রকৃতির এক অনন্ত রহস্যের ধারক।

এক লহমায় মনে হলো, এই ক্ষুদ্র বিন্দুটির মধ্যেই লুকিয়ে আছে স্রষ্টার মহিমা। কিন্তু পরক্ষণেই এক গভীর বিষাদ আমাকে গ্রাস করল—এই উজ্জ্বলতার আয়ু তো মাত্র কয়েক মুহূর্তের। সূর্যের তেজ বাড়লেই এই বিন্দুটি বাতাসে মিলিয়ে যাবে। এই ক্ষণস্থায়ী সৌন্দর্যই যেন জীবনের আসল রূপ।

তখন মনের গহীনে জেগে উঠল :—
​”ফুলের গায় শিশির কণা, ক্ষণিক তাহার আসা,  রোদের তেজে হারায় সে যে, মিছেই ভালোবাসা।  জীবন আমাদেরও তো এমন, এক চিমটি আলোর খেলা,
মায়ার বাঁধন ছিঁড়ে শেষে, ফেরার পালায় মেলা।”

​আসলে বাস্তবতা হলো, আমরা মানুষরা আমাদের জীবনের প্রারম্ভে এই শিশিরের মতোই নিষ্পাপ আর উজ্জ্বল হয়ে আসি। শৈশবের সেই নিষ্কলুষতা আমাদের সারা শরীরকে আবৃত করে রাখে। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় যেমন রোদের তাপে শিশির শুকিয়ে যায়, তেমনি জীবনের জটিলতায় আমাদের সেই সরলতা হারিয়ে যায়।

আমি যখন দেবিদ্বারের সেই হিমশীতল সকালে সর্ষে খেতের পাশে দাঁড়িয়ে একাকী শিশিরবিন্দুর নশ্বরতা দেখছিলাম, তখন আমার হঠাৎ মনে হলো—এই যে হলুদ সর্ষে ফুলটি ডগার ওপর এক ফোঁটা শিশিরকে পরম মমতায় ধারণ করে আছে, এই দৃশ্যটি কি খুব চেনা নয়? সর্ষে ফুলটি নিজে হিমশীতল কুয়াশায় ভিজেছে, উত্তুরে হাওয়ার ঝাপটা সহ্য করেছে, কেবল ওই ছোট্ট শিশির বিন্দুটিকে একটুখানি আশ্রয় দিতে। ঠিক এভাবেই কি আমাদের মা-বাবা আমাদের আগলে রাখেন না?

​সন্তানের জন্য মা-বাবার এই আত্মত্যাগ কোনো জাগতিক বিনিময় আশা করে না। আমরা যখন এই পৃথিবীতে প্রথম চোখের পলক ফেলি, তখন আমরা সর্ষে ফুলের ডগায় থাকা সেই স্বচ্ছ শিশিরবিন্দুর মতোই অসহায় এবং রিক্ত থাকি। আমাদের অস্তিত্বের সবটুকু ওম তারা নিজের বুক দিয়ে জোগান দেন।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা মা-বাবার এই ত্যাগের মহিমাকে চিহ্নিত করে পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করেছেন:—
​”আর আমি মানুষকে তার পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহারের জোর নির্দেশ দিয়েছি। তার মাতা তাকে কষ্টের পর কষ্ট বরণ করে গর্ভে ধারণ করেছে এবং তার দুধ ছাড়ানো হয় দুই বছরে। সুতরাং আমার প্রতি ও তোমার পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞ হও।” (সূরা লোকমান: ১৪)

​বাস্তবতা হলো, সর্ষে ফুলটি যেমন রোদের প্রখরতা সয়েও শিশিরকে আগলে রাখে, আমাদের মা-বাবাও তেমনি জীবনের অভাব, দারিদ্র্য আর দুঃখের প্রখর রোদ থেকে আমাদের ছায়া দেন। তারা নিজেদের রঙিন স্বপ্নগুলো বিসর্জন দিয়ে আমাদের জীবনকে রঙিন করার রসদ জোগান।

অথচ অদ্ভুত বৈপরীত্য দেখুন, সূর্যের আলো ফোটার সাথে সাথেই শিশিরবিন্দুটি যেমন ফুলকে ছেড়ে উবে যায়, আমরা সন্তানরাও বড় হওয়ার সাথে সাথে তেমনি অনেক সময় মা-বাবাকে ছেড়ে আপন কক্ষপথে ছুটতে শুরু করি। আমরা ভুলে যাই সেই বৃন্তের কথা, যা আমাদের এক সময় জীবন দিয়েছিল।

​মা-বাবার সেই নিঃস্বার্থ ভালোবাসার বিপরীতে আমাদের সামর্থ্য নিয়ে আমার মনের কোণে তখন এক করুণ ছন্দ বেজে ওঠে:—
​”বুক পেতে সয় রোদের দাহ, আগলে রাখে ছায়ায়,
সন্তান সে তো শিশির কণা, বন্দী মিছেই মায়ায়।
প্রতিদান তার কি বা আছে? রিক্ত তাহার হাত,
ঋণ শোধ কি হয় কখনো? কাটলে সহস্র রাত।”

​আমরা কি আসলেই তাদের প্রতিদান দিতে পারি? না, পারি না। সর্ষে ফুল যখন শুকিয়ে যায়, শিশির কি পারে তাকে পুনর্জীবন দিতে? আমরা সম্পদ দিতে পারি, অট্টালিকা দিতে পারি, কিন্তু সেই রাতের ঘুমহীন প্রহরগুলো কি ফিরিয়ে দিতে পারি যা তারা আমাদের অসুখে বিসর্জন দিয়েছিলেন?

আমাদের যাবতীয় সফলতা আসলে তাদেরই দোয়ার ফসল। কুরআন আমাদের শিখিয়েছে তাদের জন্য শ্রেষ্ঠ প্রতিদান হলো কেবলই বিনম্র দোয়া। আল্লাহ তায়ালা শিখিয়ে দিয়েছেন:—
​”হে আমার পালনকর্তা, তাদের প্রতি দয়া করো, যেমন তারা আমাকে শৈশবে দয়া ও মমতায় লালন-পালন করেছেন।” (সূরা বনী ইসরাঈল: ২৪)

​বাস্তবতার রূঢ় পরিহাস হলো, আজকের এই যান্ত্রিক যুগে আমরা যখন সর্ষে ফুলের মতো বৃদ্ধ মা-বাবাকে ফেলে রেখে শিশিরবিন্দুর মতো নিজেদের উজ্জ্বলতা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ি, তখন প্রকৃতি আমাদের দিকে চেয়ে উপহাস করে।

মনে রাখবেন , শিশিরবিন্দুটি যতোই উজ্জ্বল হোক, তার মূল আধার কিন্তু ওই ফুলটিই। ফুল ছাড়া শিশিরের কোনো স্থিতি নেই। তেমনি মা-বাবার দোয়া ছাড়া সন্তানের কোনো স্থায়ী সফলতা নেই।

​সর্ষে খেতের কুয়াশা যেমন এক সময় কেটে যায়, তেমনি আমাদের যৌবনও একদিন কুয়াশার মতো মিলিয়ে যাবে। একদিন আমরাও ওই জীর্ণ সর্ষে ফুলের মতো নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ব। সেদিন যেন আমাদের আক্ষেপ করতে না হয়। প্রকৃতির এই পাঠশালায় শিশিরবিন্দুর ক্ষণস্থায়ী রূপ দেখে আমি এটাই বুঝলাম—মা-বাবার প্রতি ঋণ শোধ করা অসম্ভব, কিন্তু তাদের প্রতি বিনম্র থাকা এবং তাদের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ভালোবাসার চাদরে ঢেকে রাখাই হলো জীবনের একমাত্র সার্থকতা।

দেবিদ্বারের এই সর্ষে খেত আজ কেবল একটি ফসলি জমি নয়, এটি যেন জীবনের এক আদি পাঠশালা। এখানে দাঁড়িয়ে উপলব্ধি করা যায়, স্রষ্টা কীভাবে ক্ষুদ্রের মাঝে বৃহৎকে লুকিয়ে রেখেছেন। এই বিশাল প্রকৃতি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, আমরা আসলে কত ক্ষুদ্র।

আমাদের যতো দম্ভ, যতো অহংকার—সবই এই তীব্র শীতের হাওয়ায় খড়কুটোর মতো উড়ে যাওয়ার যোগ্য। শিশিরবিন্দুটি যেমন হাসিমুখে সূর্যের তাপকে বরণ করে নিয়ে নিজেকে বিলীন করে দেয়, আমাদেরও উচিত স্রষ্টার ইচ্ছার কাছে নিজেকে সঁপে দেওয়া। অথচ আমরা তা করি না, আমরা আঁকড়ে ধরি সেই সৌন্দর্যকে, যার ক্ষয় অনিবার্য।

এই প্রথম পরিচ্ছেদে আমি প্রকৃতির সাথে আধ্যাত্মিকতার যে মেলবন্ধন দেখলাম, তা আমার সত্তাকে নাড়িয়ে দিয়েছে।
সর্ষে ফুলের ওপর জমে থাকা সেই টলটলে শিশিরবিন্দুটি দেখতে এক টুকরো হীরার মতো। কিন্তু এর আয়ু কতক্ষণ? রোদের তেজ একটু বাড়লেই তো এর অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাবে। আমাদের জীবনটাও কি ঠিক এই শিশিরবিন্দুর মতো নয়? আমরা মানুষরা সারা জীবন কত কী পাওয়ার আশায় মরিয়া হয়ে ঘুরি। টাকা, পয়সা, যশ, খ্যাতি—সবই যেন সেই উজ্জ্বল শিশিরবিন্দুর মতো,দেখতে মায়াবী, কিন্তু ছুঁতে গেলেই নেই।

আসলে আমি সর্ষে ফুলের কাছে দাঁড়িয়ে অনুভব করলাম বাস্তবতা বড়ই কঠিন। আমরা যখন কোনো বড় পদের পেছনে ছুটি বা অগাধ ধনসম্পদ পুঞ্জীভূত করি, তখন মনে হয় এটাই জীবনের পরম সার্থকতা। কিন্তু একবারও কি ভেবে দেখেছি, এই সবকিছুই এক একটি শিশিরবিন্দু? আজ আছে, কাল নেই।

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আমাদের এই পার্থিব মোহের বাস্তবতা সম্পর্কে সাবধান করে দিয়ে কুরআনে বলেছেন:—
“পার্থিব জীবন তো ধোঁকা ও প্রতারণার সামগ্রী বৈ আর কিছুই নয়।” (সূরা আল-ইমরান: ১৮৫)।

​বাস্তবে আমরা কী দেখি? মানুষ ক্ষমতার দম্ভে অন্ধ হয়ে অন্য মানুষের ওপর জুলুম করে। বড় বড় প্রাসাদ গড়ে তুলে ভাবে সে চিরকাল এখানে বাস করবে।
কিন্তু দেবিদ্বারের এই সর্ষে ফুলগুলো আমাকে অন্য এক বাস্তবতা শেখাল। আজ যে হলুদ ফুলটি গর্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে, কয়েকদিন পরেই সেটি শুকিয়ে ঝরে যাবে। তার সেই বর্ণিল রূপ হারিয়ে যাবে ধূসর মাটিতে।

আমরাও কি ঠিক তেমন নই? আমাদের যৌবন, আমাদের গায়ের জোর, আমাদের দাপট—সবই তো সময়ের কাছে বন্দি। শিশিরবিন্দু যেমন আঙুলের স্পর্শে ভেঙে যায়, আমাদের সাজানো স্বপ্নগুলোও অভাব বা বার্ধক্যের সামান্য ছোঁয়ায় ধূলিসাৎ হয়ে যায়। অথচ আমরা সারা জীবন আষ্টেপৃষ্ঠে মায়ার জালে জড়িয়ে থাকি। আমরা ভাবি আমরা অনেক কিছু পেয়েছি, কিন্তু শেষে দেখা যায় আমাদের ঝুলি শূন্য।

এই রূঢ় বাস্তবতার সুরই আমার মনের মাঝে ফুটে উঠেছে :
​”এতো আয়োজন, এতো আশা, কিসের লাগি তবে?
কাল যা ছিল আপন বড়, আজ তা পর হবে।  মাটির দেহে মাটির মায়া, মিছেই গড়া ঘর,
জীবন প্রদীপ নিভলে পরে, সবাই তো যাযাবর।”

​বাস্তবতা হলো, জীবনের রেলগাড়িতে আমরা সবাই যাত্রী। এক এক জন এক এক স্টেশনে নেমে যাব। কেউ আগে, কেউ পরে। কিন্তু অদ্ভুত বিষয় হলো, আমরা কেউই ট্রেনের জানালা দিয়ে বাইরের দৃশ্য উপভোগ করি না, বরং ট্রেনের সিট দখল করা নিয়ে মারামারি করি। শিশিরবিন্দুটি যখন আমার আঙুলের ডগায় গড়িয়ে পড়ল, তখন তার শীতল স্পর্শ আমাকে মনে করিয়ে দিল—জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত বিসর্জনের জন্য প্রস্তুত থাকা উচিত।
আমরা যতো বেশি সঞ্চয় করি, ততো বেশি হারানোর ভয়ে তটস্থ থাকি। অথচ সর্ষে ফুলটি তার সর্বস্ব সৌন্দর্য বিলিয়ে দিচ্ছে কোনো বিনিময় ছাড়াই। সে জানে সে নশ্বর, তবুও সে বর্তমানকে আনন্দময় করে তুলছে।

এই শিক্ষাটিই আমাদের জীবনের চরম বাস্তবতা হওয়া উচিত। আমরা যতোই মায়ার বাঁধন টানি না কেন, শেষ পর্যন্ত আমাদের ফিরে যেতেই হবে সেই রবের কাছে, যিনি আমাদের এই ক্ষুদ্র শিশিরের মতো পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন।
বাতাসে আমার চুলগুলো উড়ছিল, যেন বারবার আমায় মনে করিয়ে দিচ্ছিল যে সময় বয়ে যাচ্ছে। প্রকৃতিতে কোনো কিছুই স্থির নয়। আজ যা কুয়াশাচ্ছন্ন, কাল তা রৌদ্রোজ্জ্বল। এই যে শীতের পর বসন্ত আসবে, সর্ষে খেতটা ধূ ধূ মাঠে পরিণত হবে—এটাই তো শাশ্বত সত্য।
আমরাও তো আমাদের শৈশব, কৈশোর পেরিয়ে বার্ধক্যের দিকে ধাবিত হচ্ছি। ফুলের মতো ফুটে ওঠা আর শিশিরের মতো ঝরে পড়া—এই দুইয়ের মাঝখানের সময়টাই তো জীবন।

আল্লাহ পাক কুরআনে মানুষের বয়সের এই বিবর্তন এবং প্রকৃতির পরিবর্তনের উদাহরণ দিয়েছেন এভাবে:—
“তোমরা জেনে রেখো, পার্থিব জীবন তো ক্রীড়া-কৌতুক, জাঁকজমক, পারস্পরিক গর্ব-অহংকার আর ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে আধিক্য লাভের প্রতিযোগিতা মাত্র। এর উপমা হলো বৃষ্টি, যার উৎপন্ন ফসল কৃষকদের আনন্দ দেয়, তারপর তা শুকিয়ে যায় এবং তুমি তা পীতবর্ণ দেখতে পাও, অবশেষে তা খড়কুটোয় পরিণত হয়।” (সূরা আল-হাদীদ: ২০)।

​বাস্তবতার এই নির্মম সত্যটি আমরা প্রতিনিয়ত ভুলে যাই। আমরা ভাবি আমাদের সময় অফুরন্ত। কিন্তু হঠাৎ আয়নায় তাকালে যখন চোখের নিচে কালি আর চুলে পাক ধরা দেখি, তখন বুকটা কেঁপে ওঠে। সর্ষে খেতের সেই শিশির ভেজা ফুলগুলো যেন আমাদেরই প্রতিচ্ছবি। তারা জানে তাদের আয়ু অল্প, কিন্তু তাদের মধ্যে কোনো হাহাকার নেই।
তারা আল্লাহর তসবিহ পাঠ করে বাতাসের দোলায় মাথা নাচে। আর আমরা মানুষরা আগামীর চিন্তায় আমাদের বর্তমানকে বিষিয়ে তুলি। হারানোর ভয়ে পাওয়ার আনন্দকে ভুলে যাই। আমাদের মধ্যে এতো ইগো, এতো মিথ্যা দম্ভ—অথচ আমরা কেউই জানি না আমাদের পরবর্তী নিশ্বাসটি আমরা নিতে পারব কি না।

মনের গহীনে তখন বাজতে থাকে সেই জীবনবোধের ছন্দের মতো:—
​”ফুলের মতো ঝরে যাওয়াই যদি হয় ভবিতব্য,  তবে কেন মনে এতো অভিমান আর এতোই অসত্য?
শিশির ভেজা ওই বিন্দুটি শেখায় হাসতে ক্ষণে,  রিক্ত হয়েও সার্থকতা খোঁজো আপন মনে।”

​বাস্তবতা হলো, জীবন মানে কেবল টিকে থাকা নয়, জীবন মানে হলো বিলিয়ে দেওয়া। শিশিরবিন্দুটি যখন সূর্যের আলোয় বাষ্প হয়ে যায়, তখন সে কিন্তু হারিয়ে যায় না,সে আবার মেঘ হয়ে ফিরে আসে। আমাদের জীবনটাও এমন হওয়া উচিত—যাতে আমাদের চলে যাওয়ার পর আমাদের কর্মগুলো মানুষের মনে বৃষ্টির মতো শান্তি বর্ষণ করে।
কুরআনের আয়াত আমাদের শেখায় যে, আমরা এই পৃথিবীতে কেবল মুসাফির। একজন মুসাফির যেমন গাছের নিচে কিছুক্ষণ জিরিয়ে নিয়ে আবার গন্তব্যের দিকে রওনা হয়, আমাদের জীবনও ঠিক তেমন। সর্ষে খেতের এই নির্জনতা আমাদের সেই গন্তব্যের কথা মনে করিয়ে দেয়। প্রতিটি সর্ষে ফুল যেন এক একটি আয়ুষ্কাল, যা সময়ের স্রোতে ভেসে যাচ্ছে।

এই যে আমি দাঁড়িয়ে আছি দেবিদ্বারের মাঠে, কাল হয়তো আমি এখানে থাকব না। কিন্তু এই উপলব্ধিটুকু যদি আমি বয়ে নিয়ে যেতে পারি, তবেই আমার এই জীবনটা সার্থক হবে। প্রাপ্তির চেয়ে রিক্ত হওয়ার যে আনন্দ, তা কেবল আধ্যাত্মিক চোখেই দেখা সম্ভব।

জীবনের এই অংকটা বড় অদ্ভুত। আমরা ছোটবেলা থেকে শিখি কীভাবে যোগ করতে হয়—টাকা যোগ করো, সম্মান যোগ করো।

অথচ, প্রকৃতি এবং আমাদের রব আমাদের শেখান কীভাবে বিয়োগ করতে হয়। জীবনের শেষবেলায় এসে আমাদের সব শূন্য হয়ে যায়। আমরা জন্মাই শূন্য হাতে, আর বিদায় নেইও শূন্য হাতে। মাঝখানের এই কদিন যে মায়ার দালান গড়ি, তা কেবলই চোখের ভ্রম।

আল্লাহ তাআলা আমাদের এই অন্তিম পরিণতি সম্পর্কে কুরআনে অত্যন্ত গম্ভীরভাবে বলেছেন:—
“আমি মাটি থেকে তোমাদের সৃষ্টি করেছি, তাতেই তোমাদের ফিরিয়ে দেব এবং তা থেকেই পুনরায় তোমাদের বের করে আনব।” (সূরা ত্বহা: ৫৫)।

​এই আয়াতের রূঢ় বাস্তবতা হলো, আমরা যতোই দামি পারফিউম মাখি বা রেশমি পোশাক পরি না কেন, শেষ গন্তব্য সেই সাড়ে তিন হাত মাটি। সর্ষে ফুলের ডগার সেই শিশিরবিন্দুটি যখন রোদের তাপে মিলিয়ে গেল, তখন বুঝলাম আমাদের প্রাপ্তিগুলো আসলে শূন্যতার নামান্তর। আমরা আজ যাদের জন্য এতো অন্যায় করি, এতো অর্থ সঞ্চয় করি, মৃত্যুর পাঁচ মিনিট পরেই তারা আমাদের শরীরটাকে ঘর থেকে বের করে দেওয়ার ফন্দি আঁটে। এটাই বাস্তবতা।

দেবিদ্বারের এই মাঠে দাঁড়িয়ে যখন মাটির দিকে তাকালাম, মনে হলো এই মাটির নিচেই শুয়ে আছে কত হাজার বছর আগের কত মানুষ। তারা আমাদের মতোই দম্ভ করত, তারা আমাদের মতোই হাসত-কাঁদত। আজ তাদের কোনো চিহ্ন নেই। সর্ষে ফুলগুলো সেই মাটিরই নির্যাস নিয়ে জন্মেছে। অর্থাৎ আমরা একদিন যা ছিলাম, মাটি আমাদের সেই রূপেই ফিরিয়ে নেয়।

জীবনের এই কঠিন সুর ফুটে ওঠে আমার মনের মাঝে :—
​”মাটির দেহে মাটির মায়া, মিছেই গড়া ঘর,
জীবন প্রদীপ নিভলে পরে, সবাই তো যাযাবর। এতো আয়োজন, এতো আশা, কিসের লাগি তবে? কাল যা ছিল আপন বড়, আজ তা পর হবে।”

​বাস্তবতা হলো, আমরা সবাই যাযাবর। এই পৃথিবী আমাদের ঘর নয়, এটি একটি সরাইখানা মাত্র। সর্ষে ফুল আর শিশিরবিন্দু যেন আজ আমার গুরু হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তারা আমাকে শেখাল—লাভ-ক্ষতির হিসাব এই পৃথিবীর ধূলিকণায় পড়ে থাকবে। শুধু রয়ে যাবে সেই মুগ্ধতার রেশ এবং আমাদের আমলনামা।

আমরা যদি ফুলের মতো অন্যের জীবনে একটু হাসি ফোটাতে পারি, তবেই আমাদের এই ক্ষণস্থায়ী আসা সার্থক হবে।

শিশিরবিন্দুটি রোদে মিশে গিয়ে প্রমাণ করেছে যে সে ক্ষুদ্র হয়েও সূর্যের অংশ হতে পেরেছে। আমাদেরও লক্ষ্য হওয়া উচিত সেই মহান স্রষ্টার সান্নিধ্য লাভ করা। জীবনের এই অংকটা যেদিন আমরা মেলাতে পারব, সেদিন আর হারানোর ভয় থাকবে না। শীতের সেই নির্জন দুপুরে সর্ষে খেতের মাঝে দাঁড়িয়ে আমি এক গভীর প্রশান্তি অনুভব করলাম। সর্ষে ফুল আর শিশিরবিন্দু আমাকে সেই রূঢ় বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করাল, যেখানে জীবনের প্রাপ্তি মানেই আসলে মহান আল্লাহর কাছে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ।

জীবনের এই সংক্ষিপ্ত অংকে যোগ-বিয়োগের খেলা বৃথা। আমরা যতোই সঞ্চয় করি না কেন, কবরের সাড়ে তিন হাত মাটিই আমাদের শেষ সীমানা। তাই দম্ভ আর অহংকারের কুয়াশা সরিয়ে আমাদের উচিত সর্ষে ফুলের মতো উদার হওয়া এবং শিশিরের মতো পবিত্র থাকা। মা-বাবার সেবা ও স্রষ্টার কাছে বিনম্র আত্মসমর্পণের মাধ্যমেই কেবল এই যাযাবর জীবন সার্থকতা পেতে পারে। মনে রাখা প্রয়োজন—মৃত্যু জীবনের শেষ নয়, বরং এটি নশ্বর জগত থেকে শ্বাশত গন্তব্যে ফেরার এক অনিবার্য সেতু মাত্র।

লেখিকার মতামত : ​”জীবন এক আশ্চর্য পাঠশালা, যেখানে সর্ষে ফুল আমাদের মা-বাবার ত্যাগের কথা মনে করিয়ে দেয়, আর ক্ষণস্থায়ী শিশিরবিন্দু আমাদের নশ্বরতার পাঠ দেয়। তাই অহংকার ভুলে মা-বাবার চরণে জান্নাত খোঁজা এবং স্রষ্টার কাছে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণই হোক আমাদের জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *